স্বামী বিবেকানন্দের ঐতিহাসিক শিকাগো বক্তৃতার দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে এবং ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা ও যুক্তিবাদী মানসিকতা গড়ে তুলতে নদীয়া জেলার হাঁসখালি ব্লকের অন্তর্গত ঐতিহ্যবাহী বগুলা ভবানীপুর উচ্চ বিদ্যালয় এক অনন্য ও অভিনব উদ্যোগ গ্রহণ করল। গত ১১ সেপ্টেম্বর এই বিদ্যালয়ের উদ্যোগে এবং এলাকার প্রায় পনেরোটি উচ্চ বিদ্যালয়ের সক্রিয় অংশগ্রহণে এক বর্ণাঢ্য বিজ্ঞান প্রদর্শনী ও সেমিনারের আয়োজন করা হয়। বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিজ্ঞানচর্চার প্রসার ঘটাতে এই আয়োজন সমগ্র এলাকায় এক অভূতপূর্ব সাড়া ফেলেছে।
এদিনের এই বিজ্ঞান মেলায় এলাকার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে অংশগ্রহণ করে। প্রদর্শনীটিকে আকর্ষক করে তুলতে শিক্ষার্থীরা পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, ইলেকট্রনিক্স, জীববিদ্যা, ভূগোল এবং পরিবেশবিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে প্রায় তিরিশটিরও বেশি বৈজ্ঞানিক মডেল তৈরি করে প্রদর্শন করে। শুধু মডেল প্রদর্শনই নয়, প্রতিটি মডেলের পেছনের বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা তুলে ধরার জন্য বিশেষ প্রেজেন্টেশনেরও ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কচিকাঁচা শিক্ষার্থীদের এই সমস্ত সৃষ্টিশীল ও ইনোভেটিভ প্রজেক্ট দেখে মুগ্ধ হন উপস্থিত দর্শক ও শিক্ষক-শিক্ষিকারা।
বিজ্ঞান প্রদর্শনীর পাশাপাশি এদিনের মূল আকর্ষণ ছিল একটি উচ্চমানের সেমিনার। বর্তমান যুগের অন্যতম আলোচিত বিষয়—-“কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে মানুষ কী হেরে যাবে তবে?”— ছিল সেমিনারের মূল আলোচ্য বিষয়। এই অত্যন্ত সময়োপযোগী বিষয়ে সাবলীল ও গভীর আলোকপাত করেন বিশিষ্ট লেখক তথা শিক্ষক সৈকত ঘোষ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) কীভাবে মানবজীবনকে প্রভাবিত করছে এবং মানুষের সৃজনশীলতাকে তা কখনই প্রতিস্থাপন করতে পারবে না, সে বিষয়ে তিনি চমৎকার তথ্য তুলে ধরেন।
এছাড়াও, স্বামী বিবেকানন্দের ১৮৯৩ সালের শিকাগো বক্তৃতার ঐতিহাসিক পটভূমি ও আধুনিক বিজ্ঞানচেতনার সঙ্গে তার সংযোগ নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যন্ত ধারালো ও মনোগ্রাহী বক্তব্য রাখেন বগুলা ভবানীপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সত্যব্রত ভট্টাচার্য।

অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত ভাষণ দেন বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা কুমকুম ভট্টাচার্য। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, “আজ আমাদের বিদ্যালয়ের জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের দিন। আশা করি এই ছোট ছোট উদ্যোগগুলো আমাদের ছাত্রছাত্রীদের মন থেকে ভীতি দূর করে বিজ্ঞান মনস্কতার আলো সুদূরপ্রসারী করবে।”
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে সশরীরে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানকে সমৃদ্ধ করেন রানাঘাট উত্তর-পূর্ব বিধানসভার মাননীয় বিধায়ক শ্রীঅসীম বিশ্বাস মহাশয়। তিনি তাঁর সংক্ষিপ্ত ও অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্যে বলেন, আগামী দিনে এই এলাকার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিজ্ঞান চেতনার প্রসার ঘটাতে ভবানীপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের এই আয়োজন এক উল্লেখযোগ্য ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
বৃহৎ পরিসরের অনুষ্ঠানকে এত সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে রূপদান করার পেছনে ছিল বিদ্যালয়ের একদল নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের নিরলস পরিশ্রম। মূলত বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রদীপকুমার বিশ্বাস, অসিত সিকদার, দিব্যেন্দু ভট্টাচার্য, মৌমিতা মণ্ডল এবং বিশ্বজিৎ বিশ্বাস প্রমূখের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ও পরিচালনায় এই বিজ্ঞান প্রদর্শনী এবং সেমিনার সম্পূর্ণ সফল রূপ নেয়। মহোৎসবে বগুলা অঞ্চলের একাধিক বিশিষ্ট বিজ্ঞান ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি, আমন্ত্রিত বিভিন্ন স্কুলের প্রধান শিক্ষক-শিক্ষিকা, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ এবং এলাকার গণ্যমান্য গুণীজনদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানটির গরিমা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
বিজ্ঞানের এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সমগ্র হাঁসখালি ব্লক এবং বগুলা অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ করা যায়। খুদে বিজ্ঞানীদের চোখে-মুখে ছিল নতুন কিছু শেখার আগ্রহ আর আগামী দিনে আরও বড় কিছু করার জেদ। আয়োজকদের মতে, পাঠ্যপুস্তকের গণ্ডির বাইরে বেরিয়ে ব্যবহারিক জ্ঞানচর্চার এই ধারা আগামী দিনেও অব্যাহত থাকবে এবং এই ধরনের উদ্যোগই আগামী দিনে দেশ গঠনে এক এক জন প্রকৃত বিজ্ঞানী বা গবেষক তৈরি করতে সাহায্য করবে।
বিদ্যালয়ের এই সফল বিজ্ঞান প্রদর্শনী ও সেমিনার শেষ পর্যন্ত এক উৎসবের রূপ নেয়, যা শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক— সকলের হৃদয়েই এক গভীর রেখাপাত করে গেছে।

