দোরগোড়ায় রাজ্যের প্রথম দফার ভোট। সব দলের প্রচার এখন তুঙ্গে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর ভাইপো তথা তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কপ্টারে চেপে গোটা রাজ্য চষে ফেলছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ছাড়াও একাধিক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ থেকে শুরু করে অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা, কেউই বসে নেই। তাঁরা বাংলা দখলের জন্য মরিয়া। মোদী, শাহ দলবল নিয়ে কার্যত ডেলি প্যাসেঞ্জারি করছেন। ভোটের ময়দানে এবার ভীষণভাবে আছে বাম এবং কংগ্রেস। চাঁদিফাটা গরমে ভোটের উত্তাপেও এখন টগবগ করে ফুটছে বাংলা।
প্রথম দফার ভোটের ঠিক আগে তৃণমূলের ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক (I-PAC) বাংলায় তাদের কাজকর্ম গুটিয়ে নিয়েছে। রবিবার একটি সর্বভারতীয় সংবাদপত্রে এক প্রতিবেদন এই সংক্রান্ত খবর প্রকাশিত হয়। তারপর থেকেই তৃণমূলে টালমাটাল পরিস্থিতি। ওই খবর প্রকাশ্যে আসার পরই তৃণমূলের একটি বিবৃতি আসে কোনও কোনও সংবাদ মাধ্যমে। সেখানে আইপ্যাকের কাজকর্ম গুটিয়ে ফেলার খবরকে বিভ্রান্তিমূলক বলে দাবি করা হয়। আবার দুপুর থেকে খোদ তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ওই খবরকে শিলমোহর দিয়ে দেন বিভিন্ন প্রচার সভায়। তিনি বলেন, আইপ্যাককে ভয় দেখানো হচ্ছে। ওদের চাকরি গেলে আমি চাকরি দিয়ে দেব। অভিষেকের সঙ্গে কথা হয়েছে। উনি এমন একটা ভাব করেন, চাকরি যেন মুখের কথা। এই সরকারের প্রতিষ্ঠান দুর্নীতির জন্যই ২৬ হাজার শিক্ষিত যুবক যুবতী চাকরি চলে গিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে। গত বছর সেই সময় মুখ্যমন্ত্রী অনেক গল্প শুনিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমি থাকতে কারও চাকরি যাবে না। আমার প্ল্যান এ, বি, সি, ডি সব রেডি আছে। এখন কোথায় সেই সব প্ল্যান? আইপ্যাক যে তৃণমূলেরই একটি সংস্থা সেটা মুখ্যমন্ত্রীর নিজেই পরিষ্কার করে দিয়েছেন। যেদিন ইডি আইপ্যাক কর্তা প্রতীক জৈনের বাড়ি ও অফিসে অভিযান চালায়, সেদিন মুখ্যমন্ত্রী ছুটে গিয়েছিলেন দুটি জায়গাতেই। অনেক কাগজপত্র, ল্যাপটপ, মোবাইল ইত্যাদি তিনি ছিনিয়ে নিয়ে আসেন। তা নিয়ে মামলা বিচারাধীন সুপ্রিম কোর্টে। প্রতিটি স্ত্রী এবং ভাইকে তলপ করেছে ইডি। সংস্থার আরেক কর্তা এখন ইডি হেফাজতে। দেখেশুনে মনে হচ্ছে, ইডি বেশ আটঘাট বেঁধেই নেমেছে আইপ্যাডকে বাগে আনতে। তাতেই ভোটের ঠিক আগে ঘুম ছুটে গিয়েছে তৃণমূলের। এরমধ্যেই তৃণমূল ঘনিষ্ঠ এক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছে ইডি। মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ এক পুলিশ অফিসারের বাড়িতেও ইডির অভিযান চলেছে। সেই অফিসারকে নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, আমার সিকিউরিটি দেখেন যে অফিসার তাঁকে হেনস্থা করছে ইডি। আমাকে কি খুন করতে চায় ওরা? স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, এই সব কারণে তাঁর আর মাথা কাজ করছে না। প্রচার সভায় ভুলভাল বকছেন। মুখে যা আসছে, তাই বলে যাচ্ছেন।
রাজনীতিতে যে শালীনতাবোধ থাকা উচিত, তা দেখা যাচ্ছে না মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যে। মোদি, শাহকে তিনি তুই তোকারি পর্যন্ত করছেন, তাঁর মুখ দিয়ে গালিগালাজও বেরিয়ে আসছে কখনও কখনও। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, খুব চাপের মধ্যে আছেন বলেই মুখ্যমন্ত্রী নিজেকে সংযত রাখতে পারছেন না। কখনও তিনি বলছেন, মহিলাদের উপর অত্যাচার করার জন্য উত্তরপ্রদেশ থেকে সিআরপিএফ নিয়ে আসা হচ্ছে। মহিলাদের গায়ে হাত পড়লে আপনারা হাতা খুন্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বেন। আবার কখনও তাঁকে বলতে শোনা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে ব্যালট বাক্স লুঠ করার পরিকল্পনা করেছে নির্বাচন কমিশন। একটা মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসে এসব কথা বলা কতটা ঠিক, তা কি মমতা ব্যানার্জি জানেন না?
একদম এসআইআর পর্ব থেকেই তৃণমূল শাসিত রাজ্য সরকার নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যুদ্ধে নেমে পড়েছে। একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নির্বাচিত সরকার এভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করলে গণতন্ত্র যে বিপদের মুখে পড়ে, সেই বোধ পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ মমতার না থাকার কথা নয়। তবু কেন তিনি এই যুদ্ধে নেমেছেন, তা মমতাই বলতে পারবেন।কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচন কমিশন এবার বাংলায় অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট করাতে স্থিরপ্রতিজ্ঞ। তারা ঘোষণা করেছে, ভোটে কোনও রকম জাল জোচ্চুরি, বুথ জ্যাম, বুথ দখল করতে দেওয়া হবে না। ভোটে ভয় দেখালেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভোটের নির্ঘণ্ট প্রকাশের পর থেকেই কমিশন পুলিশ ও প্রশাসনের খোলনোলচে পাল্টে দিয়েছে। এটা মমতার আর একটা রাগের কারণ। তার মধ্যে ভোটের মুখেই ইডির সক্রিয়তা বেড়ে গিয়েছে। এসবের জন্যই মুখ্যমন্ত্রীর নার্ভ ফেল করছে।
এবারের বাংলার ভোট অবাধ ও হিংসামুক্ত করা কমিশনের কাছে একটা বড় চ্যালেঞ্জ। তার প্রথম পরীক্ষা হয়ে যাবে ২৩ এপ্রিল।









