সেটা ২০১৪। লোকসভা নির্বাচনে বিরাট জয় পেয়ে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারকে উৎখাত করে মসনদে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন প্রথম এনডিএ সরকার। ওই বছরেরই ২ অক্টোবর শুরু হয়েছিল — ‘স্বচ্ছ ভারত অভিযান।’ লক্ষ্য, দেশের প্রতিটা কোণা পরিচ্ছন্ন রাখা। পরিষ্কার রাখা। তাই ঝাঁটা হাতে মন্ত্রী-সান্ত্রী সব্বাই। তবে সেই ‘সাফাই অভিযান’-এর বোধহয় অন্য একটা অর্থও ছিল — খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ, দিন-মজুর, গরিব, ফুটপাথে থাকা মানুষ, ছোট হকার, অন্যের উচ্ছিষ্ট খেয়ে বেঁচে থাকা মানুষদেরও ‘সাফাই।’ কখনও কোনও আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানের আসর বসবে বলে তুলে দেওয়া হচ্ছে বস্তি, কখনও ‘সৌন্দর্যায়ন’ বাড়াতে ভেঙে দেওয়া হচ্ছে রাস্তার ধারের ঝুপড়ি, আবার কখনও এমন ভাবে কংক্রিটের আড়াল তোলা হচ্ছে, যাতে ‘নোংরা গরিব’গুলো কারও চোখে না পড়ে! কারণ ‘দেশ এগোচ্ছে। অচ্ছে দিন আনেওয়ালে হ্যায়।’
ফাস্ট ফরোয়ার্ড টু ২০২৬-এর ৪ মে। ১৫ বছরের দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূলকে ছুড়ে ফেলে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে মসনদে বাংলার প্রথম বিজেপি সরকার। নেতৃত্বে শুভেন্দু অধিকারী। অনেক কিছু ঘোষণার মধ্যেই প্রায় বিনা নোটিসে ‘অবৈধ’ বাড়ি ভাঙা, রেলের জমি ‘দখল করা হকার’ উচ্ছেদ শুরু হয়ে যায় রাতের অন্ধকারে। সাম্প্রতিকতম সংযোজন দমদম স্টেশন ও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে শনিবার রাতের বুলডোজার। আরপিএফ, জিআরপি ও রেলকর্তারা। আবার কোথাও কোথাও পুরসভার কর্তা-ব্যক্তিদেরও দেখা গেছে। দেখা যায়নি শুধু ‘বদলানো দরকার, তাই বিজেপি সরকার’-এর বড়-মেজো-সেজো ‘কার্যকর্তাদের’, দেখা যায়নি সদ্য ক্ষমতাচ্যুত হওয়া ‘মা মাটি মানুষের’ ৮০ জনের নির্বাচিত বিধায়কদের একজনকেও। দেখা যাচ্ছে বা গেছে কাদের, ওই ‘শূন্য’ থেকে ‘একে’ ওঠা একটি দলের প্রায় সর্বত্র তৃতীয় স্থান পাওয়া নেতৃ-কর্মীদের আর সিটু-কে। অবশ্য ১৯৯৬-এ বাম সরকার ও কলকাতা পুরসভার যৌথ অভিযান ‘অপারেশন সানশাইন’-এর মাধ্যমে কলকাতার বিভিন্ন ফুটপাথ থেকে হকার উচ্ছেদ করা হয়েছিল — সে কথা মনে করাতে এখন অনেক মানুষ খুব তৎপর। সে বিতর্কে যাচ্ছি না। কারণ, ভুলটা ভুল। অন্যায়টা অন্যায়ই। তাই যে সরকারই তা করুক, সেই উদাহরণ পরের অন্যায্য কাজকে কোনও বৈধতা দিতে পারে না। এর পাশাপাশি এ কথা বলাও বাঞ্ছনীয়, উচ্ছেদ হওয়া হকারদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে কসবা নিউ মার্কেট, গড়িয়াহাটের বেসমেন্ট সম্প্রসারণ, কালীঘাটে ৬ তলা বিল্ডিং নির্মাণ, গ্যালিফ স্ট্রিটে শেড তৈরি, এন্টালিতে দোকান তৈরি, রাসবিহারীতে ফ্যান্সি মার্কেট-সহ বহু কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছিল। তবে এন্টালি বাদে তা সর্বত্র সফল হয়নি। কারণ হকারদের অনেক ক্ষেত্রেই জায়গা পছন্দ হয়নি। ফলে মাস কয়েক পর থেকে তাঁরা ফের ফুটপাথেই ফেরত এসেছিলেন। বহু সময়ই পুরসভা ও রাজ্য সরকার ফুটপাথকে দখলমুক্ত করার জন্য উদ্যোগী হয়েছে, কিন্তু এই বিরাট সংখ্যক মানুষের রুজি-রুটির বিকল্প দিতে না পারায় তা বেশির ভাগ সময়েই ফলপ্রসূ হয়নি।
