১৯ ও ২০ শতকের গ্রাম বাংলার পালাবদলে নগরায়নের প্রভাব সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘আত্মশক্তি’ প্রবন্ধে একটি কথা বলেছিলেন–‘আমাদের চণ্ডীমন্ডপ হইতে বিলাতি কারখানাঘরের প্রভূত জঞ্জাল যদি ঝাঁট দিয়া না ফেলি, তবে দুই দিক হইতেই মরিব— ‘ স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মেনে নিতে অসুবিধা হয় না যে সময়ের স্রোতে আমাদের বাংলার চণ্ডীমন্ডপগুলোর বিলীন আমরা নিজের চোখের সামনেই দেখব। এরপরেও রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ রাজর্ষি ‘ উপন্যাসে, ‘ ঘাটের কথা ‘ গল্পে এই চণ্ডীমণ্ডপের কথা উল্লেখ করেছেন। পরবর্তীতে বিভূতিভূষণও এই চণ্ডীমণ্ডপের কথা ভুলে যাননি। বস্তুত তাঁর ‘ ইছামতী ‘ উপন্যাসে যেন এই চণ্ডীমণ্ডপ এর কথা বারবার আসে। খুব সহজে বলা যায় এ যেন কাহিনির অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠেছিল। সময়ের সঙ্গে সবকিছুই পরিবর্তনশীল। মানুষ থেকে সভ্যতা, জীবন থেকে ব্রহ্ম — সবকিছুই সর্বদা পরিবর্তন হয়ে যায় কালের নিয়মে। আজ যে সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা পেছনের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাই, তখন ফেলে আসা ইতিহাস আমাদের অনেক স্মৃতি উসকে দেয়। মন ভারাক্রান্ত করে ফেলে। ভেতরের দৃষ্টি তখন অনিবার্যভাবে সবকিছু স্পষ্ট ভাবে চিনতে পারে।
আমি যে শহরে বড় হয়েছি, সে শহর থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে আমাদের দেশের বাড়ি। চলতি বাংলায় আমরা গ্রামের বাড়ি বলতাম। গ্রাম বলতে একেবারে অজপাড়াগাঁ। বড় রাস্তায় নেমে ধুলোর পথ পেরিয়ে আমাদের গ্রামে ঢোকা যেত। বড় রাস্তার মোড়ের নাম ছিল মনিগ্রাম। আর আমাদের গ্রামের নাম ছিল দোগাছি। খুব ছোটবেলায় এই দোগাছি শব্দ অর্থ খোঁজার চেষ্টা করলে, বাড়ির বড়রা থেকে গ্রামের মোড়ল সবাই বলতো এখানে অর্থাৎ গ্রাম ঢোকার মুখেই, সিংহদ্বারের মতো দুটো গাছ ছিল। যদিও বর্তমানে জ্ঞান অবস্থায় সে গাছ কোনদিন চোখে আসেনি। আর দুটো গাছ থাকার জন্যই এই গ্রামের নাম দোগাছি। হাইরোড থেকে গ্রামে যেতে হতো তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে। পথের দু ধারে শুধু দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ আর মাঠ। দূর দূরান্ত থেকে দিগন্ত রেখা চোখে পড়তো সূর্যাস্তের সন্ধেবেলায়। তখন মনে হতো কি বিরাট গ্রাম আমাদের এই দোগাছি।

