ক্যাম্পাসে গ্রাফিতিতে চুনকাম ও রাষ্ট্রের ছায়া বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় বন্ধ করে সার্বিক হোক নির্বাচন! তবেই সাপমুক্তি হবে পশ্চিমবঙ্গের? বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটে জিতে মোদীর সঙ্গে ব্রেকফাস্ট! সায়নী, কাকলীরা আর জিতবেন? প্রতিবাদী মানেই ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ নয়, ভাগবতের কথা কি মাথায় রাখবে তথাকথিত ‘দেশভক্ত’রা? বাঁকিপুরের ঝাঁকি, সঙ্গে CJP! ঘুরে দাঁড়াতে পারবে BJP? গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কাঁটা মোদী-শাহ’র CPIM থেকে BJP হয়ে তৃণমূল! বিরোধী হলেই কাদা-ডিম্ ছোঁড়ার রাজনীতি বাংলায়, কবে বদলাব আমরা? জমিতেও হিন্দু-মুসলমান? মুখ্যমন্ত্রীর ‘ল্যান্ড জিহাদ’ মন্তব্যে শোরগোল বঙ্গ রাজনীতিতে রেখা পাত্রের বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের অভিযোগ, শর্বরীর বিরুদ্ধে দোকান! তোলাবাজির TMC-BJP হয়?

বারবার ‘স্কুলছুট’ রবির, শিক্ষার এক আকাশ

৪৯ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র’ সুনির্মল বসুর এই লাইনগুলি যেন এক্কেবারে রবি ঠাকুরের জন্যেই লেখা। পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যের ছাত্রছাত্রীদের জন্য একটি আলাদা বিষয় হয়ে উঠেছে রবীন্দ্রজীবন ও রচনা। কিন্তু নিজে ছাত্র হিসেবে মোটেও এমন বাঁধাধরা নিয়মকানুনে থাকতে পছন্দ করতেন না রবি। শিক্ষা তাঁর কাছে গন্ডিবদ্ধ, সিলেবাসভিত্তিক, চার দেওয়ালে বন্দি প্রশ্ন-উত্তরের মাধ্যমে বিচার্য কোনোকালেই ছিল না। 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘শিক্ষা’ প্রবন্ধে বলেছিলেন, ‘সুশিক্ষার লক্ষণ এই যে, তাহা মানুষকে অভিভূত করে না, তাহা মানুষকে মুক্তিদান করে।’ অর্থাৎ তাঁর ভাবনা অনুযায়ী সত্যিকারের শিক্ষা মানুষকে চাপ, ভয়-ভীতিতে রাখে না – শিক্ষা মানুষকে উদার হতে শেখায়, স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে, ভাবতে, সিদ্ধান্ত নিতে শেখায়। এই ভাবনা থেকেই বোধহয় বারংবার স্কুলছুট হয়েও আপামর বিশ্ববাসীকে প্রতি মুহূর্তে দিয়ে চলেছেন মুক্ত শিক্ষা পাঠ। 

রবি ঠাকুর

১৮৬৬ সালে মাত্র ৫ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের হাতেখড়ি হয়। শুরুটা হয় বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ দিয়ে। সেই সময় কিশোর রবি দাদা সোমেন্দ্রনাথ এবং ভাগ্নে সত্যপ্রসাদকে স্কুলে যেতে দেখতেন। স্কুল নয়, স্কুলের যাত্রাপথের বর্ণনা শোনা ছিল রবির বেশ পছন্দের কাজ। তিনি মনে করতেন স্কুলে গেলেই বুঝি বাইরে যাওয়ার দরজা দাদার মতো তাঁর জন্যেও খোলা হবে। তখন রবীন্দ্রনাথ পড়াশোনা করছেন বাড়িতে মাধব পণ্ডিতের কাছে। প্রায়শই স্কুলে যাওয়ার জন্য বায়না ধরতেন রবি। একদিন বিরক্ত হয়ে মাধব পণ্ডিত বলেই বসলেন, ‘এখন ইস্কুলে যাবার জন্য যেমন কাঁদিতেছ, না যাবার জন্য ইহার চেয়ে অনেক বেশি কাঁদিতে হইবে’, পরে রবীন্দ্রনাথ ও স্বীকার করেছিলেন, ‘এত বড় অব্যর্থ ভবিষ্যদ্বাণী জীবনে আর কোনওদিন কর্ণগোচর হয় নাই।’

