“আমি খুব খুশি। যা হয়েছে, ঠিক হয়েছে।”- বললেন এনকাউন্টার হওয়া অপরাধীর বাবা!

১০ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায় নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের অভিযুক্ত প্রহ্লাদ দাসের পুলিশি এনকাউন্টারে মৃত্যুর ঘটনা এবং পরবর্তীতে তার মায়ের প্রতিক্রিয়া বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সাধারণত অপরাধীর বিচারপ্রক্রিয়ায় পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশের এই ধরনের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সুর শোনা যায়। কিন্তু গাইঘাটার ঘটনায় অভিযুক্তের মায়ের কণ্ঠে যে বক্তব্য উঠে এসেছে সেখানে তিনি মা হিসেবে বেদনাহত হলেও দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এই অপরাধের কঠোর শাস্তির পক্ষে সওয়াল করেছেন।ছেলের দেহ ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে যাওয়ার সময় কান্নায় ভেঙে পড়ে মা। তবে এত পুলিশকর্মীর উপস্থিতিতে প্রহ্লাদ কী ভাবে পালানোর চেষ্টা করল, তা নিয়ে মৃদু সংশয় প্রকাশ করলেও, সামগ্রিকভাবে একজন নাগরিক হিসেবে তিনি পুলিশের পদক্ষেপকে সমর্থন করেন। তাঁর দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য ছিল—এমন অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তি প্রাপ্য, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন নৃশংসতা করার সাহস না পায়।

এই ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক বা তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি হল প্রচলিত বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার পারদ ক্রমশ কোন দিকে নামছে তার ইঙ্গিত। আইন আদালতে মামলার দীর্ঘ শুনানি এবং দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবের ফলে সমাজ ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলির পাশাপাশি অপরাধীর পরিবারের মধ্যেও একধরনের ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে দেখা যাচ্ছে। “আমি খুব খুশি। যা হয়েছে, ঠিক হয়েছে।”- বলেন অপরাধীর বাবা। যখন একজন মা, বাবা নিজের সন্তানের এমন পশুবৃত্তিমূলক অপরাধ মেনে নিতে পারেন না এবং বিচারব্যবস্থার শ্লথগতির বদলে তাৎক্ষণিক ‘বিচার’-এর পক্ষে দাঁড়ান, তখন তা রাষ্ট্রীয় বিচারপ্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করে।

ভোট-পরবর্তী বাংলায় অপরাধ দমনকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক অতীতে পুলিশের এ ধরনের এনকাউন্টারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উঠে এসেছে তরজা৷ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে পুলিশি অতিরিক্ত ক্ষমতার প্রয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে মেরুকরণ ঘটেছে৷ এক পক্ষ যখন কঠোর হাতে অপরাধ দমনের নামে এই ধরনের পদক্ষেপকে ‘সময়োপযোগী’ বলে বাহবা দিচ্ছেন, তখন অপর পক্ষ একে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিচারব্যবস্থার ওপর সরাসরি আক্রমণ বলে অভিহিত করছে। অভিযুক্তের মায়ের এই মন্তব্য রাজনৈতিক দলগুলির হাতে এক নতুন হাতিয়ার তুলে দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারের পুলিশি পদক্ষেপকে প্রচ্ছন্নভাবে বৈধতা দেওয়ার এক অস্ত্র হিসেবে এই ধরনের ঘটনাকে দেখা হচ্ছে।

যখন অপরাধ এতটাই নৃশংস রূপ ধারণ করে যে সমাজের মৌলিক মানবিক বোধ পর্যন্ত কেঁপে ওঠে, তখন মাতৃত্বের চিরন্তন আবেগও অপরাধের কাছে পরাজিত হয়। অভিযুক্তের মায়ের বক্তব্যে একাধারে যেমন নিজের সন্তানকে হারানোর জন্য বুকফাটা আর্তনাদ রয়েছে, তেমনই অন্যদিকে সমাজের কাছে মুখ দেখাতে না পারার এক সামাজিক অপরাধবোধ ও ক্ষোভও লুকিয়ে রয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, গাইঘাটার এনকাউন্টার এবং তার প্রেক্ষিতে মায়ের এই বিতর্কিত অথচ বাস্তবসম্মত অবস্থান আমাদের বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সামনে একটি কঠিন আয়না ধরে দিয়েছে। দ্রুত বিচার ও অপরাধ দমনের জন্য আইনের শাসনকে উপেক্ষা করে এই ধরনের বিচারবহির্ভূত পদক্ষেপের প্রতি সমাজের একাংশের সমর্থন গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ ও আইনের নিরপেক্ষতার সামনে এক প্রশ্নচিহ্ন৷ রাষ্ট্র যখন নিজেই বিচারক এবং জল্লাদের ভূমিকা পালন করে এবং সমাজ, খোদ অপরাধীর পরিবারও তা মেনে নেয়, তখন তা এক গভীর সমাজতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক সংকটেরই পূর্বাভাস দেয়।

নির্ভীক ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পাশে থাকুন

সত্যকে স্বাধীন রাখতে আমাদের পাশে থাকুন। অনুদান দিতে QR কোড স্ক্যান করুন অথবা আমাদের UPI ID ব্যবহার করুন।

UPI ID 8240214079@okaxis

অন্যান্য প্রতিবেদন.