গঙ্গা ও ফুলহার নদীর জলস্তর বিপদসীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় মালদা জেলার মানিকচক ব্লকের ভুতনি চরে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিহার ও উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা জলের চাপে হিরানন্দপুর, উত্তর চণ্ডীপুর ও দক্ষিণ চণ্ডীপুর, এই তিনটি পঞ্চায়েতের প্রায় ৫৬টি গ্রাম এখন সম্পূর্ণ জলের তলায়। মূল সেতু সংলগ্ন বাঁধের রাস্তা তলিয়ে যাওয়ায় মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, যাতায়াতের একমাত্র ভরসা এখন নৌকা ও স্পিডবোট। হাজারেরও বেশি পরিবার ইতিমধ্যে গৃহহীন হয়ে খোলা আকাশের নিচে, প্রায় ৫০ টি গ্রাম জলের তলায়।
গঙ্গা ও ফুলহার ক্রমশ গিলে চলেছে ভুতনির চর। অবস্থা এতটাই সংকটপূর্ণ যে ভুতনির নারায়নপুরে মাত্র ৪৫০ মিটার জমি বাকি রয়েছে। নদী সেই জমিটুকু গিলে নিলে দুই নদীর মিশে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তা ঘটলে বদলে যেতে পারে গঙ্গার গতিপথ। বড় বিপদ ধেয়ে আসতে পারে দক্ষিণবঙ্গে। শুধু মালদা, মুর্শিদাবাদ নয় এই বিশাল জলের ধাক্কা সহ্য করতে হবে কলকাতাকেও। বিশেষজ্ঞদের দাবি, এই আচরণ কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে আঘাত পৌঁছবে এবং ক্ষতি করবে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রকে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কেশরপুর কলোনি এলাকা, যেখানে মাত্র একদিনেই কয়েকশো মিটার এলাকা গঙ্গাগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা পাঁচু চৌধুরীর মতো অনেকের অভিযোগ, বালির বস্তা বা বাঁশের অস্থায়ী ব্যবস্থা দিয়ে সাময়িক কাজ চালানো হলেও দীর্ঘমেয়াদে কোনো লাভ হচ্ছে না। স্থায়ী কংক্রিটের ভাঙন-প্রতিরোধ ব্যবস্থা ছাড়া প্রতি বছর একই দুর্ভোগ ফিরে আসবে।
আসলে এই সংকট একেবারেই নতুন কিছু নয়। ফরাক্কা ব্যারাজ তৈরির পর থেকে গত প্রায় পাঁচ দশক ধরে গঙ্গা ও ফুলহার নদী নিজেদের গতিপথ বদলে দক্ষিণ-পশ্চিম মালদার জনজীবন প্রতি বছর বিপর্যস্ত করে আসছে। প্রতি বর্ষায় বাড়িঘর হারানো মানুষ ভোটের সময় নেতাদের প্রতিশ্রুতি শোনেন, কিন্তু বছর ঘুরতেই দেখা যায় সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি। শুধু বদলে যায় বন্যা-উদ্বাস্তুদের ঠিকানা, আর গ্রামের মানচিত্র মুছে গিয়ে নদীর গর্ভে হারিয়ে যায়।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতির জেরে রাজ্য সরকারের তরফে মালদার ভাঙন-বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে রিপোর্ট তলব করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে লক্ষণীয় বিষয়, এই পদক্ষেপ এসেছে পরিস্থিতি চরমে ওঠার পরই, প্রতিরোধমূলক কোনো ব্যবস্থা হিসেবে নয়। জেলা প্রশাসন ত্রাণ পাঠানোর চেষ্টা করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে দুর্গতদের অভিযোগ, আর প্রতি বছর একই এলাকায় একই বিপর্যয় ঘটা সত্ত্বেও কোনো স্থায়ী সমাধানের দিকে না এগোনোয় স্থানীয়দের ক্ষোভ বাড়ছে। আপাতত, কোনোভাবে ফুলহারের এই বিশাল জলধারাকে বিমুখে, মহানন্দার গতিতে ঘুরিয়ে দিলেই এই সমস্যার অবসান ঘটতে পারে।

সংবাদমাধ্যমগুলোর কাঠামো এই ধরনের “ধীরে ধীরে ঘটতে থাকা” দুর্যোগের বিপক্ষে কাজ করে। ভুতনি চরের মতো এলাকায় ভাঙন-বন্যা ঘটে প্রতি বছর, একই মরসুমে, একই এলাকায়। ফলে এটা সংবাদমাধ্যমের কাছে ‘ নতুন খবর ‘মনে হয় না, বরং পুরনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখা হয়। অথচ ভুক্তভোগীদের কাছে প্রতিটি বছরই সমান তীব্র, সমান বিধ্বংসী।
তাছাড়াও, এই এলাকাগুলো ভৌগোলিকভাবে প্রান্তিক (কলকাতা থেকে দূরে ), জনবসতি তুলনামূলকভাবে কম ঘনবসতিপূর্ণ, আর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের বেশিরভাগই দরিদ্র কৃষক বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। যাঁদের কণ্ঠস্বর জাতীয় স্তরের সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তে সহজে জায়গা পায় না। ফলে এই সংকট বছরের পর বছর ধরে শুধু আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়, জাতীয় স্তরে বড় আকারে আলোচিত হয় না।
এই ঘটনায় প্রশাসনিক পদক্ষেপও ভীষণই স্বল্প প্রতিক্রিয়াশীল। বিপর্যয় ঘটার পর রিপোর্ট তলব, ত্রাণ পাঠানো, সাময়িক মেরামতি ওটুকুই। যেহেতু এই সংকট কখনো একটামাত্র বড় ঘটনা হিসেবে গণমাধ্যমের চাপ তৈরি করে না, তাই সরকারের ওপরেও স্থায়ী, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য যে ধরনের রাজনৈতিক ও জনমতের চাপ দরকার, তা তৈরি হয় না। ফলে চক্রটা প্রতি বছর একইভাবে ফিরে আসে। যতক্ষণ না এই ধরনের ধীরগতির, পুনরাবৃত্ত সংকটগুলো সংবাদমাধ্যমের অগ্রাধিকার তালিকায় জায়গা পাচ্ছে, ততক্ষণ ভুতনি চরের মতো এলাকার মানুষেরা এই দুর্ভোগের মধ্যেই থেকে যাবেন।

