Shopping cart

কলাম

অক্সিজেনের অভাবে ডিমের উপকারিতা

135

নেতার মাথায় অক্সিজেন কম হলে তিনি পুলিশকে লক্ষ্য করে বোমা মারতে বলেন। রাজ্যবাসীকে তেমনই জানানো, শেখানো হয়েছে।

আম জনতার মাথার দাম কম। তাঁদের সামর্থ্য সীমিত। তাদের সাহস ইতরের দুঃসাহস হয়ে উঠতে পারে না। তারা তুলনামূলক কম দামের বস্তু বেছে নেন নিজেদের রাগ দেখানোর জন্য।

তাই ডিম ছোঁড়া হয়েছে শনিবার, সোনারপুরে। তবে নিরীহ ডিম দিয়ে পুরো ঘটনাটি বিচার করা ঠিক হবে না। সোনারপুরের ঘটনাকে দিনের পর দিন শাসকের শাসন-চক্রে মুরগির মতো জবাই হয়ে চলা মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসাবেই দেখা উচিত। ডিমের বদলে বোমা হাতে তুলে নেননি নারী, পুরুষরা। কারণ – তাঁরা খুন করতে চাননি। অভিষেক দাবি করলেই ‘খুনের চেষ্টার অভিযোগ’ সত্য হয়ে যায় না। কয়েক হাজার টাকার সাদা জামায় অত্যাচারিত মানুষ কাঁচা ডিমের বোটকা গন্ধে নিজেদের ঘৃণা সেঁটে দিতে চেয়েছিলেন–ঘটনার মাহাত্ম্য এইটুকু।

কেউ উসকে ছিল? সম্ভাবনা আছে। রাজ্যের স্টেশনগুলিতে রেলের উচ্ছেদ অভিযান রুখতে নেমে পড়া হকার আর বামপন্থীদের লড়াইকে প্রচারের আলোর বাইরে ঠেলে দিতে, ধসতে থাকা তৃণমূলকে ফোকাসে নিয়ে আসার কোন গেমপ্ল্যান সোনারপুরে থাকতে পারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও মানুষের প্রতিবাদকে সম্মান জানাতেই হবে।

পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে মমতা ব্যানার্জির ভাইপোর হাতে সেই ক্ষুব্ধ নাগরিকদের শনিবার বিনীতভাবে তৃণমূল নেতা, কর্মীদের দৌরাত্ম্য, দুর্নীতির তালিকা সমৃদ্ধ একটি ডেপুটেশন তুলে দেওয়া উচিত ছিল। মিনমিনে স্বরে কয়েকটি কথা নিবেদন করে পথ ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিল। ‘গণতান্ত্রিক’ পদ্ধতি বলতে আমরা এমনটাই আশা করি। কিন্তু সে পথ ভুলতে শিখিয়েছেন তাঁরা, যাঁরা বলেছিলেন, বিরোধীরা নমিনেশন দিতে পারছে না, কারণ রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে উন্নয়ন। তার বিরুদ্ধে শঙ্খ ঘোষ কবিতা লিখেছিলেন। অনুব্রত ওরফে কেষ্ট মন্ডল তার জবাবে বলেছিলেন, ’কে এলো এই নতুন কবি…তার নাম শঙ্খ রাখা ঠিক হয়নি।’

‘কবি’ মমতা ব্যানার্জি এবং তাঁর পারিষদরা সেদিন চুপ করে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন কেষ্টকে। গণতন্ত্রের মাথায় অক্সিজেনের অভাব শুরু হয়েছে তখন থেকে। কিংবা তারও আগে থেকে। বর্ধমানে সিপিআই(এম) নেতা প্রদীপ তা, কমল গায়েনকে ইঁট দিয়ে মাথা থেঁতলে থেঁতলে খুন করেছিল ১০-১২ জন। সে ছিল খুন। সংগঠিত, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। সে কাজ মানুষের না, তৃণমূল কর্মীদের। ২০১১ পরবর্তীতে রাজ্যে এমন হত্যাকাণ্ডের তালিকা দীর্ঘ। তাই থাক। বরং রায়গঞ্জের কলেজের সেই অধ্যক্ষের কথা মনে করি। যাঁকে একদল ‘দুষ্টু’ ছেলে কলেজের মধ্যে টেনে হিঁচড়ে মেরেছিল, দিনের বেলায়। সেদিন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেছিলেন, ”বাচ্চা বাচ্চা ছেলেরা ফাঁদে পড়ে করে ফেলেছে।” সমাজের মাথায় অক্সিজেনের অভাব তখন বোঝা গেছিল। সোনারপুরের ঘটনাকে এই পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করা দরকার। যে মানুষ দিনের পর দিন ভোট দিতে পারেননি, সাধারণ পরিষেবার বদলে যাঁদের কাছে কাটমানি চাওয়া হয়েছে, প্রতিবাদ করলে মিথ্যা অভিযোগে মামলা দেওয়া হয়েছে, মহিলাদের ধর্ষণ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে, সেই মানুষ শুধু ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে ব্যবহার করায় নিজেদের ক্ষোভকে প্রশমিত করতে পারেন না। তিনি চড়, থাপ্পড় মারতে চান। কারণ তিনি জমে থাকা ক্ষোভের লাভা জানান দিতে চান। তিনি অক্সিজেন চাইছেন। স্বস্তি চাইছেন কিছু একটি ছুঁড়ে। তিনি বোমা ছুঁড়তে চান না। তাঁদের সামর্থ্য, সাহসের উপযোগী কিছু একটা ছুঁড়তে চান। সেটা ওই ডিমগুলি। যা শনিবার সোনারপুরের কামরাবাদের বিবেকানন্দ নগরে অভিষেক ব্যানার্জি ‘ফেস’ করেছেন।

