বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে যে বিশাল অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো গড়ে উঠেছে, তার হৃৎপিণ্ড হল কলকাতার কুমারটুলি। শত শত বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে ওঠা এই পটুয়াপাড়া আজ এক গভীর সঙ্কটের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সাম্প্রতিক সংবাদ ও তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় কুমারটুলিতে প্রতিমার বায়না এক ধাক্কায় প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার পর্যন্ত কমে গেছে। গত মরশুমে যেখানে সাড়ে ছ’হাজারের কাছাকাছি প্রতিমার বরাত এসেছিল, এবার তা নেমে এসেছে মেরেকেটে সাড়ে চার হাজারে। এই পরিসংখ্যান কেবল মৃৎশিল্পীদের রুটিরুজির পতনকেই নির্দেশ করে না, বরং এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট।
কুমরটুলির প্রবীণ ও নবীন মৃৎশিল্পীদের মতে, প্রতিমার বায়না হ্রাসের কারণ বহুমুখী। একদিকে যেমন অনেক জায়গায় পুজো বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর মিলছে, অন্যদিকে তেমনই তৈরি হয়েছে নানা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিধিনিষেধের চাপ। পটুয়াপাড়ার শিল্পীরা জানাচ্ছেন, থিমের প্রতিমা তৈরির ক্ষেত্রেও নানা বাধা ও নজরদারি তৈরি হয়েছে, যা আগে ছিল না। অতীতে পুজো কমিটিগুলি নির্দিষ্ট নকশা বা ছবি দিয়ে প্রতিমা বায়না করত, সেই অনুযায়ী শিল্পীরা নিখুঁত মূর্তি গড়ে তুলতেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই স্বাধীন ও সৃজনশীল কাজের পরিসর সংকুচিত হচ্ছে। ফলস্বরূপ, ষষ্ঠী পুজোর প্রাক্কালে কুমারটুলির গলিগুলিতে যে উৎসাহ ও ব্যস্ততার ছবি দেখা যাওয়ার কথা ছিল, আজ সেখানে অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তার ছায়া।

মৃৎশিল্পীদের এই দুরবস্থার পেছনে কেবল বায়না কমা নয়, রয়েছে কাঁচামালের জোগান ব্যাহত হওয়ার মতো গুরুতর সমস্যাও। প্রতিমা তৈরির মূল উপাদান—মাটি এবং কাঠামো বাঁধার বাঁশ—সংগ্রহের পথগুলো একে একে রুদ্ধ হয়েছে। অতীতে উলুবেড়িয়া বা ডায়মন্ড হারবার অঞ্চল থেকে সহজে মাটি আসত এবং বৈশাখ মাস থেকেই পুরোদমে কাজ শুরু হয়ে যেত। কিন্তু নানা প্রশাসনিক জটিলতা ও অনুমতিহীনতার অজুহাতে চলতি বছরে মাটি আসার পথ দীর্ঘ সময় ধরে আটকে ছিল। ফলে প্রতিমা নির্মাণের কাজ প্রায় আড়াই মাস পিছিয়ে যায়।
একইভাবে, বাঁশ সরবরাহের ক্ষেত্রেও বড় ধাক্কা এসেছে। নদীয়ার তেহট্ট থেকে গঙ্গায় ভাসিয়ে বাঁশ আনার যে ঐতিহ্যগত ও সাশ্রয়ী মাধ্যম ছিল, তা বর্তমানে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গঙ্গার সংস্কার বা অন্য কোনো নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে নদীপথে নৌকা বা ভেলায় করে বাঁশ আনা ব্যাহত হওয়ায় কাঠামোর কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কুমারটুলির প্রবীণ শিল্পী মাধব পালের আক্ষেপ, “ছয় পুরুষের মৃৎশিল্পী আমরা, অনেক সরকার দেখেছি, কিন্তু দুর্গাপুজো নিয়ে এমন ছেলেখেলা করতে দেখিনি।”

এই সঙ্কটের নেপথ্যে রয়েছে রাজ্য তথা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট। একদিকে রাজ্য সরকারের অনুদানপ্রাপ্ত পুজো কমিটিগুলির রাজনৈতিক সমীকরণ এবং অন্যদিকে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান—সব মিলিয়ে দুর্গাপুজোকে ঘিরে এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অতীতে যেখানে পুজো মানেই ছিল সার্বজনীন আনন্দ, মেলবন্ধন এবং সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ, আজ সেখানে নানা বিধিনিষেধ ও অসহিষ্ণুতার বাতাবরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের একাংশের মতে, উৎসবের পরিসরকে নির্দিষ্ট একটি মতাদর্শ বা বৃত্তের মধ্যে বন্দি করার প্রবণতা এবং প্রশাসন ও বিভিন্ন পক্ষের দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত আঘাত হানছে সাধারণ শিল্পী ও শ্রমিকদের পেটে।
কুমারটুলির প্রতিটি প্রতিমার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হাজার হাজার পটুয়া, কাঠমিস্ত্রি, সাজ-সজ্জা শিল্পী এবং রঙকর্মীর পরিবার। প্রতিমার বায়না কমে যাওয়া এবং সময়মতো কাঁচামাল না পাওয়ার অর্থ হল এই লক্ষাধিক মানুষের অর্থনৈতিক বিপর্যয়। দুর্গাপুজোর ইউনেস্কোর ঐতিহ্যবাহী তকমা পাওয়ার পর যেখানে উৎসবের অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হওয়ার কথা ছিল, সেখানে প্রশাসনিক কড়াকড়ি এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েনের জেরে পটুয়াপাড়ার চাকা আজ শ্লথ।
কুমারটুলির এই সঙ্কট নিছকই কিছু মাটির মূর্তি কম বিক্রির ঘটনা নয়; এটি আসলে আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির বহুত্ববাদী চরিত্রের ওপর একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন। ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও শিল্পীদের বাঁচিয়ে রাখতে হলে রাজনৈতিক সংকীর্ণতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ঊর্ধ্বে উঠে উৎসবের অর্থনীতিকে রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায়, দুর্গোৎসবের এই আন্তর্জাতিক খ্যাতি হয়তো টিকে থাকবে, কিন্তু যে শিল্পীদের জাদুকরী আঙুলে দেবী রূপ পান, সেই মৃৎশিল্পীরা হারিয়ে যাবেন অন্ধকারের অতলে।

