পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিসরে ‘ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান’ একটি দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতের মতো, যা বিগত কয়েক দশক ধরে ভোটের বাজারে কেবল রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। রাজ্যের বিধানসভা থেকে শুরু করে লোকসভা নির্বাচন—প্রতিটি রাজনৈতিক মরসুমেই ঘাটালের জলমগ্ন জনপদের মানুষের আবেগ এবং দাবিকে সামনে রেখে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছোটানো হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী তার দিল্লি সফরে অংশ নেন কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রকের ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে। সেখানেই এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত প্রকল্পটিকে বাস্তবায়ন করা নিয়ে ওঠে আলোচনা৷
দিল্লিতে কেন্দ্রীয় জলশক্তিমন্ত্রী সি আর পাতিলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত গঙ্গা ফ্লাড কন্ট্রোল মিশনের এই ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও বিহার ও ঝাড়খণ্ডের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘদিনের বকেয়া ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নে এবার কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার যৌথভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ অতীতে এই প্রকল্প রূপায়ণকে কেন্দ্র করে কেন্দ্র-রাজ্য দড়িটানাটানি এবং অর্থনৈতিক সহায়তার অভাব বারবার সামনে এসেছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষেই এই কাজের জন্য ১,২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করার ঘোষণা করা হয়েছে৷ যা এই প্রকল্পটির বাস্তবায়নকে অনেক বেশি সুনিশ্চিত করেছে।
আইআইটি কানপুর এবং আইআইটি রুরকি-র মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানকে এই প্রকল্পের নতুন রূপরেখা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্রকল্পটির কার্যকারিতা বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে, যা ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের ও ক্রমবর্ধমান নদীভাঙনের ঝুঁকি মোকাবিলায় অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি, ২০২৮ সালের মধ্যে পুরো প্রকল্প সম্পন্ন করার নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বৈঠকে ১২টি স্পার তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে যেখানে একসাথে কাজ করবে ঝাড়খণ্ড ও বিহার সরকার৷ গঙ্গার ভাঙন রোধ ও নদী সংস্কারের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের প্রস্তাবিত পরিকল্পনার বাস্তবায়নে প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খণ্ডের থেকে নো অবজেকশন সার্টিফিকেটের প্রয়োজন রয়েছে। এই আন্তঃরাজ্য বৈঠকে সেই জটিলতাগুলি নিয়ে আলোচনা হয় এবং বিহার কর্তৃক ১৬ কিলোমিটার ড্রেজিংয়ের জন্য ছাড়পত্র প্রদান করা হয়েছে৷ এই ধরনের বৃহৎ ভৌগোলিক প্রকল্পের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সীমানা পেরিয়ে সহযোগিতামূলক ফেডারেল কাঠামোর গুরুত্ব অপরিসীম।
পরিশেষে বলা যায়, ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান এবং গঙ্গার ভাঙন রোধ সংক্রান্ত এই দিল্লি বৈঠক এবং গৃহীত পদক্ষেপগুলি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। এতদিন ধরে যে সমস্যাগুলি নিয়ে কেবল রাজনৈতিক তরজা ও একে অপরকে দোষারোপের রাজনীতি চলত, তা এখন একটি সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক সময়সীমা ও যৌথ রূপরেখার আওতায় এসেছে। তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এখন কেবল কাগজকলমের প্রতিশ্রুতি বা আর্থিক বরাদ্দের ঘোষণায় আটকে নেই; বরং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই মেগা প্রকল্পের সফল রূপায়ণই নির্ধারণ করবে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সুশাসন ও উন্নয়নের সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়।

