বিহারে সবচেয়ে নিরাপদ বাঁকিপুর এবং মধ্যপ্রদেশের দাতিয়া আসনে বিজেপির লজ্জাজনক হার নিয়ে ইতিমধ্যেই জাতীয় রাজনীতিতে চর্চা শুরু হয়েছে। মাত্র দুটি উপনির্বাচনের জয় দিয়ে কোনওভাবেই জাতীয় স্তরের ভোটাভুটির অঙ্ক কষে ফেলা সম্ভব নয়। তবে এই ফলাফল থেকে এটুকু বলা যেতে পারে যে যেকোনও রাজনৈতিক দলেরই একাধিপত্যকে নিশ্চিত এবং একমাত্র ধরে নেওয়া গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য নয়। সবচেয়ে নিরাপদ আসনেও বিজেপির এই হার বেশ কয়েকটি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। শাসকবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সিই কি এই হারের প্রধান কারণ? নাকি অন্যকিছু তা নিয়েও চলছে আলোচনা-জল্পনা তর্কাতর্কি।
তিনটি উপনির্বাচনে-দুটিতে বিজেপির পরাজয়
ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ECI) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বিহারের বাঁকিপুর বিধানসভা উপনির্বাচনে জন সুরাজ পার্টির প্রার্থী প্রশান্ত কিশোর বিজেপি প্রার্থী নীরজ কুমার সিনহাকে ১৯,৩২৪ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। অন্যদিকে মধ্যপ্রদেশের দাতিয়া কেন্দ্রে জয়ী হয়েছেন কংগ্রেসের ঘনশ্যাম সিং। বিজেপির আশুতোষ তিওয়ারিকে ৬ হাজারেরও বেশি ভোটে হারিয়েছেন তিনি।

নিরাপদ আসনে এই হার বিজেপির কাছে শুধুই অস্বস্তির নাকি আগামীর নির্বাচনী লড়াইগুলিতেও এর প্রভাব থাকতে পারে?
শহুরে শিক্ষিত ভোটারদের প্রত্যাখ্যান:
বিহারের বাঁকিপুর বিধানসভা নিয়ে সবচেয়ে আলোচনার কারণ হল এই আসনে বিজেপির একাধিপত্য। উচ্চবর্ণের হিন্দু অধ্যুষিত এই কেন্দ্র বিজেপির সবচেয়ে নিরাপদ আসনগুলির একটি হিসেবে বিবেচিত হতো। ১৯৯৫ সাল থেকে এই কেন্দ্র বিজেপি নিজের দখলে রেখেছিল। বিজেপির জাতীয় সভাপতি নীতিন নবীন এবং তাঁর পরিবারের দাপটের কথা ভেবে এই আসনকে বিজেপি সহজভাবে নিয়েছিল। কিন্তু এই আসনেই রাজনীতিতে একেবারে নবীশ প্রশান্ত কিশোরের কাছে হারতে হল বিজেপি প্রার্থীকে। এই ফলাফল থেকে একথা প্রমাণ হয় যে জনঅসন্তোষ যখন সুসংগঠিতভাবে ভোটবাক্সে পড়ে, তখন দলের সবচেয়ে শক্ত ঘাঁটিও আর নিরাপদ থাকে না। শহুরে এই অঞ্চলে শিক্ষিত ভোটারদের আধিপত্যও রয়েছে। তাই এক্ষেত্রে ধর্মীয় সেন্টিমেন্টও যে বিশেষ কাজ করেনি তাও লক্ষ্যণীয়।

সরকার বিরোধী আন্দোলনের জের:
ওয়াকিবহাল মহলের একাংশ মনে করছেন এই ফলাফলের পিছনে অন্যতম কারণ দিল্লিতে এক মাস ব্যাপী লাগাতার সরকার বিরোধী আন্দোলন। দিল্লিতে যুব আন্দোলনের জেরে মোদি সরকারের যে রাজনৈতিক ক্ষতি শুরু হয়েছিল, তা আর শুধু রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ নেই; তার প্রভাব এখন নির্বাচনী রাজনীতির মাটিতেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
গত কয়েক বছর ধরে নরেন্দ্র মোদির যে ইমেজ তৈরি করা হয়েছিল তা ধীরে ধীরে দুর্বল হচ্ছে। নতুন প্রজন্মের কাছে মোদি আর অপ্রতিদ্বন্দ্বী, তীব্র শক্তিশালী জননেতা নন। বিজেপির নির্বাচনী কৌশলের কেন্দ্রে যেহেতু মোদির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাই সবচেয়ে বড় সম্পদ, তাই তাঁর জনপ্রিয়তায় সামান্য ক্ষয়ও দলের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

