ছাতিম ফোটে এসময়। সন্ধ্যা হলেই উত্তরের জানালা দিয়ে ভেসে আসে চ্যাপটাফুলের মতোন সেই ঘ্রাণ। ছায়া ছায়া পথ ধরে পড়ে থাকে ঝরা শিউলি৷মাড়িয়ে যায় স্কুলবিকেলের দুই বিনুনি আর হাফ প্যাডেল৷ কখনো বা কেউ কুড়িয়ে নেয় ভেজা রুমালে।রোদেলা দূপুরে গা এলিয়ে বসে ছুটির কমিকস্ বই। টেস্টপেপার হাতে বারান্দায় পায়চারি করে মাধ্যমিকের বাধ্য মেয়ে৷এসব সময় সামলে চলার প্রিয়৷ এসব সময় বড়ই অসাবধানি।
গলির মোড় দিয়ে পেরিয়ে যায় রিক্সাচাকা৷ বিবশ শরীরে ভোর হয়ে আসে ক্রমে৷ আজানুলম্বিত ডানার আড়ালে মড়মড় করে ওঠে হাওয়া। ছাতিমের গন্ধে ম ম করে সারাটা ঘর৷
দিগভ্রান্ত নবাব যেভাবে হারিয়ে ফেলে তার রাজত্ব, তেমনই কোনো নিশ্চয়তায় নিবিড় হয় কালো। মাটি লেপা শেষ হলে মূর্তি হয় প্রতিমা। চক্ষুদানে প্রতিমা হয় জননী…
এ শতাব্দীর শেষ শিশুটি চেয়ে দেখে আকাশের আবছা চাঁদ। দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে যায় ভুখাতুর সজল চোখে। দু হাত উপর করে দোয়া চান মা- ” অন্ন দাও ক্ষুধা নাও নয়তো করো দাহ”।
প্রথিতযশা কোনো গণণাকর বিদর্ভনগরীর পোড়ামাটির পুঁথি উল্টে পাঠ করেন কোন্ এক দূর্বোধ্য শ্লোক৷ সেই সোচ্চার কন্ঠনালীর কম্পনের সাথে সাথে সম্মতির মাথা দোলায় গোটা নগরী৷ রুগ্ন জীর্ণ কুষ্ঠাক্রান্ত কালো কালো শরীরের ভিতর যেন ঘনিয়ে ওঠে শিকড়ে পরিণত হওয়ার জেদ৷ আর উদ্বাস্তু জীবনের ছিন্নমূল নাভি সেই কাঁটাতার বেয়ে দীর্ঘ করে তার আকর্শ৷ যতই চায় মাটি আঁকড়ে ধরে স্থাপত্য হতে, ততই যেন বেয়ে ওঠে মানচিত্রের ওপরতলায় – গুজরাট মণিপুর প্রদেশ…
এসব সময় এলে পায়ের নীচে জমাট বাঁধে খনি।এসব সময় সামলে চলার প্রিয়।এসব সময় বড়ই অসাবধানি।
তোরঙ্গ ঘাটলে রাতের দিকে বেরিয়ে আসে মাইগ্রেশনের কাগজ৷বেরিয়ে আসে সলমাজরির শাড়ি৷ চিন্ময়ী মা র ঘটের কাছে পড়ে থাকে নতুন গামছা৷ কুড়িয়ে নেয় ঢাকির ছেলে৷ ছিনিয়ে নেয় পুরুত৷ নবপত্রিকার স্নান সারা হলে বাসন মাজতে ঘাটে নামে শ্যামা৷ জলে ভেসে যায় দর্পনস্নান৷ ভেসে যায় বাসি ফুল। শ্রমিকের মেয়ে৷ পিঠ বেয়ে নেমে আসে চাপা চাপা ঘাম৷ লিগলিগে শরীরে ফুটে ওঠেনা রমনীয় ভাঁজ৷শিবের উরুতে বসে দেখে উমা। ঘোলাটে জলে ভেসে ওঠে মেয়েটির মুখ৷ সজল চোখে সরিয়ে দেয় স্রোত৷ অথচ একটু তাকালেই সে আবিষ্কার করত তার ত্রিনয়ন৷ অমলের প্রেম প্রস্তাবে সম্মতি দিতে আর কোনো বাধা থাকত না তার৷
এসব সময় বেপাড়ার ছেলেছোকরা রা চুপিসারে জড়ো হয় পাড়ার জলট্যাঙ্কির পিছনে।অন্ধকারে। রোগাপটকা ছোকরাটা চালের বয়াম থেকে লুকিয়ে রাখা মায়ের তিন বাড়ির পাওয়া মাইনে টা ঝেপে দেয়। হেরোয়িন সাথে চোলাই। সেদিন রাতের রাজা ওরা। অষ্টমীর রাতে মায়ের জ্বর আসে। লাইন কেটে দিয়ে যায় ইলেকট্রিক অফিসের লোক। ভারি কালো দেখায় শ্যামাদের টালির ঘরটাকে সে সন্ধ্যায়। সন্ধ্যা পার করে রাতের বেলা গায়ে ময়লা শাড়ি জড়িয়ে তুলসি তলায় একখান আধগলা মোমবাতি জ্বালিয়ে আসে ছোড়দি। অপাংক্তেয় রাজশলাকায় নির্জন প্রগাঢ় অন্ধকারে, জেগে ওঠে স্বজনহারা সভ্যতা। আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হয় আকুতি- ” ক্ষুধা দাও তৃষ্ণা দাও দাও ধারালো আঁচড়”।
নবমী নিশি। ঝরে পড়ে আশীর্বাদ- “শ্রমিকের মেয়ে হও শ্রমিকের মেয়ে হও শ্রমিকের মেয়ে… “

