বার্লিন—আজকের ইউরোপের মানচিত্রে যে শহরটি শান্ত ও ঐক্যবদ্ধ জার্মানির রাজনৈতিক হৃৎপিণ্ড, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে এবং সেই মহাযুদ্ধের অগ্নিগর্ভে সেই শহরই হয়ে উঠেছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া এক গোপন বিপ্লবের রঙ্গমঞ্চ। প্রমত্ত স্প্রে নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই মহানগরী শুধু হিটলারের থার্ড রাইখের রাজধানী ছিল না, বরং এটি ছিল পরাধীন ভারতের মুক্তি-আন্দোলনের এক দুর্দান্ত আন্তর্জাতিক আঁতুড়ঘর। বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মতো দূরদর্শী বিপ্লবীদের হাত ধরে যে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের বীজ রোপিত হয়েছিল, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর পদার্পণে বার্লিন ভারতীয় স্বাধীনতার এক মহাকাব্যিক উপাখ্যানে রূপ নেয়।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল স্রোত যখন মূলত দেশের ভেতরে অহিংস আন্দোলন ও গুপ্ত বিপ্লবের সীমানায় আবদ্ধ, তখন ইউরোপের মাটিতে দাঁড়িয়ে একদল স্বপ্নদ্রষ্টা অনুধাবন করেছিলেন যে, ব্রিটিশ সিংহকে ঘায়েল করতে হলে আন্তর্জাতিক মিত্রতার প্রয়োজন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই ‘বার্লিন কমিটি’ বা পরবর্তীতে কমিন্টার্ন (Comintern)-এর সাথে সংযোগ স্থাপন করে ভারতের মুক্তি আন্দোলনকে বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে নিয়ে আসার মূল কারিগর ছিলেন বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়।
লেনিন ও কমিন্টার্নের নেতাদের সাথে ভাববিনিময় করে বীরেন্দ্রনাথ এবং তাঁর সঙ্গীরা উপলব্ধি করেন—শত্রুর শত্রু মিত্র। বার্লিন হয়ে ওঠে সেই মিলনমেলা, যেখানে আয়ারল্যান্ড, মিশর, তুরস্ক এবং রাশিয়ার মুক্তিকামী মানুষেরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে সমূলে উৎখাত করার গোপন নকশা তৈরি করতেন। বার্লিনের রাজনৈতিক কুয়াশা আর কফিহাউসের তাত্ত্বিক আলোচনা ধীরে ধীরে পরাধীন ভারতের মুক্তি সংগ্রামকে এক বৈশ্বিক রূপ দিতে শুরু করে।
১৯৪১ সালের গোড়ার দিকে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের চোখে ধুলো দিয়ে ছদ্মবেশে কলকাতায় নিজের বাসভবন ত্যাগ করেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। পেশোয়ার ও কাবুল হয়ে আফগানিস্তান ও রাশিয়ান সীমান্ত পেরিয়ে তিনি যখন হিটলারের বার্লিনে এসে পৌঁছান, তখন বিশ্বযুদ্ধ তার চরম রূপ নিয়েছে। বার্লিনকে বেছে নেওয়ার পেছনে ছিল গভীর ভূরাজনৈতিক হিসাব। একদিকে জার্মানি ছিল ব্রিটেনের মরনপণ শত্রু, অন্যদিকে ইউরোপের এই কেন্দ্রবিন্দু থেকে আন্তর্জাতিক প্রচার ও সামরিক সাহায্য সংগ্রহ করা তুলনামূলক সহজ ছিল।

নেতাজীর এই বার্লিন আগমন ছিল বিলেতি কূটনীতির বুকে এক বজ্রাঘাত। পরাধীন ভারতের এক আপসহীন নেতা হিটলারের বার্লিনে গিয়ে উপস্থিত হয়েছেন—এই খবর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নীতিনির্ধারকদের ঘুম উড়িয়ে দিয়েছিল। নেতাজী বুঝেছিলেন, ভারতের স্বাধীনতা কেবল দেশীয় সত্যাগ্রহ দিয়ে অর্জিত হবে না; এর জন্য প্রয়োজন বিশ্বযুদ্ধের জটিল সমীকরণকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করা।
বার্লিনে পা রেখেই নেতাজী শুধু রাজনৈতিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেননি, তিনি গড়ে তুলেছিলেন সাংগঠনিক কাঠামো। জার্মান সরকারের আর্থিক ও সামরিক সহায়তায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ফ্রি ইন্ডিয়া সেন্টার’ (Free India Centre)। এখানেই তৈরি হয় স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত এবং সরকারের রূপরেখা।
তবে বার্লিন থেকে পরিচালিত তাঁর সবচেয়ে বড় ও ঐতিহাসিক অস্ত্রটি ছিল ‘আজাদ হিন্দ রেডিও’ (Azad Hind Radio)। বার্লিন ও পরে বিভিন্ন ইউরোপীয় কেন্দ্র থেকে সম্প্রচারিত এই রেডিওর গম্ভীর ও জাদুকরী কণ্ঠস্বর— “আমি সুভাষ বলছি…”—মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বজুড়ে। আটলান্টিক থেকে ভারত মহাসাগর, কিংবা পূর্ব এশিয়ার জঙ্গল থেকে বার্লিনের বাংকার—সব জায়গায় ভারতীয় সেনানি ও সাধারণ মানুষ এই রেডিওর মাধ্যমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধের ডাক শুনতে পেয়েছিল। জার্মানি, ইতালি এবং জাপানের রেডিও নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে এই সম্প্রচার পরাধীন ভারতের জনগণের মনে আশার এক নতুন প্রদীপ জ্বেলে দিয়েছিল।
ভৌগোলিক নিরাপত্তা, ব্রিটিশ-বিরোধী ভূরাজনীতি এবং জার্মান সরকারের সামরিক ও আর্থিক সহায়তার কারণেই বার্লিন ভারতের বাইরে স্বাধীনতার লড়াইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক কেন্দ্রবিন্দুতে রূপান্তরিত হয়েছিল। বার্লিনের পিচঢালা পথ আর কনকনে ঠান্ডার মাঝেও সেদিন যে ভারতীয় স্বাধীনতার অগ্নিশিখা প্রজ্বালিত হয়েছিল, তা কেবল জার্মানি বা ইউরোপের গণ্ডিতে আবদ্ধ ছিল না; তা ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বমঞ্চে। বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের তাত্ত্বিক ভিত্তি এবং নেতাজী সুভাষচন্দ্রের দূরদর্শী ও আপসহীন নেতৃত্ব বার্লিনকে বানিয়েছিল এমন এক ঐতিহাসিক মঞ্চ, যা প্রমাণ করেছিল—ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম কেবল দেশীয় সীমানার লড়াই নয়, বরং এক বিশ্বজনীন মুক্তির অবিনশ্বর কাব্য।