তবে আজ অবৈধ হকার উচ্ছেদ বা অবৈধ বাড়ি ভাঙার যৌক্তিকতা, পাল্টা যুক্তি, কী ভাবে বিষয়গুলোর সমাধান সম্ভব — ইত্যাদি আলোচ্য বিষয় নয় এই লেখার। তার চেয়েও অনেক বৃহত্তর পরিসরে একটা কথা বলার জন্যই এত গৌড়চন্দ্রিকা। সেটা এ বার বলেই ফেলি — মানবিকতা, মানবতা ও মানুষ কি মৃত? তবে এখন এই প্রশ্ন তোলার অবকাশ ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে। আমি এখন দৃঢ়ভাবেই বলতে পারি — মানুষ মরে গেছে।
কোন মানুষ মরে গেছে? যাদের একদম ওদের মতোই দেখতে মানে যাঁদের উচ্ছেদ অভিযান চলছে তাঁদের মতো — দু’টো করে হাত, পা, চোখ, কান, একটা নাক, একটা মুখ, শিরা-ধমনীতে লাল রঙের একটা তরল চলাফেরা করে, সারাক্ষণ কোনও একটি যন্ত্র শরীরের ভিতরে পাম্প করে চলে যাতে সেই মানুষটা নিঃশ্বাস নিতে পারে ইত্যাদি। অথচ এদের কারও দৈহিক মৃত্যু হয়নি। কিন্তু এরা কেউ বেঁচে নেই। মনটাই যে চির-বন্ধকীতে চলে গেছে!
গরিবের ঘর ভাঙা পড়ছে, হকারদের পেটে লাথি মারা হচ্ছে, পুনর্বাসনের কোনও বন্দোবস্ত নেই, মহিলা-শিশু-বৃদ্ধরা হাহাকার করছেন, যাঁদের উপরে সংসার চালানোর গুরু দায়িত্ব সেই মহিলা-পুরুষ নির্বিশেষে কেউ জানেন না পর দিন অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের সংস্থান কী করে হবে — এ সব দৃশ্যের ভিডিও ও ছবি এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় হু হু করে ছড়াচ্ছে। আর মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তি বাদে তা দেখে উল্লাসের বন্যা বইছে। লক্ষ লক্ষ লাইক, লাভ, শাবাশি-র ইমোজি। তাতেই ক্ষান্ত নয়, তাঁরা রীতিমতো যুক্তি-তক্কো সাজিয়ে বসছেন কেন এগুলো ‘একদম ঠিক কাজ’ হচ্ছে! অনেকে কড়ায়গন্ডায় হিসেব দিয়ে বলছে, ‘আমার ব্যবসা করতে যদি এত কিছু লাগে, যাঁরা ৫ টাকার চা আর ১০ টাকার ঘুঘনি আর ৮ টাকার সেদ্ধ ডিম বেচে আয় করে তাঁরা শুধু গরিব হকার বলে পার পেয়ে যাবে! জয়শ্রীরাম।’
শাসকের ধর্ম শোষণ করা, এ কথা নতুন নয়। তাই দখলিকৃত জমি উদ্ধারে হঠাৎ তৎপর রেলের উদ্দীপনা ও বুলডোজারে আমার যত না আশঙ্কা-ভীতি, তার চেয়ে অনেক বড় অশনি সঙ্কেত আশেপাশের ‘মানুষ’-এর অধিকাংশ। রেলের হঠাৎ কেন এত যুগ পরে সব জমি একসঙ্গে দরকার হয়ে পড়ল আর কেনই বা এত দিন তাদের সে সব প্রয়োজন হয়নি, যাত্রী নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের চোদ্দোটা বাজিয়ে দিয়ে দামি ট্রেন আর দামি ব্র্যান্ডে ভরে উঠছে রেলস্টেশনগুলো, লেট নিয়ে মাথাব্যথা নেই, কোটি কোটি টাকার জমি কেলেঙ্কারি কেন ধামাচাপা দেওয়া — এ সব আলোচনা পরে হোক, কিন্তু মানুষ জন্ম নিয়ে যারা এই দুনিয়ায় এসেছে, তাদের কি তা হলে ‘হীরক রাজ্যে’র কোনও মগজ-ধোলাই কক্ষে অদৃশ্য ভাবে ঢোকানো হয়েছে? সেখানে বলা হচ্ছে, ‘এরা অনুপ্রবেশকারী। মুসলিম। অবৈধ। এদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। তাই রাম-রাজ্য গড়তে যা হচ্ছে, তাতেই বাহবা দাও। আরে তোমরা তো ঠিক আছো। মরতে দাও ওদের।’ এমন মন্ত্র মাথায় গেঁথে না গেলে তো এই অমানবিক পদক্ষেপে কেউ এমন দানবীয় উল্লাস করতে পারে না।
