‘আমরা কোথাও ,আমরা কোথাও , আমরা কোথাও হার মানিনি’
ফুটবল বরাবরই বিস্ময়ের জন্ম দেয়, আর বিশ্বকাপ জন্ম দেয় ইতিহাসের। এমনই এক বিস্ময়কর ইতিহাসের জন্ম হল এবারের মায়াবী সবুজ বিশ্বকাপের মাঠে। ভারতের যেকোনও ছোট শহরের থেকেও কম জনসংখ্যার একটি দেশ, সুবিশাল পৃথিবীর গ্লোবে একটি ডট, কেপ ভার্দে। বিশ্বকাপের মাঠে এক্কেবারে নবীশ। অথচ তারাই বিশ্বজয়ী আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ হয়ে বুঝিয়ে দিল ছোট মানেই দুর্বল নয়, নতুন মানেই অনভিজ্ঞ নয়, হেরে যাওয়া মানেই ছেড়ে দেওয়া নয়। মানুষ জয়ীদের কথা মনে রাখে, আর মনে রাখে তাঁদের কথা যারা হেরে যাওয়ার আগে হার মেনে নেয় না। বিশ্বমঞ্চে এমনই একটি স্ফুলিঙ্গ কেপ। শেষ বাঁশি বাজা অবধি যাঁরা লড়াই করে গেল বিশ্বজয়ীদের চোখে চোখ রেখে।
মায়ামির সবুজ মাঠে তখন চারিদিকে মেসি-মেসি ধ্বনি। গ্যালারির রঙ নীল-সাদা। কিন্তু দেশের জার্সি গায়ে তারাও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠে এসেছে নকআউট পর্বে। স্কোরবোর্ডে শেষমেশ হেরে গিয়েছে কেপ ভার্দে। এবারের মতো বিশ্বকাপে তাঁদের নটে গাছ তো মুড়োল, কিন্তু গল্প ফুরোল না, বরং সবে শুরু হল।
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ থেকে নিজেদের জাত চিনিয়ে আসছে এই দেশ। শতাব্দী প্রাচীন ফুটবলের ইতিহাস নেই, বিশ্বমানের পরিকাঠামো নেই, নেই অভিজ্ঞতাও। তবুও স্পেন, উরুগুয়ের মতো দেশকে রুখে আর্জেন্টিনার সঙ্গে নকআউট ম্যাচ। তাঁদের প্রতিপক্ষ, মার্টিনেজ, ফার্নান্দেজ।
যাঁদের টিমে রয়েছে এমনই এক ম্যাজিশিয়ান যিনি নিজেও নিজেকে প্রেডিক্ট করতে পারেন না। লিওনেল মেসি, বিশ্বের প্রথম এবং একমাত্র ফুটবলার যে দুটি বিশ্বকাপে ৭টি গোল করেছেন, বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোলের সংখ্যা ২০, বিশ্বকাপে টানা ৮ ম্যাচে গোল করে যাওয়া প্রথম খেলোয়াড়। এসবই জানতেন কেপের চল্লিশ বছর বয়সি গোলকিপার ভোজিনহা। তাই-ই তাঁকে যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল বিশ্বের সর্বকালের সেরা ফুটবলার মেসির বিরুদ্ধে খেলতে নামছেন, কেমন লাগছে? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন আর পাঁচ জন সাধারণ ফুটবল সমর্থকের মতোই। বলেছিলেন ‘মেসির বিরুদ্ধে খেলতে পারাটাই আমাদের কাছে গর্বের, এমন ফুটবলারের বিরুদ্ধে মাঠে নামার সুযোগ জীবনে একবারই আসে’ ।
রেফারি বাঁশি বাজাতেই সেই প্রবল পরাক্রমশালী বিশ্বজয়ী টিমের সঙ্গে খেলতে নামল ১১ জনের সম্মিলিত ঐক্যবদ্ধ এক জেদ। তারা ভুলে গেল দেশের আয়তন, জনসংখ্যা কিংবা ইতিহাস। প্রথম ২৯ মিনিটের মাথায় গোলের খাতা খুলে দিল লিও মেসি। আর তারপরেই আরও জেদি হল কেপ। মেসির একেরপর এক গোল থামালেন ভোজিনহা। এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে মিথ্যে করে গোল করলেন দুয়ার্তে। তখন স্কোরবোর্ডে বিশ্বসেরাদের সমান সমান এই ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি।
৯০ মিনিটে এই ম্যাচের ফল নিশ্চিত সম্ভব হল না। অতিরিক্ত সময়ের ঘড়ি চলতে শুরু করতেই, মার্টিনেজের গোলে ফের এগিয়ে গেল আর্জেন্টিনা। মনে হল শেষ। কিন্তু নিভে যাওয়ার আগে যেমন প্রদীপ একবার দপ করে জ্বলে ওঠে, তেমনই জ্বলে উঠল কেপ ভার্দের সিডনি। পুরো নাম সিডনি লোপেজ ক্যাব্রাল। স্কোরবোর্ডে ২-২। এবার কি টাইব্রেকার? স্নায়ুর চাপে ফুটছে গ্যালারি। ফলাফল কি হবে? শেষ দেখে ছাড়লেন ক্রিস্টিয়ানো রোমেরো। মেসির মাপা কর্ণারে হেড দিয়ে বল বাঁধালেন জালে। স্কোরবোর্ডে ৩-২।
স্কোরবোর্ডের হিসেবে হেরে গেল ভোজিনহারা, দুয়ার্তেরা। তবে হেরে যেতে যেতে, ছেড়ে যেতে যেতে জিতে নিল গোটা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়। মানুষের মনে মাথায় গেঁথে দিল বিন্দুর মতো ছোট্ট তাঁদের দেশের নাম, কেপ ভার্দে। আর্জেন্টিনা জায়গা করে নিল সেরা ১৬-এ ,আর কেপ ইতিহাসে।

