আজ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মের দেড়শো বছর। তাঁকে নিয়ে আজকের দিনে অনেক কথাই খুব সহজে বলা যায়। তিনি শুধু লেখালেখি করেই বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। অসংখ্য শক্তিশালী নারীচরিত্র কে আমাদের সামনে নিয়ে এসে ছিলেল। সহজ ভাষায় পাঠকের খুব কাছের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। আরো অনেক কিছু। এগুলো সবই সত্যি। কিন্তু দেড়শো বছর পরে অন্য একটা প্রশ্ন আমাকে বেশি ভাবায়। রাত বারোটায় বিছানায় শুয়ে যে মানুষটি Netflix বা অন্য কোনও OTT-তে ‘আর একটা এপিসোড’ দেখতে দেখতে রাত দুটো করে ফেলেন, তাঁর কাছে শরৎচন্দ্র এত পুরনো কেন হবেন?

একবার দেবদাস-এর গল্পটা আজকের কোনও সিরিজের পিচ হিসেবে ভাবুন। দেবদাস পার্বতীকে ভালোবাসে। পার্বতীও নিজের ইচ্ছা গোপন করে না। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় দেবদাসের সামনে পরিবার, সামাজিক মর্যাদা আর নিজের দুর্বলতা এসে দাঁড়ায়। পার্বতী রাতে তার কাছে আসে। দেবদাস বাবার কাছে বিয়ের কথা তোলে ঠিকই, কিন্তু আপত্তির সামনে দাঁড়াতে পারে না। কলকাতায় গিয়ে উল্টে পার্বতীকে প্রত্যাখ্যানের চিঠি লেখে। তারপর আবার মত বদলায়। ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। অর্থাৎ ভাগ্য একা ট্র্যাজেডি ঘটায়নি; দেবদাস নিজেই দেরি করে তার জমি তৈরি করেছে। শেষে সে পার্বতীর বাড়ির দরজা পর্যন্ত পৌঁছয়। শরৎচন্দ্র তখন খুব সাধারণ একটা সত্যকে অসাধারণ দৃশ্যে বদলে দেন—পৌঁছনো আর সময়মতো পৌঁছনো এক কথা নয়।
আমরা ‘মেলোড্রামা’ শব্দটাকে একটু নীচু চোখে দেখি। যেন বুদ্ধিমান দর্শক আবেগের গল্প দেখেন না। অথচ আজকের সিরিজ, সিনেমা, এমনকি দেড় মিনিটের রিলও বারবার না-বলা কথা, না-পাওয়া মানুষ, সামাজিক বাধা, অহংকার আর দেরির কাছেই ফিরে যায়। চলচ্চিত্র-গবেষক কোয়েল ব্যানার্জি তাঁর From Devdas to Dev.D: Melodrama, Mourning and Nostalgia প্রবন্ধে বিমল রায়ের Devdas, সঞ্জয় লীলা বনশালির Devdas এবং অনুরাগ কাশ্যপের Dev.D পাশাপাশি রেখে দেখেছেন। তিনটি ছবিতে nostalgia-র চেহারা এক নয়। সময় বদলেছে, তাই loss আর mourning-এর অর্থও বদলেছে। একই দেবদাসকে তিনটি সময় নিজের মতো করে তৈরি করেছে। গল্পটা পুরনো হয়নি, কারণ প্রত্যেক যুগ নিজের হারানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে আবার তার কাছে ফিরে গেছে।

পরিণীতা-য় শরৎচন্দ্র অন্য পথে একই সমস্যাকে ধরেন। ললিতা ছোটবেলা থেকেই শেখরদের বাড়ির ঘনিষ্ঠ। শেখরের সঙ্গে তার সম্পর্কের ভিতরে স্নেহ, নির্ভরতা, অভ্যাস, প্রেম আর অধিকার একসঙ্গে মিশে আছে। কিন্তু গুরুচরণের ঋণ, নবীন রায়ের সম্পত্তির হিসাব আর গিরীনের আগমন সম্পর্কটাকে অন্য দিকে ঠেলে দেয়। মালা বদলের সেই গোপন মুহূর্তের পরেও শেখর নিজের সম্পর্কের অর্থ প্রকাশ্যে মেনে নিতে পারে না। সে ললিতাকে ভালোবাসে, কিন্তু ললিতাকে নিজের থেকে আলাদা একজন স্বাধীন মানুষ হিসেবে দেখতে তার সময় লাগে। ঈর্ষা আর অধিকারবোধ তার বিচারকে আচ্ছন্ন করে। এখানে বাইরের সমাজ একা প্রেমের সমস্যা তৈরি করে না। প্রেমিক নিজেই সমাজের ক্ষমতার ভাষা নিজের সম্পর্কের ভিতরে নিয়ে আসে।
এই বছর প্রকাশিত The Temporality of Longing: Waiting, Silence, and Emotional Time in Sarat Chandra Chattopadhyay’s Parineeta প্রবন্ধে গবেষক সুপ্রিয়া ঠিক এই অপেক্ষার জায়গাটিকেই সামনে এনেছেন। তিনি ঘড়ির মাপা সময়ের বদলে অপেক্ষা, নীরবতা এবং মানুষের মনের ভিতরে অনুভূত সময়কে গুরুত্ব দিয়েছেন। একশো বছরেরও বেশি পুরনো পরিণীতা-কে এই দিক থেকে পড়লে আজকের ‘instant communication’-এর যুগেও অস্বস্তিটা থেকেই যায়। আমরা সঙ্গে সঙ্গে বার্তা পাঠাতে পারি। কিন্তু সম্পর্ক কি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয়? দেয় না।
গৃহদাহ-এর ক্ষেত্রে প্রশ্নটা আরও কঠিন। মহিম, অচলা আর সুরেশের সম্পর্ককে শুধু প্রেমের ত্রিভুজ বললে উপন্যাসটাকে ছোট করে দেখা হবে। অচলা নিজের পছন্দে মহিমকে বিয়ে করে, কিন্তু বিয়ে তার সমস্ত দ্বিধার উত্তর দেয় না। মহিমের স্বভাব, অচলার প্রত্যাশা, সুরেশের আকর্ষণ আর সামাজিক নিয়ম পরস্পরের সঙ্গে ধাক্কা খায়। শরৎচন্দ্র এখানে বিয়েকে প্রেমের নিরাপদ শেষ অধ্যায় বানান না। বরং দেখান, মানুষ অনেক সময় সম্পর্ক তৈরি করার পর নিজের ইচ্ছার অর্থ বুঝতে শুরু করে। ঘর তাই শুধু আশ্রয় নয়। ভুল বোঝা, সন্দেহ, আকর্ষণ আর অসম ইচ্ছা সেই ঘরের ভিতরেই আগুন ধরাতে পারে।

