একদা বৌদ্ধ-বাংলায় শিবমন্দির এসেছে অনেক পরে। দখল ও বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব সরিয়ে, আপাতত বাঁকুড়ার সিদ্ধেশ্বরী শিব মন্দিরই পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে প্রাচীন শিবমন্দির হিসেবে স্বীকৃত। রেখ-দেউল শৈলীর মন্দিরটি ওন্দা ব্লকের বাহুলারা গ্রামে অবস্থিত। আনুমানিক অষ্টম থেকে একাদশ শতকের মধ্যে এটি নির্মিত। মানে তা বৌদ্ধ-পাল যুগের। কোচবিহারের মহারাজা বিশ্ব সিংহের বানানো জলপাইগুড়ির জল্পেশ শিব মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়েছিল ১৫২৪ সালে। দিল্লির মসনদে তখন লোদী বংশের শেষ সুলতান ইব্রাহিম লোদী। ২ বছর পর বাবরের হাতে মুঘল সাম্রাজ্যের স্থাপন। মল্লভূমের রাজা ভরমল্ল ১৭৩৫ সালে নির্মাণ করলেন তারকেশ্বর শিব মন্দির। খোদ কলকাতায় প্রাচীনতম শিবমন্দির শোভাবাজারে। ১৬৫৫ সালে নন্দরাম সেন বানালেন আটচালার শিবমন্দির। তুলনায় বাংলার প্রাচীন বিষ্ণুমন্দির আরও আগের। চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতকের। বর্তমান বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার বালগ্রামে পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আসলে বাংলার প্রাচীন বিষ্ণুমন্দির। আজকের বিখ্যাত অন্যান্য শিবমন্দির অনেক পরের।

বাংলা কালীর নিজের বাড়ি। তন্ত্রসার, বৃহৎ তন্ত্রসারের রচয়িতা – নদ্বীপের কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ (১৬০০-১৭২০) প্রথম দক্ষিণাকালীর রূপ কল্পনা করেন। কৃষ্ণানন্দ দীপান্বিতা অমাবস্যায় মৃন্ময়ী কালীমূর্তি নির্মাণ করে, পূজা শেষে ভোরে বিসর্জন দিতেন। ক্রমেই তা ‘আগমবাগীশি কাণ্ড’ হিসেবে লোকমুখে প্রচার হতে থাকে। কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের পথে কবিরঞ্জন রামপ্রসাদ শ্যামাসঙ্গীত ও কালীসাধনার মাধ্যমে বাংলায় শাক্ত ধর্মকে জনপ্রিয় করে তোলেন। লোকমুখে বা জনপরিসরে তখন শাক্ত, বৈষ্ণব, শৈব, কাপালিক, ব্রাহ্মণ্য বলা হলেও —‘হিন্দু’ শব্দের ব্যবহার তেমন ছিল না। লোকজীবনে ‘সনাতন’ শব্দের ধারণাও তখন আসেনি। রামপ্রসাদের জন্ম ১৭১৮ সালে। মৃত্যু ১৭৭৫ সালে। মানে কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ থেকে রামপ্রসাদের কালীযাত্রা, মোগল সম্রাট জাহাঙ্গির থেকে পলাশির যুদ্ধ (১৭৫৭) পেরিয়ে যায়। আসে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।

