বাঙালির প্রাণের উৎসব, কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা। বিশ্বাঙ্গনের এই সর্ববৃহৎ সাহিত্যিক মিলনমেলা এবার এক অন্য মাত্রিক সমীকরণে এসে দাঁড়িয়েছে। আসন্ন ২০২৭ সালের বইমেলা পরিচালনা নিয়ে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে একটি ২৪ সদস্যের উপদেষ্টা কমিটি গঠিত হয়েছে। এই কমিটি গঠনের পরই সাহিত্য ও রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র গুঞ্জন। একদিকে মেলা পরিচালনা কমিটির প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, আর অন্যদিকে কলকাতার প্রাচীন বইপাড়া কলেজস্ট্রিটের অন্দরে জমে উঠছে রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত মেঘ।
মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান উপদেষ্টা সুব্রত গুপ্তর স্বাক্ষরিত নির্দেশিকা অনুযায়ী, গত ১৭ ও ২১ আগস্ট নবান্নে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর এই ২৪ জনের কমিটি গঠিত হয়। ২০২৭ সালের কলকাতা বইমেলা যৌথভাবে আয়োজন করার কথা রয়েছে পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ড, ইজেডসিসি (EZCC) এবং ন্যাশনাল বুক ট্রাস্টের (NBT)। আর এই পুরো আয়োজনে নীতিগত ও সার্বিক পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করবে রাজ্য সরকারের এই নতুন কমিটি।
এই কমিটিতে রামকৃষ্ণ মিশন ও ভারত সেবাশ্রম সংঘের মতো আধ্যাত্মিক ও সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়েছে। রামকৃষ্ণ মিশন থেকে স্বামী আর্যেশানন্দ এবং ভারত সেবাশ্রম সংঘ থেকে স্বামী সারস্বতানন্দ এই কমিটিতে স্থান পেয়েছেন। এছাড়া গিল্ডের বর্তমান অভ্যন্তরীণ মুখ হিসেবে দেবজ্যোতি দত্ত, অনিল আচার্য, মিলিন্দ দে, রাজকুমার বর্মন ছাড়াও দেবজিৎ সরকার, সপ্তর্ষি চৌধুরি, প্রসেনজিৎ বক্সি, বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুকেশ মণ্ডল, মোহিত রায়, ওসমান গণি, আশিস গিরিদের নাম রয়েছে।
গিল্ডের বর্তমান সভাপতি সুধাংশুশেখর দে এবং সম্পাদক ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতো দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখগুলি এই কমিটিতে না থাকায় বইমহলে নানাবিধ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হিসেবনিকেশ নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। ঐতিহ্যের ধারা বজায় রেখেও ক্ষমতার ভারসাম্যে কোনও বদল আসছে কি না, তা নিয়ে শুরু হয়েছে জোরদার চর্চা।
গত ৪ মে- রাজ্যে পালাবদলের পর থেকেই বইপাড়ায় তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক চাপ। কখনো ফুটপাতের প্রাচীন ও পরিচিত বইবিক্রেতাদের মুখে শোনা গেছে মৌখিক হুশিয়ারির কথা, আবার কখনো সামাজিক মাধ্যমে (ফেসবুক পোস্ট) ভেসে এসেছে নিদান—বইপাড়ায় বিক্রি করা যাবে না বাংলাদেশের বই।
সাহিত্যের কোনো ভৌগোলিক সীমানা হয় না, বর্ডার দিয়ে চিন্তাকে ভাগ করা যায় না—এই আপ্তবাক্যকে সঙ্গী করে যারা দশক ধরে বাংলা সাহিত্যকে দুই বাংলার সেতুবন্ধনে বেঁধে রেখেছিলেন, আজ তারা এক অদৃশ্য ভয়ে আচ্ছন্ন। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই কড়াকড়ি বা নিষেধাজ্ঞার নেপথ্যে কোনো লিখিত নোটিশ বা সরকারি নির্দেশিকা আজ পর্যন্ত সরাসরি পৌঁছায়নি কোনো প্রকাশক বা ফুটপাতের বিক্রেতার কাছে। অথচ অলিখিত এই অদৃশ্য দেয়াল ও মৌখিক ফতোয়ার কড়চা বইপাড়ার বাতাসকে ভারী করে তুলেছে। প্রশ্ন উঠতেই পারে, যে সাহিত্য নজরুলের বিদ্রোহী বাণী কিংবা রবীন্দ্রনাথের বিশ্বজনীনতার আলোয় পথ চলে, তাকে কি কখনও মৌখিক ফতোয়া দিয়ে আটকে রাখা সম্ভব?
সাহিত্য এবং রাজনীতি সবসময়ই একে অপরকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু যখন সেই প্রভাব স্বতঃস্ফূর্ত সৃজনশীলতার গলায় অদৃশ্য ফাঁস পরাতে চায়, তখন সাহিত্যের মেরুদণ্ড নড়ে ওঠে। বাংলা প্রকাশন জগৎ আজ এক অদ্ভুত ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে। একদিকে ২০২৭ সালের বইমেলাকে সর্বাঙ্গীন সুন্দর করে তোলার সুদৃশ্য প্রশাসনিক তোড়জোড়, আর অন্যদিকে কলেজস্ট্রিটের ফুটপাতে বসে থাকা সেই ক্ষুদ্র বইবিক্রেতার বুক ধড়ফড়ানি—যিনি শুধু দু মুঠো অন্নের টানে দুই বাংলার গল্প পাঠকদের হাতে তুলে দেন।
তবে, ইতিহাস সাক্ষী, হাজারো নিষেধাজ্ঞা আর অদৃশ্য সেন্সরশিপের দেয়াল টপকেই সাহিত্য নিজের পথ খুঁজে নিয়েছে বারবার। কালির দাগে মুছে ফেলা যায় না মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা। বইয়ের পাতা সাক্ষী থাকবে, কোন রাজনীতি জয়ী হলো আর কোন সাহিত্য বেঁচে রইল মানুষের অন্তরে।