বালক রবির বায়না আর জোরাজুরিতে ১৮৬৮ সালে তাঁকে ‘ওরিয়েন্টাল সেমিনারি স্কুলে’ ভর্তি করা হয়। সেখানেও তাঁর মন না টেকায় অবিভাবকরা অন্যান্য ছেলেদের সঙ্গে ‘নর্মাল স্কুলে’ পাঠান রবিকে।  ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার ভেতর দাঁড়িয়েও কার্যত হাঁফিয়ে উঠেছিলেন তিনি। এর জেরে ১৯৭০ সালে নর্মাল স্কুলে যাওয়াও বন্ধ করেন তিনি। পরের বছর সালটা ১৯৭১। রবির বয়স তখন ১০। বৌবাজারে বেঙ্গল একাডেমি নামের এক ফিরিঙ্গি স্কুলে ভর্তি করা হল তাঁকে। এই স্কুলের ছাত্রদের আগের স্কুলের মতো অতটা অপছন্দ হল না রবির। সেখানেও খুব বেশিদিন যাননি। এরপর ভর্তি হয়েছিলেন ‘বিদ্যাসাগর স্কুলে’, তবে সেখানেও স্কুলে না যাওয়ার দিন দুর্বোধ্য কারণে বেড়েই চলেছিল। 

খোলা আকাশের নিচে লেখাপড়া

এইসব দেখে ঠাকুরবাড়িতেই রবিঠাকুরের জন্য রাখা হল একজন গ্র্যাজুয়েট গৃহশিক্ষক। প্রথমে সিলেবাস ভিত্তিক নানা পাঠ্যবই পড়ানোর চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু নাহ, লাভের লাভ কিছুই হচ্ছিল না। শেষে কিশোর রবিকে তিনি পড়ান সংস্কৃত ভাষায় ‘কুমারসম্ভব’ এবং ইংরেজিতে শেকসপিয়রের ‘ম্যাকবেথ’ । এভাবেই মহাকবি কালিদাস আর শেকসপিয়রের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল হবু বিশ্বকবির। তবে সেই মাস্টারটিও আইন পড়তে চলে যাওয়ায় আবার রবীন্দ্রনাথকে ভর্তি করা হয় সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে। কিন্তু সেখানেও সেই একই অসুখ। বাড়ির অন্যান্য ছেলেরা সেজেগুজে দিব্য স্কুলে গেলেও রবি ঠাকুরের না যাওয়ার কারণ ছিল রকমারি। এরমধ্যেই ১৮৫৭ সালে মা সারদা দেবীর মৃত্যু হলে ছোট্ট রবির স্কুলে যাওয়া এক্কেবারে ঘুচল। 

এরপর বাড়িতেই চলল মর্জিমাফিক রবিঠাকুরের লেখা পড়া। হাতের সামনে যা বাংলা বই পেতেন ,পত্র পত্রিকা পেতেন তাই আনন্দের সঙ্গে পড়তেন কবি। বৈষ্ণব পদাবলী থেকে ‘বিবিধার্থ সংগ্রহ’ নামের মাসিক পত্রিকা,  কৃষ্ণকুমারীর উপন্যাস থেকে বঙ্কিমচন্দ্রের বঙ্গদর্শন-সবই প্রায় পড়ে ফেলেছেন তিনি। 