দুর্গার মতো কালীও কলকাতার জমিদারবাড়ির রাজানুগ্রহ পায়। নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের পথে শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাজা নবকৃষ্ণ দেব, পটুয়াটোলা, জোড়াসাঁকো এবং পাথুরিয়াঘাটার বড়লোক বাড়িতে শুরু হয় কালী আরাধনা। অন্যদিকে কালীঘাটের কালীক্ষেত্র হয়ে ওঠার গল্প ভিন্ন। ১১০০ সাল নাগাদ রচিত চণ্ডীমঙ্গলে ধনপতি সওদাগর, পুত্র শ্রীমন্তকে নিয়ে সপ্তডিঙায় চেপে আদিগঙ্গা দিয়ে যাওয়ার সময় এখানে পূজা দিয়েছিলেন। মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গলে বর্ণিত আছে —
‘কালীঘাট এরাইল বেণীর নন্দন,
কালীঘাটে গিয়া ডিঙি দিল দর্শন।’
অবশ্য, জনশ্রুতি অনুযায়ী আত্মারাম ব্রহ্মচারী নামের এক শাক্তসাধক একদা কালীঘাটে কালীর ধ্যান করছিলেন। তারও আগে সতীপীঠ হিসেবে কালীঘাট চিহ্নিত হয়। কালীর কোঠা বা কোটা, মানে দেবীর ঘর বা আলয়। তা থেকেই কলিকাতা বা কলকাতার উৎপত্তি। এর সূত্র আছে আকবরনামা বা আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে। সেখানে দক্ষিণেশ্বর থেকে বেহালা পর্যন্ত বিস্তৃত এই অঞ্চলটিকে ‘কালীকোটা’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। ষোড়শ শতকে মহারাজা প্রতাপাদিত্য এবং তাঁর কাকা বসন্ত রায়ের সময়ে কালীঘাট মন্দিরের পুনর্নির্মাণের ইতিহাস পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলে এই নগরের নাম ইংরেজি উচ্চারণে ‘ক্যালকাটা’ হলেও, স্থানীয় ও বাংলা উচ্চারণে তা ‘কলকাতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। অনেক পরে, ১৮০৯ সালে বড়িশার জমিদার শিবদাস চৌধুরী, পুত্র রামলাল ও ভ্রাতুষ্পুত্র লক্ষ্মীকান্তের উদ্যোগে আদিগঙ্গার তীরে কালীঘাটের বর্তমান মন্দিরটি নির্মাণ করেন।

মোহনার কাছে গঙ্গার দীর্ঘ প্রবাহের অসংখ্য জনপদের সঙ্গে আগাগোড়া যুক্ত কলকাতা বন্দর। আদান-প্রদানের নৌকা কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, মেদিনীপুর, ২৪ পরগণা হয়ে ছুটেছে দিগ্বিদিক। ছড়িয়েছে কালীমহিমা। স্বচ্ছলের দিনলিপি, দরিদ্রের কামনায়, বেকার দুর্দিন ঘোঁচানোর স্বপ্নে, বিপ্লবী-সংগ্রামীর মুক্ত-স্বদেশের বাসনায়, গৃহীর স্বচ্ছলতার প্রত্যাশায়, পথ হারানো পথিকের দিশা পাওয়ার আশায় জুড়ে গেছেন কালো মা। নিত্যদিনের চাওয়ার পাওয়ার মাঝে, গুনগুনানিতে শব্দ হয়েছেন মুক্তকেশী। আগমবাগীশের মাকে বাংলার অন্তরাত্মায় গানে গানে বুনেছেন রামপ্রসাদ স্বয়ং। সে সুরেই আজো গান গেয়ে ফেরে বাউল, ভিখারি বা সাধক গাইয়ে। শ্যামা নামে দোলা লাগে, দোল খায় কলকাতার কোমল হৃদয়। কলকাত্তাওয়ালি জেগে ওঠেন রাস্তায়। গৃহকোণে। চায়ের আড্ডায়। সদরে, মোকামে, বন্দরে, বাজারে, মোড়ে — তাঁকে চোখের আড়াল করতে চায় না বিশ্বাসী। নালিশ হোক বা প্রার্থনা, ‘অপার সংসার, নাহি পারাপার, মাগো আমার’— বলে, হৃদয় উজার হয়, ব্যক্তির মনস্কামনায় মেশে কবেকার আয়োজন!
৫০০ মিটারের মধ্যে একাধিক মন্দির, গলির মুখে মুখে সজাগ কালিকা, খড়্গ হাতে অশনি ঘোঁচান তিনি। যৌথপরিবার ভাঙার পর, এই ফ্ল্যাট-নগরের উঠোন থেকে শনি-সত্যনারায়ণের ঠাঁই হয়েছে গলিতে, মোড়ে। বাবরি মসজিদ ভাঙার পর শনিমন্দির বেড়েছে গতিতে। হয় কালী সেখানে ছিলেন, বা নতুন করে এলেন। পুরনো কালীমন্দির আর বাঙালি পুরুত হলে, পান্নালালের ক্যাসেট-সিডি বাজত সেখানে। রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত, রাম বসু, নজরুল হয়ে—গানে গানে সন্ধ্যায়-সকালে আস্কারা দিয়ে যেতেন কলকাত্তাওয়ালি।

