পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে রাস্তা নামকরণের রাজনীতি,লেনিন-মার্ক্স-হো চি মিন সরণি পরিবর্তনের প্রস্তাব

৩৩ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

পশ্চিমবঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাস্তার নাম পরিবর্তন নিয়ে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা কেবল নামকরণের ভৌগোলিক বদল নয়, বরং এটি রাজ্যটির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দেয়। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের গঠিত একটি ১০ সদস্যের উপদেষ্টা কমিটি কলকাতার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব বিবেচনা করতে চলেছে। এই তালিকায় রয়েছে কার্ল মার্ক্স সরণি, লেনিন সরণি এবং হো চি মিন সরণির মতো আন্তর্জাতিক বামপন্থী ব্যক্তিত্বদের নামে নামাঙ্কিত রাস্তাগুলি।


​এই ১০ সদস্যের উপদেষ্টা কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন স্বামী প্রদীপ্তানন্দ (কার্তিক মহারাজ)। কমিটিতে প্রাক্তন মেঘালয় রাজ্যপাল তথা বিজেপি নেতা তথাগত রায়, মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা সুব্রত গুপ্ত এবং কলকাতা পুরনিগমের কমিশনার স্মিতা পান্ডের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। কমিটির প্রধান কার্তিক মহারাজের বক্তব্য অনুযায়ী, রাস্তাগুলির নতুন নামকরণের ক্ষেত্রে যে ব্যক্তিত্বদের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে, ভারতীয় ও বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁদের প্রাসঙ্গিকতা কতটা, তা খতিয়ে দেখা হবে।


​এই প্রক্রিয়ার প্রথম পর্যায়ে কলকাতার রাস্তাগুলিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যেই ‘বিশ্ব বাংলা সরণি’-র নাম পরিবর্তন করে ‘শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য অ্যাভিনিউ’ রাখার একটি প্রস্তাবের কথা সামনে এসেছে। অন্যদিকে, প্রাক্তন রাজ্যপাল তথাগত রায় স্পষ্টতই জানিয়েছেন যে লেনিন ও মার্ক্সের মতো আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট ব্যক্তিত্বদের নামাঙ্কিত রাস্তাগুলির পরিবর্তন হওয়া উচিত। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, লেনিন সরণির নাম পরিবর্তন করে প্রখ্যাত গণিতবিদ ও ভারতীয় জনসংঘের সভাপতি দেবপ্রসাদ ঘোষের নামে করার প্রস্তাব তিনি কমিটির সামনে তুলবেন।
​এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বামফ্রন্ট সরকার পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় থাকার সুবাদে কলকাতার বহু রাস্তা, চত্বর এবং জনবহুল এলাকার নাম আন্তর্জাতিক বামপন্থী ও সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের প্রবক্তাদের নামে রাখা হয়েছিল। কার্ল মার্ক্স, ভ্লাদিমির লেনিন বা ভিয়েটনামের বিপ্লবী নেতা হো চি মিন-এর নামগুলি একসময়ে বাংলার রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী মহলে আন্তর্জাতিকবাদের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।


​আজকের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, যখন রাজ্যে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এবং প্রধান বিরোধী দল বিজেপির মধ্যে আদর্শগত ও রাজনৈতিক লড়াই তীব্র, তখন এই নামকরণের বিতর্কটি এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। একদিকে যেখানে বামপন্থীরা একে তাদের ঐতিহাসিক ও আদর্শগত পরিচয় মুছে ফেলার বা রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর আঘাত বলে মনে করছেন, অন্যদিকে প্রবক্তারা একে ঔপনিবেশিক বা অ-বাঙালি প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে দেশীয় এবং আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও মনীষীদের সম্মান জানানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।

রাজ্য রাজনীতিতে এটি কেবল একটি প্রশাসনিক বা নাম বদলের সিদ্ধান্ত নয়; এটি ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন এবং রাজনৈতিক পরিসরে আধিপত্য বিস্তারের একটি সুচিন্তিত পদক্ষেপ।​কার্ল মার্ক্স, লেনিন কিংবা হো চি মিন সরণির নাম বদলের এই প্রস্তাব কেবল ফলক পরিবর্তনের বিষয় নয়, এটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বিবর্তনের এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। অতীতে কোন রাজনৈতিক দল কোন আদর্শকে প্রাধান্য দিয়ে শহরের মানচিত্র গড়ে তুলেছিল এবং বর্তমান প্রশাসন কীভাবে সেই মানচিত্রকে নতুন রূপ দিতে চাইছে—এই পুরো প্রক্রিয়াটি বাংলার মনন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গভীর রেখাপাত করবে। এই বিতর্ক আগামী দিনে বাংলার রাজনীতিতে আদর্শের লড়াইকে আরও তীব্র করে তুলবে বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত।
​

অন্যান্য প্রতিবেদন.