বাঙালিদের কাছে ২২ শ্রাবণ মন কেমনের দিন। আজ রবি ঠাকুরের প্রস্থানের দিন। ঘটনাচক্রে এবছরের ২২ শ্রাবণটাও বাংলার বাম সমর্থকদের কাছে অভিভাবকের হারা হওয়ার দিন। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে বাদ দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস লেখা অসম্ভব। তাঁর মৃত্যুতে নিঃসন্দেহে দরিদ্র হয়েছিল বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গন। আজ তাঁর প্রস্থানের ২ বছর। ঘোর সমালোচকরাও মনে করেন তাঁর মতো রাজনীতিক রাজ্য রাজনীতিতে বিরল। ক্ষমতার প্রতি নির্লোভ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বাম রাজনৈতিক ইতিহাসের মুকুটহীন সম্রাট।

তাঁর আমলে স্লোগান ওঠে ‘কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ’। ২০০৬ সালের ব্রিগেডের মঞ্চে তাঁর মুখ থেকে শোনা সেই স্লোগান আজও রাজ্যের বামমনস্ক তরুণ প্রজন্মের মুখে মুখে ফেরে। সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাইপো বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। ২০০৬ সালে রাজ্যে দ্বিতীয়বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর বুদ্ধবাবু চেয়েছিলেন বাংলায় নতুন শিল্প আনতে, সেইমতো নন্দীগ্রামে কেমিক্যাল হাব, সিঁঙ্গুরে এক লাখি গাড়ি আনার কথা ঘোষণা করে তৎকালীন বাম সরকার। কিন্তু জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের জেরে ১৪ মার্চ কৃষকদের উপর গুলি চালনার ঘটনার পর পিছ পা হয় বাম সরকার। মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসেই সেসময়ে বুদ্ধবাবু স্বীকার করে নেন, ‘গুলি চালানো ভুল হয়েছিল’। মুখ্যমন্ত্রী হয়ে এহেন নতি স্বীকার তাঁকে আদালা করে রাখে আর সকলের থেকেই। শুরু হয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে আন্দোলন। শেষমেশ পণ্ড হয় নন্দীগ্রামের কেমিক্যাল হাব প্রজেক্ট, এবং সিঙ্গুরে টাটার প্রজেক্টও। ২০১১ সালের পর থেকে রাজনীতি থেকে কার্যত তিনি সন্ন্যাস নিলেও তাঁর শিক্ষা, ভাবধারা, আদর্শ সবই তরুণ ব্রিগেডের অক্সিজেন।

দাপিয়ে ছাত্ররাজনীতির পর, ১৯৭৭ সালে সংসদীয় রাজনীতিতে প্রথম পা রাখেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। কাশীপুর কেন্দ্র থেকে। সেবছরই বাংলার শাসন ভার পেল বামেরা। সেই সময় সাংসদ হিসেবে তাঁর ব্রিগেডের মঞ্চে ওঠার সুযোগ হয়নি, কিন্তু পরবর্তীতে বামেদের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’কে চিনে নিতে দেরি হয়নি জ্যোতি বাবুর। ১৯৯৯ সালে রাজ্যের উপ-মুখ্যমন্ত্রী, পরের বছরেই মুখ্যমন্ত্রীর গুরু দায়িত্ব পান বুদ্ধবাবু। তারপর দীর্ঘ ১১ বছর টানা মুখ্যমন্ত্রীত্ব। ওঠা-পড়া পতন। শেষ জীবন পাম অ্যাভিনিউ-এর দুকামরার বাড়িতেই কাটিয়ে দেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী।

রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকলেও রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে বর্তমান শুভেন্দু অধিকারী- সকলেই একবাক্যে মেনে নেন সততার প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য প্রশ্নাতীত। পাম অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতে দু’কামরার ঘর। তাঁর মুখ্যমন্ত্রীত্বের সময় থেকে জীবনের শেষ দিন অবধি বিলাসিতা তাঁকে ছুঁতে পারেননি এক ছিটেও। যা বর্তমান রাজনীতিতে উদাহরণ।

