একসময় দিল্লির লাইফলাইন বলা হতো যমুনাকে (Yamuna)। ঐতিহ্যবাহী এই নদীর তীরেই মুঘলরা নির্মাণ করেছিল লালকেল্লা এবং শাহজাহানাবাদ (বর্তমান পুরনো দিল্লি) শহর। যমুনা ভারতের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী এবং গঙ্গার অন্যতম প্রধান উপনদী। প্রায় ১,৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ যমুনা নদীর উৎপত্তি উত্তরাখণ্ডের যমুনোত্রী হিমবাহ থেকে। সেখান থেকে হিমাচল প্রদেশ ও হরিয়ানা হয়ে দিল্লিতে প্রবেশ করে যমুনা। এরপর দিল্লির উপর দিয়ে উত্তরপ্রদেশে প্রবাহিত হয় এবং আরও দক্ষিণে প্রয়াগরাজে গঙ্গা ও পৌরাণিক সরস্বতী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়। এই পবিত্র মিলনস্থল ত্রিবেণী সঙ্গম নামে পরিচিত। হিন্দুদের কাছে এই স্থান অত্যন্ত পবিত্র।
কিন্তু আজ সেই যমুনাই দেশের সবচেয়ে দূষিত নদীগুলির মধ্যে অন্যতম হয়ে উঠেছে। দেশের মোট যমুনা নদীর দৈর্ঘ্যের মাত্র ২ শতাংশ রয়েছে দিল্লিতে, আর সেই ২২ কিলোমিটারই সবচেয়ে দূষিত। টানা তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন সরকার যমুনা নদীকে পরিষ্কার করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট এবং ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল (এনজিটি)-র কড়া নজরদারি থাকা সত্ত্বেও, দিল্লির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত যমুনার জলের মান এখনও স্নানের উপযোগী ন্যূনতম মানের কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারেনি।
দিল্লিতে প্রবেশের সময় পাল্লা এলাকায় যমুনার জল প্রায় স্বচ্ছ থাকে। কিন্তু ওয়াজিরাবাদ ব্যারাজের ঠিক নীচের দিকে প্রায় ১০ মিটার চওড়া নাজফগড় ড্রেন থেকে কালো, দুর্গন্ধযুক্ত দূষিত জল এসে যমুনার সঙ্গে মিশে যায়। এই ড্রেনের জল মেশার পর থেকেই যমুনার জলের মান মারাত্মক দূষিত হয়ে পড়ে।

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, নদীর উপর ঘন সাদা বিষাক্ত ফেনায় ভরে গিয়েছে যমুনা। যমুনা নদীতে নামলে দেখে মনে হবে, যেন কোনও মেঘের দেশে দাঁড়িয়ে আছেন আপনি। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। বাড়িঘর, হোটেল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে আসা নোংরা জলে প্রচুর ডিটারজেন্ট, সাবান ও শ্যাম্পুর রাসায়নিক থাকে। এগুলিতে থাকা সার্ফ্যাক্ট্যান্ট (Surfactants) ও ফসফেট জলে ফেনা তৈরির প্রধান কারণ। শুষ্ক মরসুমে যমুনার জলের পরিমাণ কমে যায়। ফলে দূষকগুলির ঘনত্ব বেড়ে যায় এবং ফেনা আরও বেশি তৈরি হয়।
এর ফলে, মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। মাছ, কচ্ছপসহ বহু জলজ প্রাণীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ জলও দূষিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। দুর্গন্ধ, বিষাক্ত ফেনা ও রোগজীবাণুর কারণে আশপাশের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। নদীর ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও পর্যটনমূল্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দিল্লিতে প্রবাহিত যমুনার জলে ফিকাল কোলিফর্ম (মানুষ ও পশুর মল থেকে আসা জীবাণু)-এর মাত্রা স্নানের উপযোগী জলের নির্ধারিত মানের তুলনায় প্রায় ৩২,০০০ গুণ বেশি ছিল। এর অর্থ, যমুনার জলকে শুধু স্নানের উপযোগী করতে হলেও দূষণের মাত্রা প্রায় ৯৯.৯৯ শতাংশ কমাতে হবে। অর্থাৎ, বর্তমান দূষণের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ যে নদীর জলকে ন্যূনতম নিরাপদ পর্যায়ে আনতেও বিশাল পরিসরে দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও শোধনের প্রয়োজন।