লেখাপড়া করলেও স্কুলের পাঠ থেকে তো তখন রবীন্দ্রনাথ লক্ষ যোজন পিছিয়ে। সেই কারণে সেন্ট জেভিয়ার্সের ফাইনাল পরীক্ষায় বসে অনুত্তীর্ণ হন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। ক্লাসে না উঠতে পারায় আর স্কুলে যাওয়া হয়নি তাঁর। রবীন্দ্রনাথ এই প্রসঙ্গে লিখছেন, ‘ একদিন বড়দিদি কহিলেন, ‘আমরা সকলেই আশা করিয়াছিলাম বড় হইলে রবি মানুষের মতো মানুষ হইবে, কিন্তু তাহার আশা সকলের চেয়ে নষ্ট হইয়া গেল’। এর কিছুদিনের মধ্যেই বাড়িতেই রবির লেখাপড়া শুরু হল। সঙ্গে গান-বাজনা, আঁকা এমনকি কুস্তির চর্চাও চলত। ইংরেজি শিক্ষা এবং সংস্কৃতেও দেওয়া হল বিশেষ জোর। স্কুলের পরীক্ষায় ‘ফেল’ হলেও মাতৃভাষা বাংলা, দ্বিতীয় ভাষা ইংরেজি এবং তৃতীয় ভাষা সংস্কৃত দারুন রপ্ত করেছিলেন তিনি। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ সবমিলিয়ে মোট পাঁচটি স্কুলে পড়েছিলেন। কিন্তু কোনও স্কুলের গণ্ডিই তাঁকে বাঁধতে পারেনি। 

প্রবোধচন্দ্র সেন তাঁর রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তা বইতে ‘শিক্ষার লক্ষ্য’, ‘শিক্ষামাধ্যম’, ‘শিক্ষার মুক্তি’, ‘ভাষার মুক্তি’, ‘বাংলা-বিশ্ববিদ্যালয়’ ও ‘বিশ্বভারতী-প্রসঙ্গ’—আলোচনা করে দেখিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে শিক্ষা কোনো বিচ্ছিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম নয়; বরং ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, চিন্তা, প্রকৃতি, সমাজ ও মানবমুক্তির সঙ্গে যুক্ত এক সমগ্র জীবনদর্শন।

শান্তিনিকেতন

রবির মতে পরীক্ষা ছিল শিক্ষার একটি সীমিত উপায়। মানুষের মুক্ত চিন্তা, নৈতিকতা, সংবেদনশীলতা নম্বরের অঙ্কে মেলানো যায় না। রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্য জ্ঞানকে প্রত্যাখ্যান করেননি, কিন্তু প্রত্যাখ্যান করেছেন অন্ধ অনুকরণকে। মাতৃভাষার উপর ইংরেজির আধিপত্যকে অস্বীকার করেছেন। শিক্ষা তাঁর কাছে ছিল আনন্দ। রবীন্দ্রনাথ জানতেন, আনন্দ ছাড়া শিক্ষা প্রাণহীন।  ‘বিশ্বভারতী-১১’ শীর্ষক অংশে তিনি লিখেছেন, ‘বিদ্যা যে দেবে এবং বিদ্যা যে নেবে তাদের উভয়ের মাঝখানে যে সেতু সেই সেতুটি হচ্ছে ভক্তিস্নেহের সম্বন্ধ। সেই আত্মীয়তার সম্বন্ধ না থেকে যদি কেবল শুষ্ক কর্তব্য বা ব্যবসায়ের সম্বন্ধই থাকে তা হলে যারা পায় তারা হতভাগ্য, যারা দেয় তারাও হতভাগ্য।’  

আজ এই আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে দাঁড়িয়ে যখন ছাত্ররা নিজেদের দাবিদাওয়া জানিয়ে আন্দোলন করছেন তখনও একই ভাবে প্রাসঙ্গিক তিনি। শিক্ষার মুক্তি ছাড়া মানুষের মুক্তি নেই- এই চিন্তার প্রতিফলন আজও তাঁর উত্তরাধিকারীরা মাথায় করে চলছেন। শিক্ষায় অচলায়তন ভাঙার কাণ্ডারি যেই দেশে রবীন্দ্রনাথ- সেখানে শিক্ষার্থীরা যে উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার দাবিতে লড়বেন তাই তো স্বাভাবিক। 

অন্যান্য প্রতিবেদন.