গ্রামের ঘোষপাড়ার মধ্যেই ছিল একটি মণ্ডপ। লোকমুখে চণ্ডীমণ্ডপ বলে থাকলেও পরবর্তীতে প্রকৃত অর্থে যে স্থানকে চণ্ডীমণ্ডপ বলা হয়, তার সিকি ভাগও মিল এই মণ্ডপের সাথে ছিল না। তবুও গ্রামের কিছু স্থানীয় আচার অনুষ্ঠান মেনেই মা দুর্গার পুজো হতো এই মণ্ডপে। শাস্ত্র বা ইতিহাসের পাতায় চণ্ডীমণ্ডপের যে সংজ্ঞা আমরা পাই তার থেকে বহু ফারাক ছিল এই মণ্ডপের। সেই সময় এই গ্রামের মূলত দুটো একটা বাড়ি ছাড়া এই মণ্ডপেই হত দুর্গাপুজো। তাই সারা গ্রামবাসী ভিড় করত এই মণ্ডপে। এই দালানেই দেবী দুর্গার আরাধনা চলত চার দিন। গ্রামের বউরা নিয়মনীতি মেনে পুজোর জোগাড়যান্তি শুরু করে দিত। মণ্ডপের সামনেই মাথা খোলা একটি বেদি যেখানে সবাই ভিড় করত। এ পাড়া, ওপাড়া, বেপাড়ার কত লোকজন একত্রিত হতো সেই মণ্ডপ চাতালে। আসলে গ্রামের পুজো আর শহরের পুজোর বিরাট পার্থক্যের একটি প্রধান বিপরীতধর্মী সাদৃশ্য আচার-আচরণে। সেই মন্দিরের ঢাকি বংশপরম্পরায় চলে আসছে। হয়তো তিন চার পুরুষ এভাবেই সামান্য কিছু টাকার জন্য সারা দুর্গাপুজোর সময়টা কাটিয়ে দিত গ্রামের এই ছোট্ট মণ্ডপে। কোন কোন বছর সপ্তমী, অষ্টমী অথবা নবমী পড়ত দুদিন ধরে। তখন সাধারণত চারদিনের পুজোর বাইরে আরো একটা দিন বেশি পুজোর আনন্দ মাতিয়ে রাখত গ্রামের সমস্ত লোকজনকে। প্রথম দিনের কলা বউ স্নান করিয়ে আনা থেকে দশমীর সিঁদুর খেলা। সমস্তটাই এই মণ্ডপে কেটে যেত হু হু করে।

নয়ের দশক। আমরা তখন খুব ছোট। পুজোর সময় আমরা নিজেদের শহর ছেড়ে কখনও গ্রামের বাড়ি যেতাম না। তবুও স্মৃতিতে যেটুকু মনে আসে, দু একবার গ্রামের পুজোয় থাকতে হয়েছিল। সূর্য ডুবে গেলেই গ্রামে অন্ধকার নেমে আসত। মাটির রাস্তায় মিটার কুড়ি পর একটা করে হলুদ আলোর পোল। পোলের মাথায় টিমটিমে হলুদ রঙের বাল্ব। অন্ধকার রাস্তায় কেউ মাঝেমধ্যে লম্ফের আলো ফেলে অথবা অতি পুরনো কারোর ভাঙা টর্চের আলোতে চলে আসছে অন্ধকার পথ ফেলে। দুটো একটা দোকানে কখনো কখনো মোমবাতি বা লম্ফের আলো চোখে পড়ছে থেকে থেকে। সেই সারা বছর কালো অন্ধকার গ্রাম পুজোয় মেতে উঠেছে আলোয়। আজকের সময়ের ইলেকট্রনিক্স অথবা এলইডি লাইটের যে রমরমা, আমাদের শৈশব ও কৈশোরে এই ধরনের আলোর ব্যবহার তখনও সেভাবে আসেনি। তাই গ্রামের একটা চণ্ডীমন্ডপের পুজো ছিল সেই সময়কার দেশপ্রিয় পার্ক অথবা টালা প্রত্যয়। সাবেকি আনার নিদর্শন বলতে আমাদের নয় দশকের পুজোগুলোই আমরা বুঝতাম। এখানেই অনেকটা রাত পর্যন্ত কাটিয়ে দিতাম শুধু কালি ফটকা ফাটিয়ে। এই কালি ফটকাও আজকের সময়ে বিলুপ্ত একটি বাজি।
সেই সময়ে অর্থাৎ নয়ের দশকে আমরা যে সময় বড় হয়ে উঠছি, মাত্র ৫ টাকায় একটা কালিপটকা প্যাকেট পাওয়া যেত। তেঁতুল বিচ্ছের মত দেখতে পনেরোটা পনেরোটা করে মাঝখানের সলতে দিয়ে বাঁধা থাকতো। আর একটু বড় বোম হিসেবে থাকতো চকলেট। গ্রামের ছোট ছোট পাড়ার ছেলেমেয়েরা চলে আসতো সেজেগুজে। আসলে আমাদের উন্মাদনা ছিল অনেক, ইচ্ছা ছিল গগনচুম্বী, আবেগ ছিল বাঙালিয়ানা। সময় যত এগিয়েছে কর্মব্যস্ততা, উপার্জন সবকিছুই আমাদের অল্প