Shopping cart

সম্পাদকীয়

আরএসএসের দুর্গাই বিজেপিকে উপহার দিল বাংলার দুর্গ

353

ঐতিহাসিক!

বাংলার মাটি, দুর্জয় ঘাঁটি শেষ পর্যন্ত জয় করল বিজেপি। যে মাটি থেকে বিজেপির বীজের জন্ম, শ্যামাপ্রসাদের ভিটে, ২০২৬-এ এসে সেখানে সরকার গড়ছেন তাঁর উত্তরসূরিরা। কিন্তু এতে বিজেপির কৃতিত্ব রয়েছে কতটা? নাকি পুরোটাই তৃণমূলের অপশাসনের ফল? তৃণমূলে পাঁকে ফুটল বিজেপির পদ্ম?

শুরুটা হয়েছিল বাম সরকারের পতনের মাধ্যমে। তৃণমূলকে সরাসরি সমর্থন করেছিল আরএসএস (RSS) এবং বিজেপি। মমতাকে তাদের ‘দুর্গা’ বানিয়েছিল আরএসএস। সেই দুর্গাই তাদের এনে দিলেন বাংলার দুর্গ। এটাই কি ছিল আরএসএসের দূরদর্শিতা? বিদগ্ধজনেরা ভাল বলতে পারবেন।

যে মাটিতে স্বাধীনতার পূর্বে ক্ষমতায় ছিল হিন্দু মহাসভা, যে মাটিতে জন্ম শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের, কেন সেই মাটি থেকে এতদিন বঞ্চিত ছিল বিজেপি? ১৯৪৬-এর ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ (Direct Action Day) ও ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-এর পর বাংলারই তো নাগপুর হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হল না কেন? কারণ ১৯৪১ থেকে ১৯৪৩ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল আসলে ফজলুল হকের ‘কৃষক প্রজা পার্টি’, যার জোটসঙ্গী ছিল শ্যামাপ্রসাদের হিন্দু মহাসভা। এই পার্টি যেমন হিন্দু মহাসভার সাথে ক্ষমতায় ছিল, তেমনি জোট করেছিল মুসলিম লীগের সাথেও। লড়াই ছিল মূলত কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। ফজলুল হকের পার্টি বলত জমিদারের হাত থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে এনে কৃষক এবং মজদুরের হাতে ক্ষমতা দেওয়ার কথা। সামন্তবাদের বিরুদ্ধে বাংলার লড়াই নতুন নয়। বাংলার রাজনীতিতে হিন্দু-মুসলিম মিলেমিশে সামন্তবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নিশান স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময় থেকেই রয়েছে। স্বাধীনতার পরে ভারতবর্ষ জুড়ে কংগ্রেসের একচেটিয়া জয়। বাংলা তার ব্যতিক্রম হয়নি। তারপর ১৯৭৭-এ বামেদের বাংলায় ক্ষমতায় আসা। এই সময় পূর্ব পাকিস্তান (তখন বাংলাদেশ) থেকে একাধিক হিন্দু পরিবার আশ্রয়ের জন্য বাংলায় আসলেও তাদের মধ্যে থাকা মুসলিমবিদ্বেষকে কাজে লাগিয়ে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি আরএসএস। তার মূল কারণ বামেদের রিফিউজি আন্দোলন এবং জমি বণ্টন আন্দোলন। তাই মুসলিমবিদ্বেষ ক্রমে চাপা পড়ে যায় ‘ক্লাস স্ট্রাগল’-এর লড়াইয়ে। ধর্ম নয়, রুটি-রুজিই হয়ে ওঠে মূল লড়াইয়ের ভিত। তাই বামেরা ক্ষমতায় থাকাকালীন বাংলায় খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি বিজেপি।

২০১১-তে কাস্তে-হাতুড়ির ৩৪ বছরের দুর্ভেদ্য সাম্রাজ্য পতন করে ঘাসফুল। সুযোগ বুঝে সমর্থন জানায় পদ্মফুল। এরপর ১৫ বছরের তৃণমূল শাসন জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে। দুর্নীতির শুরু প্রথম পাঁচ বছরেই। সেই দুর্নীতিতে রাশ টানতে পারেননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, বরং চিত্রগুপ্তের খাতার মতো লম্বা হয়েছে লিস্ট। চিটফান্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রেশন, বালি, কয়লা, চাকরি, গরু—আরও কত কী! মন্ত্রীর খাটের তলায় পাওয়া গেছে কোটি টাকা এবং সোনার গয়না। জেলে গেছেন পার্থ থেকে জ্যোতিপ্রিয়। তবুও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি নেত্রীকে, বরং দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাকে ফের টিকিট দিতে দেখা গেছে তাঁকে। মানুষ দেখছিলেন সবটাই। হাওয়া বলছিল পরিবর্তন চাই, কিন্তু আনব কাকে?

