বাঙালির প্রাণের ঠাকুরের জন্মতিথিতেই শপথ নিলেন পশ্চিমবঙ্গের নবম মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ব্রিগেডজোড়া গেরুয়া পতাকা, ঝালমুড়ি, কেসি দাসের রসগোল্লার সহযোগে বাঙালি বহুকাল পর এমন এক মুখ্যমন্ত্রীকে পেল, যিনি শহর কলকাতার মানুষ নন; বরং জেলার। অনেক বছর পর এই জাতি ফের একবার আশা দেখছে, স্বপ্ন দেখছে। যদি ফের বড় শিল্প আসে, সিঙ্গুরে যদি একটা গাড়ি কারখানা হয়, যদি হাসপাতালে গেলে আর ফিরতে না হয় মুমূর্ষু রোগীকে, আমাদের স্কুলবাড়িতে যদি আবার পড়াশোনা হয়! চা দোকানে, পাড়ার মোড়ের আলোচনায় গণতন্ত্র ফিরেছে আজ পাঁচদিন। যাঁরা কথা বলতে ভয় পেতেন তাঁরাও চুপ নেই আর পুরাতন শাসকের বিরুদ্ধে। অবস্থা এমন পর্যায়ে গিয়েছে যে, সদ্য প্রাক্তন হয়ে যাওয়া মুখ্যমন্ত্রীর নামে ‘ফাইল চোর’ গান বাজছে বড় রাস্তার মোড়ে। ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির সামনে এসে ছোকরাদের দল ‘চোরের বাড়ি, চোরের বাড়ি’ চিৎকার করছে। এমত অবস্থায় নরেন্দ্র মোদী যখন ব্রিগেড মঞ্চে জনতার দিকে মুখ করে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম সারেন, আমার অগ্রজ সাংবাদিক লেখেন, ‘রাজা সবার দেন মান, সে মান আপনি ফিরে পান’।
এখানেই প্রশ্ন জাগে, তবে কি নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী ‘রাজা’?
রবি ঠাকুর এই গানটির প্রথম স্তবকে লিখেছিলেন, ‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে’। রবীন্দ্রনাথ যে কত বড় সমাজতান্ত্রিক ছিলেন, এই লেখা তার প্রমাণ। তিনি এমন এক সমাজব্যবস্থা চেয়েছিলেন, যেখানে কেউ রাজা নয়। অথচ এই পঁচিশে বৈশাখেই ফের গুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে রবীন্দ্রনাথকে। আমরা ক্রমশ সাদা এবং কালোর মাঝখানে পৌঁছে যাচ্ছি। নবতম মুখ্যমন্ত্রী ব্রিগেড মঞ্চ থেকে পৌঁছে যাচ্ছেন জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি, মাল্যদান সারছেন। সেই কবি—যিনি বঙ্গভঙ্গের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন, গান বেঁধেছিলেন। আবার সেই মুখ্যমন্ত্রীই জোড়াসাঁকো থেকে সোজা চলে যাচ্ছেন আশুতোষ মুখোপাধ্যায় রোড; মাল্যদান করছেন সেই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে, যিনি বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন করেছিলেন।
প্রসঙ্গত, ১৯২৯ সালে কংগ্রেসের টিকিটে বাংলার বিধানসভায় পা রেখেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। জিন্না, সোহরাওয়ার্দি, হকের মতো বিশিষ্ট মুসলিম নেতা-সহ প্রাক্তন কংগ্রেস নেতা শরৎ বসুও চেয়েছিলেন ভারতবর্ষ থেকে গোটা বাংলা প্রদেশকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে। ১৯৫১ সালে নেহরুর সঙ্গে মনোমালিন্য চরমে ওঠায় মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করে পরের বছরই অর্থাৎ ১৯৫২ সালের ২৬ জুন কট্টর হিন্দু সংগঠন আরএসএসের (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ) সহযোগিতায় জনসংঘ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন শ্যামাপ্রসাদ। ওই জনসংঘই পরে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি নাম নেয়।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ধারণা ছিল হিন্দুদেরকে মুসলিম আধিপত্যের অধীনে থাকতে বাধ্য করা হবে। তবে বাঙালির মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা আগেও ছিল, পরেও আছে—কিন্তু ওই চল্লিশ দশকের মাঝের বছরগুলিতে সরকারি ক্ষমতার ইন্ধনে যেভাবে বাংলার সমাজ দ্রুত দ্বিখণ্ডিত হয়ে গিয়েছিল, তা বাঙালির ইতিহাসকে চিরতরে পাল্টে দেয়। এর পিছনে শ্যামাপ্রসাদ ও তাঁর দলের ভূমিকা ছিল প্রত্যক্ষ ও স্পষ্ট। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, যেহেতু জিন্নাহ হিন্দু ও মুসলমান দুটি পৃথক জাতি হোক চেয়েছিলেন এবং মুসলমানদের অবশ্যই নিজস্ব রাজ্য থাকতে পারে এমন সুর চড়িয়েছিলেন, অতএব বাংলা ভাগের প্রয়োজন হিন্দুদের ও মুসলিমদেরও। তাঁর সাফ বক্তব্য ছিল, ‘সার্বভৌম অবিভক্ত বাংলা ভার্চুয়াল পাকিস্তান হবে’। যদিও শ্যামাপ্রসাদকে সমর্থন করেনি কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ।
আজ হয়তো এসব ইতিহাস ঘাঁটা বৃথা কাজ। বিধানসভায় যাঁরা দুশো, লোকসভায় যাঁরা দুই-তৃতীয়াংশ, তাঁদের বিরুদ্ধে যেকোনো লেখাই ‘বিরুদ্ধাচরণ’। তবু ইতিহাস তো নিজের মতোই চলবে। রবীন্দ্রনাথ এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে একসঙ্গে মিশিয়ে দেবে কি না বাঙালি, সেটা সামনের কয়েকটা বছর বলবে। তবু সেই বিশ্বকবির শব্দ ধার করে বলি—
রণধারা বাহি জয়গান গাহি
উন্মাদ কলরবে
ভেদি মরুপথ গিরিপর্বত
যারা এসেছিল সবে,
তারা মোর মাঝে সবাই বিরাজে
কেহ নহে নহে দূর,
আমার শোণিতে রয়েছে ধ্বনিতে
তারি বিচিত্র সুর।
এই ‘আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’র মাঝেই বাঁচুন বাঙালির শ্রেষ্ঠ ‘ঠাকুর’। ওই বিচিত্র সুর বাজুক বছরভর। ভারততীর্থে ম্লান হয়ে যাক আর্য, অনার্য, হিন্দু, মুসলমান। বাঙালির ভালো হোক। বাংলা ভাষায় কথা বলা মানুষ এগিয়ে যাক। তার নদী, গ্রাম, সংস্কৃতি, ধর্ম ও নিজস্বতায় বাঁচুক। সত্য পীর বেঁচে থাক সত্যনারায়ণের সিন্নিতে। বাঁচুক প্রশ্ন করা বাঙালি।
