বিজেপির বিকল্প খুঁজতে একজোট:
এই দুই কেন্দ্রের ফলাফল এই ইঙ্গিতও দিচ্ছে যে ভোটাররা ক্রমশ সেই প্রার্থীর পক্ষেই একজোট হচ্ছেন, যাঁর বিজেপিকে হারানোর সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন দলের আদর্শগত অবস্থান সরিয়ে রেখে বিজেপিকে পরাজিত করার লক্ষ্যে একজোট হয়েছেন তাঁরা।
যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে একাধিক বিরোধী প্রার্থী দাঁড় করিয়ে বিজেপি-বিরোধী ভোট ভাগ করার কৌশল আগের মতো কার্যকর নাও হতে পারে। আম আদমি পার্টি (আপ) বা তৃণমূল কংগ্রেসের মতো দলগুলিকে পরোক্ষভাবে শক্তিশালী করে কংগ্রেসের ভোটে বিভাজন ঘটানোর যে রাজনৈতিক কৌশলের কথা প্রায়ই আলোচিত হয়, সেটিও ভবিষ্যতে ততটা ফলপ্রসূ নাও হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো দেশে ডানপন্থী ও কট্টর-ডানপন্থী শক্তির বিরুদ্ধে এভাবেই একজোট হয়েছিল জনগণ।

বেকারত্ব-শিক্ষা সংকট:
উল্লেখযোগ্যভাবে লক্ষ্যণীয় দিল্লির ছাত্র আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল বিহারেও। চলমান নিট আন্দোলনকে সংহতি জানিয়ে একজোট হয়েছিল বিহারের ছাত্র-যুবরা। সাক্ষরতার হারের দিক দিয়ে বিচার করলে বিহার এখনও নিচের দিকে থাকা রাজ্যগুলির মধ্যে অন্যতম। হিসেব বলছে বহু সরকারি স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত (PTR) জাতীয় মানদণ্ডের চেয়ে খারাপ। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে রাজ্যের একাধিক বড় পরীক্ষা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। BPSC Teacher Recruitment Exam – এ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, NEET-UG 2024 প্রশ্নপত্র ফাঁসের তদন্তে বিহারের একাধিক কেন্দ্রের নাম উঠে এসেছে।
অর্থাৎ বেকারত্ব, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট এবং ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের নির্মম লাঠিচার্জ নিয়ে মানুষের ক্ষোভ এখন আরও বড় আকার নিয়েছে, এবং সেই ক্ষোভের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে বিজেপি ও মোদি সরকার। জাতীয় আন্দোলনের সাহারা পেয়ে নিজেদের সমস্যা নিয়েও মানুষের চোখ কান খুলতে শুরু করেছে।

মেইনস্ট্রিম সংবাদ মাধ্যম অনাস্থা এবং বিকল্পের খোঁজ:
ধীরে ধীরে টেলিভিশন এবং খবরের কাগজের বিকল্প হিসেবে জনগনের হাতে এখন মুঠোফোনের রমরমা। যখন কোনও নেতা অত্যন্ত শক্তিশালী বলে বিবেচিত হন, তখন একাংশের সংবাদমাধ্যম তুলনামূলকভাবে সতর্ক অবস্থান নেয়। কিন্তু সেই রাজনৈতিক প্রভাব কমতে শুরু করলে সমালোচনা করা সহজ হয়ে ওঠে।তুলনামূলকভাবে সংযত থাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও আরও স্বাধীনভাবে ভূমিকা নিতে শুরু করে।
একাধিক সংবাদমাধ্যম সরকারের হয়ে একপেশে খবর পরিবেশন করলেও সোশ্যাল মিডিয়ার মতো প্যাটফর্মে বিরুদ্ধতা বাড়ছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। সরকারের বিজ্ঞাপন প্রাপ্ত সংবাদ মাধ্যম অনেক ক্ষেত্রেই চাইলেও নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখতে পারে না। অথবা বিরোধী ইস্যুগুলিকে ঢেকে খবর করার প্রবণতা তৈরি হয়। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সেই বাইনারি ভাঙছে। আগে যা মানুষের দৃষ্টির অগোচরেই থেকে যেত তা ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে।

তবে আলোচনার শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে দুটো উপনির্বাচনের হার দিয়ে কখনোই জাতীয় রাজনীতির সমীকরণ বুঝে ফেলা সম্ভব নয়। এর আগেও একাধিক উপনির্বাচনে হেরে বড় ভোটে বাজিমাত করেছে বিজেপি। রাজনীতিতে কখন কী হবে তা ঠাওর করা কঠিন। তবুও বলা যায় এই উপনির্বাচনকে কেবল একটি স্থানীয় নির্বাচনী ‘অঘটন’ হিসেবে ধরলে ভুল হবে, বিজেপির একচেটিয়া জয়ের বাজারে এই ফলাফল ভবিষ্যতের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবেও বিবেচনা করা দরকার।

