মানুষের চেয়ে অনেক বেশি দিন ধরে পৃথিবীতে বসবাস করছে তারা। মানুষ যেখানে পৃথিবীতে এসেছে মাত্র কয়েক লক্ষ বছর আগে, যেখানে তারা পৃথিবীতে বাস করছে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কোটি বছর ধরে। অর্থাৎ ডাইনোসর আসার প্রায় ১২ কোটি বছর আগে থেকেই তারা পৃথিবীর বাসিন্দা। এখনও টিকে রয়েছে। তবুও আমরা তেমন পাত্তা দিতাম না তাদের। এবার কিন্তু ভারতবর্ষে হইচই পড়ে গেছে তাদের নিয়ে। একটা পুরো দলেরই জন্ম হয়ে গেছে তাদের নামে। দলটির নাম ককরোচ জনতা পার্টি বা আরশোলা জনতা পার্টি। লক্ষ লক্ষ ভারতীয় যুবক-যুবতি সদর্পে ঘোষণা করছে তারা সকলেই আরশোলা।
এরকম অদ্ভুত নামের একটি দল যে সমাজমাধ্যমে খোলা হয়ে গেল এবং দ্রুত তাদের অনুসরণকারীদের সংখ্যা করে বাড়তে থাকল হু হু, তার একটা বড়ো কারণ হচ্ছে আমাদের দেশের সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় প্রধান বিচারপতির একটি আলটপকা মন্তব্য। কর্মহীন বেকার যুবাদের তিনি হঠাৎই তুলনা করে ফেলেন আরশোলাদের সঙ্গে। পরে অবশ্য তিনি একটি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন যে, ভারতের যুবশক্তির প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে, তার লক্ষ্য একেবারেই সমস্ত যুবক-যুবতিরা ছিলেন না। কিন্তু তিনি যখন এই কথা বলছেন ততক্ষণে ধনুক থেকে তির বেরিয়ে গিয়েছে। ওই কথাটির প্রত্যাঘাত হিসেবে এক্স হ্যান্ডেলে নেহাতই মজা করে খোলা অভিজিৎ দীপকে নামে এক প্রবাসী ভারতীয়র ককরোচ জনতা পার্টি হুহু করে জনপ্রিয় হয়েছে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে। মাত্র দু-দিনের মধ্যেই এই দলের ফলোয়ারদের সংখ্যা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলির ফলোয়ারদের সংখ্যা চেয়ে বেশি হয়ে যায়। মনে রাখা প্রয়োজন যে, প্রথাগত রাজনৈতিক দলের মতো নির্বাচন কমিশনে সিজেপি নথিভুক্ত নয়। তাদের কোনো তহবিল বা অনুমোদিত নির্বাচনী প্রতীকও নেই। কিন্তু তবু এই দলটির এই হঠাৎ করে পাওয়া জনপ্রিয়তায় কেন্দ্র সরকার যে খানিকটা ঘাবড়েই গিয়েছে তা বেশ বোঝা গেছে ভারতবর্ষে এই দলটির এক্স হ্যান্ডেলটিকে ব্যান করে দেওয়ায়। এই ব্যানের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই আইনি লড়াই শুরু করেছে আরশোলাদের এই নতুন দল। তবে তাদের মামলাটির দ্রুত হিয়ারিংয়ের আবেদন নাকচ করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। অবশ্য ভারতে মূল পেজটি বন্ধ হলেও ‘ককরোচ ইজ ব্যাক’ নামে একটি নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। সেখানেও হু হু করে বেড়ে গেছে এই সদ্যোজাত দলটির অনুগামী সংখ্যা। ইতিমধ্যেই অবশ্য বেশ কিছু তথ্য সামনে এসেছে। যেমন জানা গেছে যে, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘আম আদমি পার্টি গুজরাত’ নামে খোলা একটি অ্যাকাউন্টই বার কয়েক নাম বদলে ২১ মে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। অনেকেই তাই বলছেন যে, এই দলটি আসলে বেনামে আম আদমি পার্টিটিই। আম আদমি পার্টির রাজ্যসভার সাংসদ সঞ্জয় সিং কিন্তু স্পষ্ট করে বলেছেন যে, আম আদমি পার্টির সঙ্গে ককরোচ জনতা পার্টির কোনোই সম্পর্ক নেই, “ককরোচ জনতা পার্টি মোদির নীতির বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভেরই প্রতিফলন। বিরোধী দলগুলির ওদের থেকে দূরে থাকাই উচিত। আমরা যদি ওদের [ককরোচ জনতা পার্টি-র] পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি, তাহলে ওদের বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়বে।”
