জীবনের তাগিদে বুকজলে পাঁক মেখে নামে খেতমজুর নারীরা, আয় ৫০টাকা!

৬ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​বাঁকুড়ার বিকনা অঞ্চলের তালডাংরা গ্রামের বাউরিপাড়ার খেতমজুর পরিবারের নারীদের প্রতিদিনের জীবনসংগ্রাম শুধু একটি সংবাদ প্রতিবেদন নয়, বরং এটি ভারতের পল্লি অর্থনীতি, সামাজিক সুরক্ষা এবং প্রশাসনিক উদাসীনতার এক নির্মম দলিল। মাত্র ৫০ টাকা রোজগারের আশায় বিষাক্ত জল ও জোকের কামড় সহ্য করে তাদের গুগলি কুড়ানোর দৃশ্য আমাদের তথাকথিত উন্নয়নের দাবিকে এক গভীর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

​মাটি কাটার কাজ বিগত চার বছর ধরে বন্ধ। তারসাথে রাজমিস্ত্রির জোগালের কাজের তীব্র অভাব গ্রামীণ পরিবারগুলোকে চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।​রেশনের চাল দিয়ে পুরো পরিবারের পেট ভরে না। ফলে মাত্র ১০ টাকা কেজি দরে শামুক বিক্রি করে দিনে মোটে ৫০ টাকা রোজগার করতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা।​কৃষিতে রাসায়নিক সারের বহুল ব্যবহার ও আধুনিকীকরণের ফলে ধানের জমিতে প্রাকৃতিকভাবে শামুক বা দেশি মাছ পাওয়া যায় না, যার ফলে বাধ্য হয়ে দুর্গন্ধযুক্ত ও দূষিত পুকুরের জলে নামতে হচ্ছে তাঁদের।
​
​সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার—বিশুদ্ধ পানীয় জল, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং বাসস্থান—এখানে সম্পূর্ণ উপেক্ষিত।​গ্রামের একটিমাত্র টিউবওয়েল আয়রনযুক্ত জল দেয়, আর পানীয় জলের জন্য তাদের নির্ভর করতে হয় প্রাইমারি স্কুলের টিউবওয়েলের ওপর।​বাধ্য হয়ে যে পুকুরের জলে তাঁরা স্নান করেন এবং জামাকাপড় কাচেন, তার ৫০ ফুট দূর থেকেও দুর্গন্ধ ছড়ায় এবং ওপরে ময়লার মোটা স্তর জমে থাকে।
​সারাদিন এই বিষাক্ত জলে দাঁড়িয়ে থাকার ফলে চুলকানি, জোকের কামড় এবং চর্মরোগ নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, প্রতিবন্ধী সন্তান ও পরিবারের ভরণপোষণের তাগিদে এই অমানবিক অবস্থাকেই ভাগ্য বলে মেনে নিয়েছেন তারা।
​
​পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে প্রশাসনের উচ্চস্তর পর্যন্ত ঘুরেও এই তফসিলি জাতিভুক্ত খেতমজুর পরিবারগুলো কোনো সুরাহা পায়নি।​ভোটের সময় উন্নয়ন ও কাজের প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ফুটলেও বাস্তবে তালডাংরার বাউরিপাড়ার মানুষের দরজায় সেই প্রতিশ্রুতির আলো পৌঁছায়নি।​সরকারি জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বা সামাজিক সুরক্ষা যোজনার সঠিক রূপায়ণের অভাব প্রান্তিক মানুষকে চরম দারিদ্র্যের চক্রে আটকে রেখেছে।

​তালডাংরার বাউরি নারীদের প্রতিদিনের জীবন সংগ্রাম প্রমাণ করে যে, দেশের সামগ্রিক জিডিপি বা বড় বড় উন্নয়নের খতির আড়ালে সাধারণ মানুষের মৌলিক বেঁচে থাকার লড়াই কতটা যন্ত্রণাদায়ক। এটি কেবল স্থানীয় প্রশাসনের ব্যর্থতা নয়, বরং নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রান্তিক মানুষের উপেক্ষিত থাকার এক রাজনৈতিক দলিল। দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য প্রয়োজন গ্রামীণ কর্মসংস্থানের সুনির্দিষ্ট সুযোগ তৈরি করা, বিশুদ্ধ পানীয় জল এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। অন্যথায়, গণতন্ত্রের প্রাঙ্গণে এই ধরনের মানবিক বিপর্যয় নাগরিক অধিকারের প্রশ্নটিকে চিরকাল জাগিয়ে রাখবে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.