কার্ল মার্কস এক জায়গায় লিখেছিলেন, মানুষ নিজের ইতিহাস নিজেই তৈরি করে, কিন্তু নিজের পছন্দমতো পরিস্থিতিতে নয়। সাহিত্যিকের ক্ষেত্রেও এই ঐতিহাসিক সত্যটি গভীরভাবে প্রযোজ্য। তিনি কলম ধরেন স্বাধীন মানুষ হিসেবে, চেতনার মুক্তিকে সম্বল করে; কিন্তু কাল, রাষ্ট্র ও ক্ষমতার সমীকরণ তাঁকে প্রায়ই এমন এক মঞ্চের সামনে এনে দাঁড় করায়, যেখানে তাঁর শিল্প নয়, তাঁর রাজনৈতিক ব্যবহারযোগ্যতাই মুখ্য হয়ে ওঠে। সম্প্রতি কলকাতায় তসলিমা নাসরিনকে ঘিরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে কবি জয় গোস্বামীর উপস্থিতি ও লাঞ্ছিত হয়ে মঞ্চ ছাড়ার ঘটনাটি কেবল একটি সাময়িক খবর নয়; এটি সমকালীন বাংলার সাহিত্য, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং রাষ্ট্র-ক্ষমতার সম্পর্কের গভীর সংকটকে উন্মোচিত করেছে।
এই ঘটনাপ্রবাহের প্রথম সত্যটি হলো—জয় গোস্বামীর সেই মঞ্চে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল এক গুরুতর রাজনৈতিক ও নৈতিক পদস্খলন। গ্রীক ট্র্যাজেডির ভাষায় একে বলা হয় হ্যামারশিয়া (Hamartia)—নায়কের এমন এক সিদ্ধান্তগত ত্রুটি, যা শেষ পর্যন্ত তাঁর পতনের পথ তৈরি করে। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অলিন্দে অবস্থান করার পর একজন কবি যখন তীব্র রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন মেরুর পরিসরে প্রবেশ করতে যান, তখন তাঁর বোঝা উচিত ছিল, সেখানে তাঁর কবিতার চেয়ে তাঁর উপস্থিতির রাজনৈতিক অর্থই শাসক ও বিরোধী—উভয় শিবিরের কাছে প্রাধান্য পাবে।
কিন্তু এই ট্র্যাজেডির গভীরে রয়েছে আরও এক নির্মম বৈপরীত্য। জয় গোস্বামী যেন বহু আগেই নিজের পরিণতির রূপরেখা নিজেই লিখে রেখেছিলেন—
একদিন গায়ে হাত তুলেছিলাম
একদিন পা তুলেছিলাম
একদিন জিভ ভেঙিয়েছিলাম
একদিন সাবান মেখেছিলাম
একদিন সাবান মাখিয়েছিলাম যদি
বিশ্বাস না হয় তো জিগ্যেস করুন আমার মৃত্যুকে।
বাংলা সাহিত্যে এমন উদাহরণ বিরল, যেখানে কোনো কবির লেখা কবিতা তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক যাত্রাপথের এত তীব্র প্রতীক হয়ে উঠবে। প্রথম তিন পঙ্ক্তি মনে করিয়ে দেয় সেই প্রতিবাদী কবিকে—যিনি একসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তুলেছিলেন, ক্ষমতার মুখোমুখি হতে দ্বিধা করেননি। কিন্তু পরবর্তী পঙ্ক্তিগুলিতে যেন অন্য এক ইতিহাসের যাত্রা শুরু । ক্ষমতার সান্নিধ্যে দীর্ঘ অবস্থান, প্রতিবাদের ধার ক্রমশ ভোঁতা হয়ে যাওয়া, এবং শেষ পর্যন্ত শাসকের অনুকূল্য অর্জন—এই সমগ্র পরিবর্তনকে আজ তাঁর নিজের কবিতাই নতুন অর্থে পড়তে বাধ্য করে।

কবিতা কখনও কখনও লেখকের বর্তমান জীবনকে অতিক্রম করে এক ভবিষ্যদ্বাণী হয়ে ওঠে। তাই জয় গোস্বামীরই অন্য পঙ্ক্তিগুলি আজ আরও বেশি রাজনৈতিক রূপক হয়ে আমাদের সামনে আসে যেখানে তিনি লিখছেন
একদিন কা কা করে ডেকে বেরিয়েছিলাম সারাবেলা
একদিন তাড়া করেছিলাম স্বয়ং কাকতাড়ুয়াকেই…
একজনের কোলে আর আমার বাকি শরীরটা তখন
কিনে নিয়েছিল অন্য কেউ—কে তা আমি এখনো জানি না…
পরিবর্তনের ডাক দিতে দিতে শেষ পর্যন্ত কবি এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছালেন, যেখানে তাঁর স্বাধীন কণ্ঠস্বরের চেয়ে ক্ষমতার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠার ব্যাকুলতাই প্রকট হয়ে উঠল। এতদিন যে শাসনের সান্নিধ্যে তিনি স্বচ্ছন্দ ছিলেন, রাজনৈতিক হাওয়ার পরিবর্তনে তিনি হয়তো নতুন কোনো দরবারের দিকেও হাত বাড়াতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রাজনীতি কখনোই সাহিত্যিককে তাঁর শিল্পের জন্য গ্রহণ করে না; সে তাঁকে ব্যবহারযোগ্য প্রতীক হিসেবেই দেখে।