অল্প করে সরিয়ে দিয়েছে জীবন থেকে। একসঙ্গে বেশ কিছুজন বন্ধু-বান্ধব মিলে আড্ডা দিচ্ছে আজকের সময় এমন দৃশ্য বিরল। এখন আমাদের সময় কেটে যায় মোবাইলের স্ক্রল করতে করতে। তাই চণ্ডীমণ্ডপের ফেলে আসা পুজোর আমেজ আজও কোথাও আমাদের মনকে নাড়া দেয়। অনুরণিত হয় ফেলে আসা স্মৃতি, ফেলে আসা সময়, আজকে আমাদের গ্রামের চণ্ডীমণ্ডপ কতটা পরিবর্তন হয়ে গেছে সভ্যতার চলার পথে।
নবমীর বলি ছিল চোখে পড়ার মতো। গ্রামের কতশত মানুষ তাদের মানদ অঙ্গীকার পূরণ করতো বলি দিয়ে। কখনো ছাগ বলি, কুমড়ো বলি। আবার কখনও আখ বলি দিত। তাও অন্যান্য জায়গার মতো আমাদের ঘোষপাড়ার ঠাকুরের বলি কমই হতো। ছোটবেলায় এই বলি দেখতে সত্যিই মন কেমন হতো। বড়দেরকে হয়তো কষ্ট করেই বলতাম এভাবে ছাগলগুলোকে গলা কেটে ফেললে, ওদের যন্ত্রণা হয় না? ওদের কষ্ট হয় না? ওদেরও তো ছেলে-মেয়ে আছে? ওরাও তো কারোর বাবা-মা? ছোট মুখে কথাগুলো কানে যেত না কারোর। কারণ বলির রক্ত দিয়েই পুজো হতো মায়ের।
অনেকগুলো বছর পর যখন বড় হয়েছি, রবীন্দ্রনাথ পড়তে শিখেছি, পড়েছি শরৎচন্দ্র। তখন সেই শৈশবের স্মৃতি কোথাও যেন আজকের দিনে দাঁড়িয়ে অসংখ্য প্রশ্ন তুলে দিত। যে মৃত্যু এক প্রকার হত্যা, তা যে পাপ। আজও এই প্রশ্ন অনেক সময় মাথায় আসে! কিন্তু প্রশ্ন করার মানুষ পাওয়া যায় না! সবকিছুই কোথাও যেন ধর্মের খেলা। ধর্মের পরিহাস রাজনীতির আড়ালে। আসলে আমরা কোথাও একটা রাজনীতি শিখে গেছি, ধর্মীয় মেরুকরণের ভিত্তিতে।
একটা চণ্ডীমণ্ডপ, কোথাও আমাদের মহা উৎসবের মিলনক্ষেত্র হয়ে যায়। এখানেই চলে চণ্ডীপাঠের আসর। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আসর এখন আর প্রায় দেখাই যায় না। তবুও কিঞ্চিত যারা ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে তারা বহাল রাখতে পেরেছে তাদের সংস্কার। ঢাকির ভৈরবী সুর কোথাও মা দুর্গার আগমনের বার্তাকে উস্কে দেয়। চন্ডীমণ্ডপের চাতালের সামনের মাঠে মেলা বসে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ভিড় করে। বাড়ির বউরা নিত্যসামগ্রিক কিনতে ব্যস্ত হয়ে যায়। পুরুতমশাই, মন্ত্র উচ্চারণ করতে তৎপর হয়।
দেখতে দেখতে চারদিন দ্রুত পার হয়ে যায়। বেদী থেকে ঠাকুর নামিয়ে চণ্ডীমণ্ডপে রাখা হয়। গ্রামের বাড়ির মেয়ে বউরা এসে ঠাকুর বরণ করে। আলতা সিঁদুর আর মিষ্টি মুখে মাকে বিদায় জানানোর পালা। আমাদের গ্রামে ধনাপুকুর নামে একটা পুকুর আছে। সেখানেই বিজয়া সেরে গ্রামের পুরুষরা ঠাকুর কাঁধে নিয়ে পুকুরের জলে ভাসিয়ে দেয়।
দশমী পেরিয়ে গেলে চণ্ডীমণ্ডপ ফাঁকা হয়ে যায়, আবার বছরভর প্রতীক্ষার জন্য বিসর্জনের পর টিম টিম করে আলো জ্বলে, আমরা মন খারাপ করে বসে থাকি, আবার একটা বছর বছরের অপেক্ষায়।