গোয়েন্দারা অবশ্য এমনও সন্দেহ করেছেন যে, এই আন্দোলনে জড়িত কিছু সমাজমাধ্যম পেজ বিদেশ থেকে, বিশেষ করে পাকিস্তান থেকে পরিচালিত হচ্ছিল। সমাজ মাধ্যমের একাংশ আবার দাবি করেছে যে, সিজেপি-র ৭৭ শতাংশ অনলাইন-অনুসরণকারী পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আমেরিকার। ভারতে এই দলটি কোনোই প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। তবে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এই দাবি মানেননি। তিনি সিজেপি-র ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের ডেটা তুলে ধরে পালটা দাবি করেছেন যে, তাদের ৮২.৭ শতাংশ অনুসরণকারীই ভারতীয়। এ ছাড়া ১ শতাংশ আমেরিকার, ০.৭ শতাংশ ব্রিটেনের, ০.৬ শতাংশ করে কানাডা ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির।গোয়েন্দারা কিন্তু ভারতে এই নবগঠিত দলটির প্রভাবকে একেবারেই অস্বীকার করেননি। দিল্লিতে ইতিমধ্যেই ‘আমি আরশোলা’ লেখা প্ল্যাকার্ড গলায় ঝুলিয়ে আবর্জনার সাফাই করেছেন কয়েকজন যুবক-যুবতি। হরিয়ানার রোহতকেও জেলা পরিষদ সদস্য জসমেদ ভাগরের নেতৃত্বে সিজেপি-র ব্যানারে প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। বিহার, পশ্চিমবঙ্গ-সহ নানা রাজ্যে এই আন্দোলনের বিস্তার ঘটার ইঙ্গিত দিয়েছেন গোয়েন্দারা। ২৪ মে বেগুসরাইয়ের টাউন হলের সামনে সিজেপি ‘কনভেনশন’-এর ব্যানারে মানববন্ধনের ডাক দিয়ে কার্ড ছাপানো পোস্টারও ভাইরাল হয়েছিল। তবে অনুমতি না থাকায়, পুলিশ এই কর্মসূচি বাতিল করেছে। এই সমস্ত ঘটনা প্রবাহ থেকেই গোয়েন্দারা সন্দেহ করছেন যে, সমাজ মাধ্যমের প্রতিবাদ অতি দ্রুত মাঠে-ময়দানে বড়ো ছাত্র আন্দোলনের রূপ নিতে পারে। সাম্প্রতিক অতীতে জেনজিদের এমনতর বেশ কয়েকটি আন্দোলন দেখা গেছে বিশ্বজুড়েই। আমাদের প্রতিবেশী দুই দেশে–নেপাল আর বাংলাদেশে–তো ক্ষমতা পরিবর্তনও হয়ে গেছে জেনজিদের আন্দোলনের ফলেই। গোয়েন্দাদের আশঙ্কা ভারতেও যে এমন কিছু হবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
প্রশ্ন হলো, সত্যি সত্যিই আমাদের দেশের রাজনৈতিক পালাবদলে এই আরশোলারা কি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারবে? সাইবার দুনিয়ায় এখনও পর্যন্ত এরা যে সমর্থন পেয়েছে তা অভাবনীয়। একদিক থেকে ভাবলে সিজেপি-র পাঁচ দফা কর্মসূচি— বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা, শিক্ষাব্যবস্থার দুর্নীতি এবং বেকারত্ব— নতুন কিছুই নয়। বহুদিন ধরেই দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি এই বিষয়গুলি নিয়ে কথা বলেই চলেছে। কিন্তু এই ইস্যুগুলি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলি সেভাবে দেশজুড়ে সাড়া পায়নি। তাহলে একটি মিম-ভিত্তিক ডিজিটাল ক্যাম্পেন একই ইস্যুগুলি নিয়ে এই বিপুল সাড়া পাচ্ছে কী করে? এর একটা মূল কারণ হলো তরুণদের রাজনৈতিক দলগুলির প্রতি তৈরি হওয়া এক গভীর অবিশ্বাস। তারা মনে করে, রাজনৈতিক দল মানেই ক্ষমতার লড়াই, আপস, দুর্নীতি এবং আদর্শের অবক্ষয়। ফলে যখন কোনো রাজনৈতিক দলের বদলে কোনো “অরাজনৈতিক” বা “অপ্রাতিষ্ঠানিক” প্ল্যাটফর্ম একই কথা বলছে, তখন তা অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে। কারণ এই ক্ষেত্রে দলীয় অতীতের দায় নেই, মতাদর্শগত জটিলতা নেই, “আপনারা ক্ষমতায় থাকাকালীন কী করেছিলেন?”— এই প্রশ্নও নেই।