ক্ষোভ জানানোর এই পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন করার অবকাশ আছে। কিন্তু মানুষের অপাপবিদ্ধ ক্ষোভের আগুন, প্রতিবাদের ইচ্ছাকে নতজানু হয়ে অভিনন্দন জানাতেই হবে। কিন্তু কিছু প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই থেকে যাচ্ছে। ঘটনাবলী সেই প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করছে।বেলেঘাটার নিহত দলীয় কর্মীর পরিবারকে অভিষেক ব্যানার্জি ডেকে পাঠিয়ে ছিলেন তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষের বাড়িতে। শনিবার সকালে। কিন্তু সোনারপুরে নিহত তৃণমূল কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে তাঁকে সোনারপুরেই যেতে হলো কেন? অভিষেক ব্যানার্জি কোথায় যাবেন, কিংবা কোথায় যাবেন না, সেটি পুরোপুরি তাঁর ব্যক্তিগত এবং দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়। কিন্তু বেলেঘাটা এড়ালেন কেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক? বেলেঘাটায় তৃণমূল জিতেছে। সেখানে তৃণমূলের বিধায়ক আছেন। কুণাল ঘোষ। তিনি কী পারতেন না দুটি হেলমেট জোগাড় করে রাখতে? এই প্রশ্নও শনিবার বিকাল থেকে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। শনিবার দুপুরে সোনারপুরে নিহত দলীয় কর্মীর বাড়িতে বসে সাংবাদিকদের অভিষেক বলেছেন, “স্থানীয় কর্মীরা বুদ্ধি করে একটা দুটো হেলমেট জোগাড় করে রেখেছিল।” পরেশ পালের ‘শিক্ষা সমৃদ্ধ’ বেলেঘাটার তৃণমূল কর্মীদের সেই বুদ্ধির অভাব আছে? মনে হয় না। হেলমেটের প্রয়োজন হতে পারে, তা সোনারপুরের তৃণমূল কর্মীদের কে মনে করিয়েছিলেন? সোনারপুর থানায় তৃণমূলের পক্ষ থেকে কোন অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। কেন? পুলিশ স্বতোপ্রণোদিত হয়ে মামলা করেছে। তৃণমূলের সোনারপুরের কিংবা দক্ষিণ ২৪ পরগনার কোন নেতা অভিষেকের ধারে কাছে ছিলেন না। কেন?

শনিবার দুপুরে সিআইডির তলবি চিঠি পেয়েছিলেন অভিষেক। তারপরই সোনারপুরের ঘটনা। আপাতত বেশ কিছুদিন বাড়িতেই ‘চিকিৎসাধীন’ থাকবেন অভিষেক। সিআইডির জেরা পিছিয়ে যায়। হেলমেট রাখার পরিকল্পনা কী তলবি চিঠি পাওয়ার পরেই? সম্প্রতি দলের মধ্যে অভিষেককে ঘিরে নানা রকমের তৃণমূল নেতার অসন্তোষ ফেটে পড়ছিল। শনিবারের ঘটনার পর তা কিছুটা থমকে যাবে। এমন অভ্যাস আর একজনেরই দেখা গেছে। তিনি মমতা ব্যানার্জি। অনেক উদাহরণ আছে। একটি দিই? ২০০৯-এর আগস্টে লালগড়ের সভায় মাওবাদী নেতা আজাদের এনকাউন্টারের নিন্দা করে ফেলেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। তখন সংসদ চলছিল। তিনি তখন রেলমন্ত্রী। খুব শোরগোল পড়েছিল। পরেরদিনই মমতার দিল্লি যাওয়ার কথা। তাঁকে তা এড়াতে হবে এবং সহানুভূতি কুড়োতে হবে। লালগড় থেকে ফেরার পথে তাঁর গাড়িতে ধাক্কা দিয়ে এক ট্রাকচালক খুনের চেষ্টা করেছেন বলে চেঁচামেচি শুরু করলেন মমতা। তিনি কলকাতায় এসে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে গেলেন। ট্রাক চালক গুজ্জর সিং বেশ কিছুদিন জেল খাটলেন।উত্তরাধিকার সূত্রে অভিষেক এমন কতগুলি গুণের আধার তা নিয়ে তুলনামূলক বিচার চলতে পারে। কিন্তু সোনারপুরের ঘটনায় পুলিশ রবিবার দুপুরের মধ্যে ৫ জনকে গ্রেপ্তার এবং ৩ জনকে আটক করেছে। আশ্চর্য দৃশ্য দেখা গেল শনিবার সন্ধ্যায়। মমতা ব্যানার্জি হাসপাতালে গেছেন। অ্যাপোলো থেকে বেলভিউ গেছেন। পিছনে শুধু শোভন চ্যাটার্জি, অর্থাৎ সেই ‘কানন।’ কোথায় ফিরহাদ হাকিম, কোথায় অরূপ বিশ্বাস, ব্রাত্য বসু, ইন্দ্রনীল সেনরা?

ডিমের মতো ভাঙছে তৃণমূল। ছিটকে পড়ছে বেওয়ারিশ কুসুমের মতো।

সম্পর্কিত খবর