তাই তসলিমার উপস্থিতিতে সেদিন মঞ্চে যা ঘটেছিল, তার পরিণাম ছিল অনিবার্য। সেখানে তাঁর কবিতা নয়, তাঁর উপস্থিতিই হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক মেরুকরণের হাতিয়ার। শেষ পর্যন্ত তাঁকে অপমানিত অবস্থায় মঞ্চ ছাড়তে হয়। ভলতেয়ারের বহুল চর্চিত নীতিটি এখানে স্মরণীয়—মতের বিরোধিতা সভ্য সমাজে যুক্তি ও সংলাপ দিয়ে হয়, হট্টগোল বা ভয় প্রদর্শন করে নয়। একজন কবির রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে তীব্র দ্বিমত থাকলেও, তাঁকে কথা বলতে না দেওয়া বা লাঞ্ছিত করা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরাজয়।তবে এই অপমানের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত ঐতিহাসিক বৈপরীত্য। গতকাল যারা জয় গোস্বামীকে অপমান করলেন, তারা অজান্তেই তাঁকে আরও বড় এক সংকট থেকে রক্ষা করে দিয়েছেন। কারণ ওই মঞ্চে যদি তাঁকে উচ্ছ্বসিত অভিনন্দনে বরণ করা হতো, তবে তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকার চিরতরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শিবিরের সস্তা প্রতীকে পরিণত হতো। অপমান কখনো কাম্য নয়; কিন্তু ইতিহাসে কখনো কখনো অপমানই মানুষকে নিজের দিকে ফিরে তাকানোর শেষ সুযোগ করে দেয়।

অন্যদিকে, তসলিমা নাসরিনকে ঘিরেও একই রকম দ্বৈত ও জটিল বাস্তবতা কাজ করে। ১৯৯৩ সালে ‘লজ্জা’ উপন্যাস প্রকাশের পর ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে তিনি যে সাহসিকতার সঙ্গে দাঁড়িয়েছিলেন, তা দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নির্বাসন, প্রাণনাশের হুমকি এবং দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যেও তিনি মৌলবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই সাহসের ঐতিহাসিক স্বীকৃতি অনস্বীকার্য।
কিন্তু একজন লেখকের মূল্যায়ন কখনোই একরৈখিক হতে পারে না। তাঁর আত্মজীবনী গুলিতে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও নিকটজনদের অন্তরঙ্গ জীবনকে যেভাবে উন্মোচিত করা হয়েছে, তা নিয়ে সাহিত্য সমাজে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে। সত্য বলার অধিকার এবং ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম নৈতিক সীমারেখা থাকে। সাম্প্রতিক ঘটনাতেও সেই দ্বৈততা স্পষ্ট। যে মঞ্চে তাঁর পাশে দাঁড়ানো এক প্রবীণ কবি কে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত হতে হলো, সেখানে তসলিমার তাৎক্ষণিক নীরবতা ও পরবর্তী আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া অনেককেই হতাশ করেছে। মুক্তচিন্তার পক্ষে আজীবন লড়া এক লেখকের কাছ থেকে মানবিক সংবেদনের আরও স্পষ্ট অবস্থান প্রত্যাশিত ছিল।
২০০৭ সালে ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির চাপে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার তসলিমা নাসরিনকে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য করেছিল। কিন্তু ভারতে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চূড়ান্ত ক্ষমতা সবসময়ই কেন্দ্রীয় সরকারের হাতেই থাকে। অর্থাৎ রাজ্য ও কেন্দ্র—উভয় স্তরের রাজনীতিই ভিন্ন ভিন্ন সময়ে তাঁকে নিজেদের রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করেছে। মিশেল ফুকো দেখিয়েছিলেন, ক্ষমতা কেবল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে না; সে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতীকও নির্মাণ করে। কখনও সেই প্রতীক প্রতিবাদের, কখনও জাতীয়তাবাদের, আবার কখনও বা সাংস্কৃতিক মেরুকরণের। রাষ্ট্র যখন কোনো লেখককে প্রতীকে পরিণত করে, তখন তাঁর সাহিত্য নয়, তাঁর রাজনৈতিক ব্যবহারযোগ্যতাই প্রধান হয়ে ওঠে।
