দিল্লির যন্তর-মন্তর থেকে গোটা দেশের জন্য আওয়াজ তুলেছিলেন ছাত্র-যুবরা। এদেশের জেন-জিরা। লাগাতার বিক্ষোভের পর কীভাবে দাবি আদায় করে নিতে হয় তা প্রমাণ করে দিয়েছে দেশের একরোখা কিছু ছেলে মেয়ে। কম বিতর্ক হয়নি তাঁদের নিয়ে। তাঁদের পোশাক থেকে স্লোগান, খাওয়া দাওয়া থেকে বিক্ষোভের ধরণ নিয়ে হরদম সমালোচনা চলেছে। কিন্তু মাথা নত করেনি ওঁরা। দাবি আদায় না হওয়া অবধি জোট বেঁধে থেকেছে। রাত জেগেছে, রোদে পুড়েছে, পুলিশের মার খেয়েছে ফের ফিরে গিয়েছে যৌথ ভাবে যন্তর-মন্তরে।

আন্দোলনের অভিনবত্ব
এই দেশে গণআন্দোলনের ইতিহাস অনেক পুরোনো। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস দেশবাসী আগেও দেখিয়েছে। কিন্তু দিল্লির এই আন্দোলন মনে থেকে যাবে এর অভিনবত্বের জন্য। মেইনস্ট্রিম মিডিয়া এই আন্দোলনকে প্রথম দিকে মোটেই গুরুত্বের চোখে দেখেনি। কিন্তু প্রতিনিয়ত এই বিক্ষোভের ছবি, রিল, ভিডিও, বার্তা দায়িত্ব সহকারে মানুষের মুঠো ফোনে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে গেছে এই আন্দোলনকারীরাই। সৃজনশীল নানান রকম পোস্টার ,ভিডিওতে একবগ্গা একদল ছাত্র-ছাত্রী সোচ্চারে বলে গিয়েছে ‘ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা চাই’, এবং ধারাবাহিক শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে সেই দাবি পূরণ ও হল।

বিপ্লবের ধারাবাহিকতা- মিছিলের আগে ভগৎ সিং
একেবারে নতুন প্রজন্মের এই আন্দোলনে বজায় থাকল বিপ্লবীদের ইতিহাসের ধারাবাহিকতা। সোনম ওয়াংচুক রইলেন, রইল সংবিধান। সঙ্গে রইলেন বি.আর আম্বেদকর থেকে ভগৎ সিংও। এই আন্দোলনকারীদের যা গড় বয়স সেই বয়সে ফাঁসির দড়ি গলায় পরে নিয়েছিলেন তিন জন। ভগৎ সিং, সুখদেব থাপার এবং শিবরাম রাজগুরু। তাঁদের তোলা ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ গলায় নিয়েই এই লড়াই লড়লেন ছাত্র-যুবরা। জিন্দা থাকলে হয়ত এই আন্দোলনের সামনের সারিতেই থাকতেন ভগৎ সিং-রা। আজ এতো বছর পরেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখলেন হালফিলের ছেলে মেয়েরা।

ইতিহাস এবং ভগৎ সিং
ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াইয়ের অন্যতম মুখ ছিলেন লালা লাজপত রায়। তাঁর নেতৃত্বে আন্দোলন দমিয়ে দিতে ঔপনিবেশিক সরকার নির্মম দমননীতির আশ্রয় নেয়। লাহোরে প্রতিবাদ মিছিলে পুলিশের নৃশংস লাঠিচার্জের নির্দেশ দেওয়া হয়, যার জেরে গুরুতর আহত হন লাজপত রায় এবং পরে তাঁর মৃত্যু হয়। এই ঘটনার প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ নেন ভগৎ সিং, শিবরাম রাজগুরু, সুখদেব-সহ বিপ্লবীরা। তাঁদের লক্ষ্য ছিল পুলিশ সুপার জেমস এ. স্কট, যাঁকে লাঠিচার্জের জন্য দায়ী মনে করা হয়। কিন্তু ভুল পরিচয়ের কারণে নিহত হন সহকারী পুলিশ সুপার জন পি. সন্ডার্স। পরে এই হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ভগৎ সিং, রাজগুরু ও সুখদেবকে ব্রিটিশ সরকার মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বোমা ছোঁড়া এবং লাহোর ষড়যন্ত্র-র মামলায় তাঁদের জেলবন্দি করা হয়। তারপরেও এক মুহূর্তের জন্য আপসের পথ বেছে নেননি ভগৎ সিং। ফাঁসির আগে ভগৎ সিংকে ব্রিটিশ সরকারের কাছে ক্ষমা চাইতে অনুরোধ করা হয়, ভগৎ সিং সেই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন।