ডেমোক্রেসির নিয়মেই একদিন নির্বাচিত সরকার বদল হয়। সে ভাল হোক, মন্দ হোক — হয়। কিন্তু গরিবকে ভিটেমাটি ছাড়া করার যে ব্লু প্রিন্ট ধরে চলছে উচ্ছেদ অভিযান, কেড়ে নেওয়া হচ্ছে তাঁদের বেঁচে থাকার অধিকারটুকুও, তা কোনও সরকার বদলের স্বতঃস্ফূর্ত উল্লাসের বহিঃপ্রকাশ হতে পারে না। তারা চোর, দুর্নীতিগ্রস্ত, নীতিহীন হলেও না। এই উল্লাসের আড়ালে রয়েছে প্রতিশোধ। প্রতিহিংসা। প্রতিপত্তি। সংখ্যাগুরুর ধর্মের আস্ফালন।
এই জপ-মন্ত্র আসলে ভোটের বহু আগে থেকে স্লো-পয়জন করা হয়েছে — হিন্দু খতরেঁ মে হ্যায়। এ বার বিজেপি না এলে বাংলায় আর হিন্দুদের থাকতে দেবে না তৃণমূল। সব বাংলাদেশি মুসলমানদের ভোটে জিতছে। ভেবে দেখুন। সত্যিই তো, ‘ভেবে দেখা’র মতো। শহর কলকাতা-সহ উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত বাঙালি ও বাঙালি, গ্রাম বাংলার হিন্দুরা বিজেপিকে ‘মুসলিম তাড়ানো’র জন্য ভোট দিয়েছে। তৃণমূলের ‘বাড়াবাড়ি রকমের মুসলিম ভজনা’ই এর একমাত্র কারণ, নাকি আরও অনেক গভীর কিছু আছে তা অন্য এক সময়ে বিশ্লেষণ করা যাবে। আপাতত ‘লাখে লাখে বাংলাদেশি পালিয়েছে!’ কিন্তু যাঁরা হকারি করছেন, তাঁরা সবাই তার মানে মুসলিম, পড়শি দেশের? হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি তো আছেই ‘তথ্য’ সরবরাহের জন্য। কাজেই যে ধর্মীয় বিদ্বেষের বিষে মগজধোলাই চলেছে, তাকে ছাপিয়ে জয়ী হবে মানবধর্ম তা কী করে সম্ভব! ফলে ‘সাফল্যের উন্মত্ততা’ চলছে সোশ্যাল মিডিয়া কাঁপিয়ে।
লক্ষ লক্ষ মানুষের চোখের জল দেখে এই দ্বিপদ জীবেরা ‘লাফ’ ইমোজিও দিচ্ছে। নিজেদের মধ্যে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ, কোন স্টেশন চত্বর কতটা ঝাঁ চকচকে হয়েছে। কোন কোন অফিস পাড়ার ফুটপাথ এখন একদম পরিষ্কার। আর একরাতে বাড়িহারা ‘শান্তির ছেলেরা’ কী ‘জব্দই’ না হচ্ছে। তাঁরা শুধু সামান্য একটা কথা ভুলে গেছেন বা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে — মানুষ যা ধারণ করে, সেটাই ধর্ম। তাই মানবতার থেকে বড় কোনও ধর্মের জন্ম এই বিশ্বে হয়নি। কবি নজরুল তাঁর ‘মানুষ’ কবিতায় এক জায়গায় লিখছেন, ‘বন্ধু, তোমার বুক-ভরা লোভ, দু’চোখে স্বার্থ-ঠুলি, নতুবা দেখিতে, তোমারে সেবিতে দেবতা হ’য়েছে কুলি।’
তবে তা দেখার জন্য তো একটা বিদ্বেষহীন মন ও স্বার্থহীন দৃষ্টি থাকতে হবে, তার আর এতটুকুও কি বেঁচে আছে? আপাতত তা গভীর কোমায়। কখনও সেখান থেকে ফিরে এসে কি বলতে পারবে, ‘শুনহ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই?’ তা হয়তো এখন কোনও মিরাকল-এর উপরেই নির্ভর করছে।
একটাই কথা একটু মনে করানোর। ২০১৪-এ কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পরে অনেক প্রতিশ্রুতির মধ্যে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ‘গ্যারান্টি’ দিয়েছিলেন — বিদেশে সঞ্চিত ‘কালো টাকা’ ফিরিয়ে এনে প্রতিটি নাগরিকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা করে জমা করবেন তিনি। পূর্বতন ইউপিএ সরকারের ‘সব দুর্নীতির হিসেব’ দেবেন!
কেন জানি না এ সব লিখতে গিয়ে হঠাৎ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা কবিতার লাইন মনে পড়ে গেল ‘কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটল, কেউ কথা রাখে না!’ তাই মানুষের পাশে মানুষ হয়ে দাঁড়ানোটাই বোধহয় সভ্যতার এই সঙ্কটে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।














