ভারতের গ্রিন ইকোনমিতে রূপান্তর কি পরিবেশ রক্ষা? নাকি বৈশ্বিক বানিজ্যে অর্থনৈতিক লড়াই?

১৭ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের নামে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে বিশ্ব এগিয়েছে, তার পরিবেশগত মূল্য এখন স্পষ্ট। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, বন উজাড়, বায়ুদূষণ এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বরং বর্তমানের বাস্তবতা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের বহু মানুষ ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারাচ্ছেন। অন্যদিকে দিল্লি, কলকাতাসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক বড় শহরে বায়ুদূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। এসব বাস্তবতা দেখিয়ে দিচ্ছে, প্রচলিত উন্নয়ন মডেল দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।

এই প্রেক্ষাপটে গ্রিন ইকোনোমি বা ‘সবুজ অর্থনীতি’ এখন আর কেবল পরিবেশবাদীদের আলোচনার বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শুধু জিডিপি দিয়ে উন্নয়ন পরিমাপের ধারণা থেকে সরে এসে প্রাকৃতিক সম্পদ, পরিবেশগত স্থিতিশীলতা এবং মানুষের জীবনমানকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। ভারতও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই পথেই হাঁটছে। তবে প্রশ্ন হল, এই পরিবর্তনের পেছনে পরিবেশগত দায়বদ্ধতা যতটা কাজ করছে, তার চেয়ে বেশি কি কাজ করছে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও ভূরাজনীতির বাস্তবতা?

প্রতীকী চিত্র

২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সেই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বিশ্ববাজারে শুল্কনীতি, সরবরাহব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস এবং কার্বনভিত্তিক বাণিজ্য নীতির কারণে ভারত নতুন ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন দেশে কার্বন নিঃসরণের সঙ্গে আমদানি নীতির সম্পর্ক তৈরি হওয়ায় রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোকে উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। সেই বাস্তবতায় ভারতের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে পরিবেশ ও সবুজ শিল্পকে অর্থনৈতিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভারতের ইস্পাত, সিমেন্ট ও রাসায়নিক শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। একই সঙ্গে কার্বন ক্যাপচার, ইউটিলাইজেশন অ্যান্ড স্টোরেজ (CCUS) প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য প্রয়োজনীয় রেয়ার আর্থ খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করতে ওড়িশা, কেরালা ও তামিলনাড়ুসহ বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্প অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগও সেই বৃহত্তর অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ।

ভারতের নীতিনির্ধারকেরা এখন বুঝতে পারছেন, সবুজ অর্থনীতি শুধু সৌরবিদ্যুৎ বা বৈদ্যুতিক যানবাহনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কৃষিবনায়ন, জৈবভিত্তিক শিল্প, টেকসই নির্মাণ, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটনও ভবিষ্যতের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত হতে পারে। কাউন্সিল অন এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ওয়াটার (CEEW)-এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারত প্রায় ৪ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারের সবুজ বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে, যা কয়েক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশও একই ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। জার্মানি নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কেন্দ্র করে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। চীন বৈদ্যুতিক যানবাহন ও সৌরশক্তি শিল্পে বৈশ্বিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। ডেনমার্ক ও দক্ষিণ কোরিয়া তাদের শিল্পনীতিতে সবুজ প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। ভারতও এখন সেই ধারার অংশ হওয়ার চেষ্টা করছে। কার্বন ক্রেডিট বাজার, গ্রিন বন্ড এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ সেই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত।

একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত দক্ষতা তৈরির দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সবুজ হাইড্রোজেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরির উদ্যোগ বাড়ছে। অন্যদিকে পিএম সূর্য ঘর ও পিএম-কুসুম প্রকল্পের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার গ্রামীণ অর্থনীতিতেও বিস্তৃত হচ্ছে। শহরাঞ্চলে গণপরিবহন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নগর সবুজায়নও এখন উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠছে।

তবে এই পরিবর্তনের পেছনের বাস্তবতা বুঝতে হবে। পরিবেশ রক্ষা অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সবুজ রূপান্তর একই সঙ্গে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা, রপ্তানি সক্ষমতা এবং শিল্পের টিকে থাকার প্রশ্নও। কার্বন নিঃসরণ কমানো এখন শুধু পরিবেশগত দায়বদ্ধতার বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখারও শর্ত হয়ে উঠছে।

ভারতের সাম্প্রতিক নীতিগত পরিবর্তন তাই একটি বড় বাস্তবতাই সামনে আনে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই এবং অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা—দুটি বিষয় এখন আর আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। ভবিষ্যতের বিশ্ব অর্থনীতিতে যে দেশ সবুজ প্রযুক্তি, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও কম-কার্বন উৎপাদনে এগিয়ে থাকবে, তারাই বৈশ্বিক বাণিজ্যে শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে পারবে। ভারতের সবুজ রূপান্তর সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।

অন্যান্য প্রতিবেদন.