এই কারণেই জয় গোস্বামী বা তসলিমা নাসরিনের এই পরিণতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং বুদ্ধিজীবী সমাজের মধ্যকার এক চিরন্তন ও নির্মম সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি। এখানে সরকার বদলায়, ব্যক্তিমুখ বদলায়, কিন্তু সাহিত্যিককে দরবারি প্রতীকে রূপান্তর করার রাজনৈতিক কৌশল বদলায় না।
জয় গোস্বামীকে নিয়ে তাই আজ গভীর আত্ম সমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে তাঁর সাহিত্যিক অবদান প্রশ্নাতীত। কিন্তু বিগত দেড় দশকে ক্ষমতার অলিন্দে তাঁর অবিরত উপস্থিতি বহু পাঠকের মনে ক্ষোভ ও অস্বস্তি তৈরি করেছে। জঁ-পল সার্ত্র লিখেছিলেন, লেখক তাঁর সময়ের কাছে দায়বদ্ধ, কিন্তু ক্ষমতার মুখপাত্র নন। ভাক্লাভ হাভেল তাঁর Living in Truth-এ মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, ব্যবস্থার মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে লেখকের সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ হলো সত্যকে আঁকড়ে ধরে রাখা এবং ক্ষমতার সুবিধা থেকে দূরত্ব বজায় রাখা। তাই বলা যায়, ক্ষমতা যখন নিজের নৈতিক বৈধতা হারাতে শুরু করে, তখন সে বুদ্ধিজীবীদের ব্যবহার করে নিজের বৈধতার মুখোশ তৈরি করতে চায়।
আজকের বাংলায়ও যেন সেই দৃশ্যই বারবার ফিরে আসছে। ক্ষমতার রঙ বদলায়, কিন্তু ক্ষমতার চারপাশে ঘোরাফেরা করা বুদ্ধিজীবীদের সংস্কৃতি বদলায় না। বদলে যায় কেবল আনুগত্যের ভাষা। আন্তোনিও গ্রামশির ‘অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল’ এর বদলে আমরা ক্রমশ একশ্রেণীর ‘দরবারি বুদ্ধিজীবী’-র বিস্তারই প্রত্যক্ষ করছি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেখানে চেয়েছিলেন—”চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির”, সেখানে আজ ক্ষমতার দ্বারে কড়া নেড়ে কবিরা কেন নিজেদের শির নত করছেন? সক্রেটিস বলেছিলেন, “The unexamined life is not worth living.” নিজের জীবন ও সিদ্ধান্তকে পুনর্বিবেচনার সময় হয়তো এখনই।
রাজনীতি সাহিত্যকে ভালোবাসে না; সে কেবল সাহিত্যকে ব্যবহার করতে জানে। এক সময় রাজনৈতিক সমীকরণে তসলিমা নাসরিনকে রাজ্য থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, আজ অন্য এক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাকে আবার বাংলায় নিয়ে আসা হল এবং তাঁকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হলো। জয় গোস্বামীও বুঝতে পারলেন, ক্ষমতার দরবারে সাহিত্যিকের সম্মান চিরস্থায়ী নয়; সেখানে একমাত্র নীতি হলো দলীয় প্রয়োজন। রাষ্ট্র প্রথমে লেখককে প্রতীক বানায়, তারপর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।
সাহিত্যের আসল বিচার কিন্তু রাজনীতির মঞ্চে হয় না। সেখানে লেখকের মূল্য নির্ধারিত হয় তাঁর নৈতিক স্বাধীনতায়, সত্য বলার সাহসে এবং ক্ষমতার থেকে বজায় রাখার দূরত্বে। যে দিন কোনো সাহিত্যিক ক্ষমতার অলিন্দকে নিজের স্থায়ী ঠিকানা বানিয়ে ফেলেন, সে দিন তাঁর কলমও স্বাধীনতা হারায়। আর যে লেখক একদিন নিজেরই বহু পুরোনো রচনার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বর্তমানকে চিনতে পারেন না, তাঁর ট্র্যাজেডির একমাত্র সাক্ষী হয়ে থাকে রাষ্ট্র নয়—থাকে তাঁর নিজের লেখা কবিতা।তাই আজও জয় গোস্বামীর সেই পঙ্ক্তিটি নতুন এবং এক ভয়াবহ অর্থে ফিরে আসে—
“যদি বিশ্বাস না হয় তো জিগ্যেস করুন আমার মৃত্যুকে।”
এই মৃত্যু কোনো কবির শারীরিক মৃত্যু নয়, এমনকি তাঁর কবিতারও বিলোপ নয়। এটি সেই স্বাধীন সাহিত্যিক সত্তার নৈতিক মৃত্যু, যে একদিন ক্ষমতার খুব কাছাকাছি গিয়ে বুঝতে পারে—রাষ্ট্রের দরবারে কবির প্রয়োজন সাময়িক ও ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সাহিত্যের আদালতে তাঁর নৈতিক বিচার চিরন্তন।

