মিষ্টিমুখে স্বর্গসুখ, অথচ আজও খেতমজুরদের জীবন কাটে দাসত্বে!

১০ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

ব্রাজিল বিশ্বের বৃহত্তম চিনি উৎপাদনকারী দেশ। আর দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ভারত। ভারতের মোট উৎপাদিত চিনির প্রায় ৩৫ শতাংশই আসে মহারাষ্ট্র থেকে। নভেম্বর মাস থেকে শুরু করে টানা ছয় মাস ধরে মহারাষ্ট্রের বিস্তীর্ণ আখের খেতে রক্তজল করা খাটনি খাটেন প্রায় দশ লক্ষ শ্রমিক।যাঁদের নামটুকু পর্যন্ত কোথাও নথিভুক্ত থাকে না, ঠিকাদারদের সঙ্গে কেবল মৌখিক বোঝাপড়ার ওপর ভর করেই যনেমে পড়তে হয় এই পরিযায়ী শ্রমে।


​ বাজারে চিনির দাম আগুন ছুঁয়েছে। অগস্ট মাসে ভারতে চিনির দাম একলাফে প্রায় কুড়ি শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার খবর নিয়ে কম চর্চা হচ্ছে না। ইথানলের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, খামখেয়ালি মৌসুমী বায়ু বা ফসলের রোগবালাই— দাম বৃদ্ধির নেপথ্যে এই সমস্ত কারণ নিয়ে আলোচনার অন্ত নেই। কিন্তু সেই মূল্যবৃদ্ধির বিন্দুমাত্র সুফল পৌঁছয় না যাঁদের রক্তঘামে এই মিষ্টি উৎপাদিত হয়, সেই আখখেতের খেতমজুরদের কাছে।তাঁদের জীবন থেকে যায় চরম অবহেলিত।


​ ঔপনিবেশিক আমলের গোড়ার দিকে আখের খেতে কায়িক শ্রম দেওয়ার জন্য উপনিবেশ অঞ্চলের বাসিন্দাদের ট্রান্স আটলান্টিক নেটওয়ার্ক ধরে ক্রীতদাস হিসেবে পাঠানো হতো আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে—মূলত লাতিন আমেরিকার দেশগুলির আখ খেতে, যেগুলির মালিকানা ছিল ব্রিটিশ বা স্প্যানিশ সরকারের হাতে। পরবর্তীকালে ক্রীতদাস প্রথা খাতায়কলমে নিষিদ্ধ হওয়ার পরও মূলত চুক্তিবদ্ধ শ্রম বা ইনডেন্টার্ড লেবারের নামে একই ধরনের শোষণমূলক ব্যবস্থা অক্ষুণ্ণ রাখা হয়।

মহারাষ্ট্রের আখখেতে কর্মরত মজুর। ছবি :সংগৃহীত


রোদ-বৃষ্টি তুচ্ছ করে দিনে চৌদ্দ থেকে ষোলো ঘণ্টা পর্যন্ত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন আখমজুররা। খেতের ঠিক পাশেই অস্থায়ী প্লাস্টিক বা তাঁবুর ঝুপড়ি বানিয়ে চলে তাঁদের দিনযাপন। বিদ্যুৎ, শৌচাগার বা স্নানের তো কোনো প্রশ্নই নেই, বহু ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পানীয় জলটুকুও জোটে না। সরকারি খাতায় নাম নেই, নেই কোনো স্বাস্থ্যবিমা বা সামাজিক সুরক্ষার ন্যূনতম ব্যবস্থা।
​এঁদের সিংহভাগই দলিত পরিবারের মানুষ। গ্রামের পর গ্রাম বাড়তে থাকা তীব্র কৃষিসংকট, খরা এবং চরম কর্মহীনতার জেরে পেটের টানে এই কঠিন পরিযায়ী শ্রম বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা।


​মৌলিক মানবাধিকার তো দূরের কথা, এই শ্রমিকদের জীবনে নেমে আসে মর্মান্তিক শারীরিক বিপর্যয়। দীর্ঘক্ষণ ধরে একটানা কাজ করার ফলে পেশি ও হাড়জনিত অসুস্থতা, বিশেষ করে মাসকুলোস্কেলেটাল ডিসঅর্ডার (MSD)-এর প্রকোপ অত্যন্ত বেশি এই শ্রমিকদের মধ্যে। ক্রমাগত ঝুঁকে ঝুঁকে আখের ডাঁটির ভারী বোঝা বহন করায় কোমরের উপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে।এই দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যার পরিণতি শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় স্থায়ী পঙ্গুত্বে।


​তাছাড়া, দিনে ১২-১৪ ঘণ্টা ধরে ধারালো কাটারি দিয়ে আখ কাটার সময় সামান্য ভুলচুক হলেই ঘটে বড়ো ধরনের জখম, যা অনেক সময় স্থায়ী অঙ্গহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
​সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মহারাষ্ট্রের এই লাভজনক চিনি কলগুলির একটা বড়ো অংশের মালিকানা দলমত নির্বিশেষে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের হাতেই ন্যস্ত। বিগত সত্তর বছর ধরে, অর্থাৎ তথাকথিত “স্বাধীনতার” অব্যবহিত পর থেকেই এই ক্ষমতাশালীদের সিন্ডিকেট ও দাপট ক্রমশ বেড়েই চলেছে। মানবাধিকারের সমস্ত আইন-কানুনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মালিক, ঠিকাদার এবং কর্পোরেট তন্ত্রের যৌথ অভিসন্ধি বহু খেতমজুরের জীবন ও ভবিষ্যৎ পিষে মারছে।


​ঋণের দায়ে জর্জরিত এই পরিবারগুলিতে পরবর্তী প্রজন্মকে স্কুলে পাঠানোর মতো ন্যূনতম সুযোগটুকুও জোটে না। উল্টোদিকে, মালিকদের সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করতে গোটা পরিবারকেই শিশুশ্রম ও পারিবারিক শোষণের জালে জড়িয়ে ফেলা হয়। ফলে শিশুরা পর্যন্ত এই নরকযন্ত্রণা থেকে রেহাই পায় না।


​ব্রাজিলের পর ভারতের এই বিপুল চিনি উৎপাদনের অর্থনীতি আসলে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক সম্পূর্ণ পুঁজিবাদী ও শোষণমূলক কাঠামোর ওপর। মৌখিক চুক্তির বেড়াজালে বন্দি অসহায় পরিযায়ী শ্রমিকদের মেরুদণ্ড ভেঙে তবেই মিষ্টান্ন উৎপাদিত হয় এই দেশে। ন্যূনতম মানবাধিকারটুকুও যেখানে বিলাসিতা, সেখানে রাষ্ট্র ও সমাজের উদাসীনতা এই ব্যবস্থাকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করছে। চিনির বাজারের ঊর্ধ্বমুখী দাম আর সাধারণ মানুষের খাবার পাতে রোজ একটু মিষ্টি- এর আড়ালে রয়ে যায় দাসত্বের এই অন্ধকার পর্যায়৷

অন্যান্য প্রতিবেদন.