এটিই কিন্তু ককরোচ জনতা পার্টির এযাবৎকালে অর্জিত সাফল্যের মূল কারণ। এই নব্যগঠিত মূলত ডিজিটাল দলটিকে নিয়ে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিক্রিয়া নানা ধরনের হয়েছে। সমাজবাদী পার্টি, তৃণমূল কংগ্রেস বা আম আদমি পার্টির মতো দলগুলি দ্রুত এই দলের পাশে দাঁড়িয়েছে। অখিলেশ যাদব তো এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, “বিজেপি বনাম সিজেপি”। এভাবে এই নবগঠিত দলটিকে সমর্থন করার কারণ খুব স্পষ্ট। এখনও পর্যন্ত আরশোলারা যা করেছে তা থেকে পরিষ্কার যে, যুবসমাজের একটি বড়ো অংশের মধ্যে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা তীব্র আবেগের রূপ নিয়েছে। বিজেপি-বিরোধী রাজনৈতিক আবহ তৈরি করতে এই আবেগ এক ধারালো অস্ত্র হতে পারে। বলাই বাহুল্য বিজেপি এই নবউদিত দলটিকে একেবারেই পাত্তা দেয়নি বরং সরকারি ক্ষমতার ব্যবহার করে দলটির উত্থান যতখানি পারা যায় রোখার চেষ্টা করেছে। উল্লেখ্য যে, ইন্ডি জোটের অন্য দলগুলির মতো কংগ্রেস কিন্তু সিজেপির পাশে দাঁড়ায়নি। কংগ্রেস উলটে এই দলটির কার্যক্রম নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে। সন্দীপ দীক্ষিতের মতো নেতারা প্রশ্ন তুলছেন— সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি দলকে “ফলো” করলেই কি অনুগামীর রাজনৈতিক চেতনা তৈরি হয়? ময়দানে আন্দোলনের বিকল্প কি কখনোই ডিজিটাল আন্দোলন হতে পারে? এই দ্বিতীয় প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইতিহাস বলছে, কেবল ভার্চুয়াল শক্তি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে পারে না। নেপাল এবং বাংলাদেশ দু-ক্ষেত্রেই কিন্তু ডিজিটাল আন্দোলনের পাশাপাশি জেনজি অতি সক্রিয় ছিল মাঠে-ময়দানে। ইনস্টাগ্রামে কোটি ফলোয়ার থাকা আর বাস্তবে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলা এক জিনিস নয় কিন্তু। রাস্তায় নামা, গ্রামে কাজ করা, শ্রমিক-ছাত্র-নারী-প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি করা— এগুলির কোনো বিকল্প আজও রাজনীতিতে নেই। ‘ফলো,’ ‘লাইক’ বা ‘রিল’ রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন তৈরি করতে পারে না। এই প্রসঙ্গে মিশরের আরব বসন্তকে স্মরণ করা যেতেই পারে। সেবারও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে মুহূর্তে জনবিস্ফোরণ ঘটেছিল। কিন্তু সেই উত্তেজনাকে স্থায়ী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের রূপ দেওয়া যায়নি। উলটোদিকে, আমেরিকা বা ব্রিটেনের সাম্প্রতিক কিছু আন্দোলনে দেখা গেছে, ডিজিটাল প্রচারকে মাঠ-ময়দানের লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা হয়েছে। অর্থাৎ সোশ্যাল মিডিয়া এই আন্দোলনগুলির ক্ষেত্রে আন্দোলনের বিকল্প মাধ্যম নয়, বরং আন্দোলনকে পুষ্ট করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সিজেপি যদি সত্যিই একটি নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনা হয়ে উঠতে চায়, তাহলে তাকে ভার্চুয়াল পৃথিবী থেকে নেমে আসতে হবে বাস্তবের মাটিতে। শুধু ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে কাজ হবে না। দরকার নীতি। শুধু ভাইরাল হলেই হবে না, দরকার সংগঠন। শুধু ক্ষোভ নয়, বিকল্প রাজনৈতিক কল্পনাও দরকার। এসবের কিছুই কিন্তু এখনও পর্যন্ত দেখা যায়নি। তবে এই আন্দোলনটি কি ভারতীয় রাজনীতিতে হঠাৎ আলোর ঝলকানি হয়েই থেকে যাবে? এ-প্রশ্নের উত্তর এক্ষুনি দেওয়া মুশকিলের। শুধু এইটুকু বলা যায় যে, আন্না হাজারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনেক সংগঠিত উদ্যোগও কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যর্থই হয়েছিল। একটি জিনিস অবশ্য এই আন্দোলন পরিষ্কার করেছে। বেকারত্ব, পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকোচন— এসব নিয়ে দেশের যুব সমাজ প্রবলভাবে ক্ষুব্ধ। আরশোলাদের দলটি যদি ব্যর্থ হয় এই ক্ষোভকে কাজে লাগানোর চেষ্টা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো করবেই। সে-কাজে সফল হতে গেলে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিকে এই আন্দোলনটিকে মাথায় রেখেই জেনজিদের মন বোঝার চেষ্টা করতে হবে।