ইতিহাসবিদ বিপাশা রাহা ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় শরৎচন্দ্রের রচনার ভিতরে গ্রামীণ সমাজ, শ্রেণি, জাতপাত, জমি, দারিদ্র্য, ঋণ, শোষণ এবং সামাজিক ক্ষমতার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন। এই পাঠ আমাদের একটা দরকারি সংশোধন করে দেয়। শরৎচন্দ্র শুধু মানুষের আবেগ নিয়ে লেখেননি; কোন সমাজ সেই আবেগের দাম ঠিক করে দেয়, সেটাও তিনি দেখেছেন। দেবদাসের সিদ্ধান্ত, ললিতার অবস্থান কিংবা অচলার সংকট তাই নিছক ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়। তাদের ভালোবাসার ঘরেও পরিবার, সম্পত্তি, জাত, শ্রেণি আর সামাজিক ক্ষমতা ঢুকে বসে আছে।
এবার একটু কল্পনা করুন। দেবদাসের হাতে একটা স্মার্টফোন দিন। সে কি পার্বতীকে WhatsApp করত? ‘Typing…’ দেখিয়ে আবার সব মুছে দিত? মাঝরাতে পুরনো চ্যাট স্ক্রল করত? হয়তো পার্বতীর Last Seen দেখত। প্রশ্নটা শুনতে হাসির। সমস্যাটা কিন্তু নয়। প্রযুক্তি যোগাযোগের গতি বাড়িয়েছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ায়নি। আজ মানুষ এক সেকেন্ডে বার্তা পাঠাতে পারে, অথচ ‘Seen’ আর উত্তরের মাঝখানে একটা গোটা সম্পর্ক শেষ হয়ে যেতে পারে।
তাই শরৎচন্দ্রকে Netflix-এর পূর্বপুরুষ বলা অবশ্যই একটু রসিকতা। কিন্তু তুলনাটার ভিতরে একটা সত্যি আছে। মিল প্রযুক্তিতে নয়, গল্পের সময় ব্যবহারে। ভালো সিরিজ জানে, দর্শক শুধু জানতে চায় না এরপর কী ঘটবে। সে আরও একটা প্রশ্নের উত্তর চায়—মানুষ সময় থাকতে নিজের ভুল বুঝবে কি না। শরৎচন্দ্রও পাঠককে সেই অপেক্ষায় রাখেন। দেবদাস সিদ্ধান্ত নেবে কখন? শেখর নিজের অধিকারবোধ চিনবে কখন? অচলা নিজের ইচ্ছার ভিতরের দ্বন্দ্ব বুঝবে কখন? ঘটনা এগিয়ে যায়, বোঝাপড়া পিছিয়ে থাকে। আর ঠিক এই ফাঁকটার ভিতরেই তৈরি হয় গল্প।
হোর্হে লুইস বোর্হেস ১৯৪৬ সালের “A New Refutation of Time” প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “Time is the substance I am made of.” মানুষের বিপদ এখানেই। আমরা শুধু সময়ের মধ্যে থাকি না, সময় দিয়েই তৈরি হই। অথচ সেই সময় একবার চলে গেলে তাকে উল্টো দিকে চালানো যায় না। শরৎচন্দ্রের তিনটি উপন্যাসেও সময় ঠিক এই কঠিন কাজটাই করে। দেবদাস বোঝে, কিন্তু দেরিতে। শেখর নিজের অধিকারবোধের ভুল বুঝতে সময় নেয়। অচলা নিজের ইচ্ছার ভিতরের দ্বন্দ্ব বুঝতে বুঝতেই দেখে, সম্পর্ক তার আগেই দাম চেয়ে বসেছে।
তাই শরৎচন্দ্র শেষ পর্যন্ত প্রেমের চেয়েও বড় একটা প্রশ্ন করেন—মানুষ কি সময় থাকতে নিজেকে চিনতে পারে?
দেড়শো বছর পরে প্রশ্নটা বরং আরও অস্বস্তিকর। কারণ এখন আমাদের ফোনে ‘Undo’ আছে, পর্দায় ‘Replay’ আছে, OTT-তে ‘Skip’ করার সুযোগও আছে। কিন্তু সময় কি কোনও সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশ করে? না। সময়ের কোনও দ্বিতীয় সংস্করণ নেই। মানুষ শুধু দেরিতে বুঝতে পারে কোনটা ভুল হয়েছিল।