বাম-শূন্য পশ্চিমবঙ্গ করতে গিয়ে খাল কেটে বিজেপিকে ডেকে এনেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং। ২০২১-এর ‘নো ভোট টু বিজেপি’ (No Vote to BJP) ক্যাম্পেইন বিশাল জয় এনে দিল তৃণমূলকে, কারণ বিদগ্ধজনেরা বিজেপিকে ভোট দিতে না বললেও কাকে ভোট দিতে হবে তা বলে দিলেন না। তাই প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকলেও ‘গ্রেটার ইভিল’-কে হারাতে ‘লেসার ইভিল’-কে বেছে নিলেন মানুষ। বিধানসভায় শূন্য হল বামেরা। শহরের উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত মানুষের মধ্যে বিজেপি-বিদ্বেষ থাকলেও গোটা বাংলায় সুযোগ বাড়ল বিজেপির।

২০২৬-এর অঙ্কটা তাই বেশ কিছুটা বদলে গেল। বিজেপি অনেকটা গুছিয়ে নিয়েছে বাংলায় তাদের রাজনৈতিক ঘুঁটি। ইতিমধ্যে বাংলার মানুষ আরও অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে তৃণমূলের একচেটিয়া দাদাগিরিতে। চলে গেছে ২৬ হাজারের চাকরি, ঘটে গেছে আরজি কর। বাংলার সবথেকে অরাজনৈতিক মানুষও রাজপথে হেঁটেছেন তিলোত্তমার বিচার চেয়ে। তাই ২০১৫ এবং ২০২১-এ নির্বাচন কমিশনের যে ভূমিকা দেখা যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু যায়নি, তা দেখা গেল ২০২৬-এ। তার ওপর এসআইআর (SIR)। অবৈধ ও ভুয়ো ভোটারের সাথে বাদ পড়ল ৯১ লক্ষ বৈধ ভোটার, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই তৃণমূলের ভোট-বেল্টের মুসলিম ভোটার। তৃণমূলকে ক্ষমতায় থেকে যেতেই হত। বিজেপি শুধু সঠিক সময়, সঠিক জায়গায়, সঠিক সেনাবল নিয়ে উপস্থিত ছিল। বিজেপির এই রেকর্ড জয় শুধু বিজেপি ভোটারদের জন্য নয়, এ মূলত প্রতিষ্ঠান-বিরোধী ভোট।

তবে চিন্তার বিষয় হচ্ছে, জয় নিশ্চিত হতেই বিরোধী দলনেতা (প্রাক্তন) বলে উঠলেন হিন্দুদের জয়। তিনি ওয়ার্ড ধরে ধরে বলে দিলেন কোন ভোট বিজেপি পাবে, কোন ভোট তৃণমূল। এর আগে কখনও এভাবে বাংলায় ভোটবাক্সের ধর্মীয়করণ হয়নি। যে জয় হওয়ার কথা ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে, সে জয় হয়ে গেল হিন্দুত্বের। কিন্তু চাকরি তো শুধু হিন্দু পরিবারের যায়নি, বেকারত্ব তো শুধু হিন্দু পরিবারের চিন্তা নয়! দুর্নীতির খেসারত শুধু হিন্দুরাই গুনছেন না! মমতাকে ক্ষমতায় কি শুধু মুসলিমরা এনেছিলেন?

আগামী ছয় মাস থেকে এক বছর বিজেপি সরকারের কাছে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ থাকবে বাংলার মাটিতে নিজেদের সংগঠন তৈরি করার। কারণ বিপুল ভোটে জয় হলেও বিজেপির সংগঠন বাংলায় খুবই দুর্বল—একথা অস্বীকার করার জায়গা নেই। সেই তুলনায় বামেদের সংগঠন অনেক বেশি মজবুত। তৃণমূল-বিরোধী ভোট যে বিজেপিতেই থাকবে এমনটা ধরে নেওয়ারও কোনও কারণ নেই। বামেরা শূন্যের গেরো কাটিয়েছে। তারাও সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে রাজনৈতিক ময়দানে। তৃণমূল ক্রমে বিলুপ্ত হলে, বাংলায় সরাসরি ‘লেফট ভার্সেস রাইট’-এর লড়াই এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। আগামী দশ বছর কঠিন লড়াই বামেদের সামনেও। কারণ তৃণমূল বিলুপ্ত হলে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বিজেপির সরকারকে চ্যালেঞ্জ করবে বামেরাই—একথা বিজেপিরও অজানা নয়।

সম্পর্কিত খবর