গ্রামোফোন কোম্পানির লাভজনক কালীগান গিলেছে রসিক। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম, সত্যি-মিথ্যার ধাঁধায়, সহসা উচ্চারণ করেছে— ‘মা কালীর দিব্যি’। এহেন কলকাতায় আজ বজরংবলির দাপট। হনুমান মন্দিরে ছেয়ে গেছে কলকাতা! ভক্তি আর ভাব কি কালী শক্তি হারালেন? হলেন কি নির্লিপ্ত?
আজকের কলকাতায় হিন্দি বাড়ছে। সহাবস্থান সরিয়ে ক্রমেই অস্মিতার অস্তিত্ব জুড়ছে পশ্চিম ও উত্তর ভারতের হিন্দিপুঁজি। সাবর্ণের বিস্তারে জনমত হয়ে সংখ্যা জানান দিচ্ছে — দলিত। একদিন যারা কলকাতায় এসেছিলেন রোজগারের জন্য, তাদের সমকাল — পাড়ার মোড়ে হনুমান সাজিয়েছে সহসা। বাকি সব ভোটব্যাঙ্ক। ব্যাঙ্ক-বীমা-রেলও তাই—হিন্দির বিস্তারে বিনিয়োগ করে। বাঙালি পাড়ার ব্যাঙ্কে, কর্মচারীর ভাষা হিন্দি। প্রমাদ গোনেন কি কলকাতার মা? সে পুঁজি স্বীকৃতি পায়, গুরুত্ব পায় হিন্দি-জনসংখ্যা। হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানে গুলিয়ে দেওয়ার সে আয়োজনে আসে নিরামিষ্যি বাগেশ্বর-বাবা। রামপ্রসাদ, রামকৃষ্ণ হয়ে আস্ত কালী-সভ্যতায় আসে মাছ-মাংসের বিচার। ক্রমেই আরও-আরও জাগ্রত হয় বজরংবলী। গ্রহণের আগে, নিবেদনে মাকে ডাকা শাক্তমনে আনচান বাড়ে।

বৌদ্ধভূমিতে শৈব-হানা টপকে, বজ্রযানী তন্ত্রের নিরালা পথ ধরে তারার মাটিতে এসেছেন চতুর্ভুজা। নিচে — বৈশ্য প্রতিনিধি, খানিক মেদবহুল ভোলানাথ। আদিশক্তি জাগ্রত হলে, আসবে স্বাধীনতা! এ ভাবনায় ভবানী পাঠক হয়ে জুড়ে গেছেন নেতাজি সুভাষ। ৬০-৭০ দশকের উত্তাল দিনে ক্রমেই বেড়েছে কলকাত্তাওয়ালির থান। পাড়ার ছেলেরা গলি টপকে মোড়ে জানিয়েছে নিজেদের অস্তিত্ব। কালী হয়েছেন ঠিকানা। এমন জনপদে বজরংবলী, নয় কালীর পাশে, অথবা একা। কলকাতার জনবিন্যাস, অর্থনীতি, সমাজ, ভাষা— এসে দাঁড়িয়েছে নতুন সংঘাতে। একদল ক্ষয়িষ্ণু, আরেক দল বিস্তারে মগ্ন। নতুন দিনের শেষে ফলাফলও অনিবার্য। আগমবাগীশ বা রামপ্রসাদ — হারিয়ে যাবেন নাকি? ‘রক্ষে কর মা মুক্তকেশী!’