কোনও মানুষের প্রাণ নেওয়া তাঁদের লক্ষ্য ছিল না। মানুষের দুঃখ, যন্ত্রণার প্রতি যারা বধির তাদের কানে নিপীড়িত মানুষের আওয়াজ পৌঁছে দিতে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিলেন তাঁরা। এই প্রসঙ্গে ভগৎ সিং এর একটি বিখ্যাত উক্তি রয়েছে, “If the deaf are to hear the sound has to be very loud”। অর্থাৎ যারা কানে শুনতে পায় না তাঁদের শোনাতে বিকট আওয়াজের প্রয়োজন।
একালের জেনজি-রাও সেই কথাই যেন মনে করাল। দাবি না আদায় হওয়া অবধি কমল না তাঁদের স্লোগানের আওয়াজ। সোনম ওয়াংচুক সহ আন্দোলনকারীদের শান্তিপূর্ণ অনশন এবং অবস্থানও মনে করায় ভগৎ সিংকে। জেলে বন্দি থাকা অবস্থায় যতীন দাস, সুখদেব থাপার, শিবরাম রাজগুরু এবং আরও অনেকের সঙ্গে ভগৎ সিং অনশন আন্দোলন করেন। সেই অনশনের ৬৩ দিনে বিপ্লবী যতীন দাসের মৃত্যু হয়।

প্রেম ছাড়া কি দিন বদলের গান শোনানো যায়?
একজন বিপ্লবী সবার আগে একজন প্রেমিক। এই প্রসঙ্গে বলতে হয় ১৯২৯ সালের ৫ এপ্রিল, দিল্লির সীতারাম বাজার থেকে সুখদেবের উদ্দেশে লেখা ভগৎ সিংয়ের বিখ্যাত একটি চিঠির কথা। এই চিঠিটি তিনি লিখেছিলেন কেন্দ্রীয় আইনসভায় (Central Legislative Assembly) বোমা নিক্ষেপের অভিযানে যাওয়ার ঠিক আগে। সুখদেব ভগৎ সিংকে অভিযোগ করেছিলেন যে তিনি নাকি ব্যক্তিগত অনুভূতি ও একটি মেয়ের প্রতি আকর্ষণের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছেন। ভগৎ সিং এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে লেখেন, তিনি জীবনের প্রতি আকর্ষণ, স্বপ্ন ও ভালোবাসা—সবকিছু থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনে সব ত্যাগ করতে প্রস্তুত। ভগৎ সিং লিখেছিলেন, প্রকৃত প্রেম মানুষকে নিচে নামায় না, বরং চরিত্রকে উন্নত করে। প্রেমকে তিনি পশুসুলভ প্রবৃত্তি নয়, একটি মানবিক ও নির্মল অনুভূতি বলে ব্যাখ্যা করেন। তিনি সুখদেবকে অনুরোধ করেন, বিপ্লবীদের বিচার করতে গিয়ে যেন অতিরিক্ত কঠোর না হওয়া হয়। মানুষের দুর্বলতা বা আবেগকে ঘৃণা নয়, সহানুভূতির চোখে দেখতে হবে।

মানুষ মারা যায়, আদর্শ নয়
সেই ধারাবাহিকতা মাথায় করেই এই আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে গেলেন একালের জেন-জিরা। মার খেলেন কিন্তু ঘুরিয়ে মারলেন না। আরও ঐক্যবদ্ধ হলেন। প্রশাসনের বিরুদ্ধে হাতিয়ার করলেন গোলাপ ফুল থেকে মেলোডি চকোলেট। ভগৎ সিং বলেছিলেন, “ওরা আমাকে মেরে ফেলতে পারবে কিন্তু আমার ভাবনাকে মারতে পারেব না। ওরা আমার শরীরকে দুমড়ে মুচড়ে দিতে পারবে, কিন্তু আমার আত্মাকে শেষ করতে পারবে না।” হলও তাই। আজ এত দশক পরেও তাঁর আদর্শে শান দিয়ে দাবি আদায় করে নিলেন ভগৎ সিং-এর উত্তরসূরিরা।

