প্রায় দুই দশক আগে ভারতীয় বায়ুসেনা যে যুদ্ধবিমান ঘাটতি পূরণের পরিকল্পনা করেছিল, আজও সেই একই প্রয়োজনের সামনে দাঁড়িয়ে ভারত। পার্থক্য শুধু একটাই। ২০০৭ সালে ১২৬টি যুদ্ধবিমান কেনার জন্য যে MMRCA প্রকল্প শুরু হয়েছিল, তার প্রায় দুই দশক পর এবার ১১৪টি Rafale যুদ্ধবিমান কেনার প্রস্তাব সামনে এসেছে। সম্ভাব্য খরচ প্রায় ৩.২৫ লক্ষ কোটি টাকা।
এ কারণেই প্রশ্ন উঠছে, একই ধরনের প্রয়োজন মেটাতে এত বছর পর ফের শুরু থেকে কেন পথ চলতে হচ্ছে? আর এই দীর্ঘ বিলম্বের প্রকৃত মূল্যই বা কত?
Dassault Aviation ইতিমধ্যেই প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের কাছে ১১৪টি Rafale-এর জন্য বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত প্রস্তাব জমা দিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০টি বিমান সরাসরি ফ্রান্স থেকে ‘ফ্লাই-অ্যাওয়ে’ অবস্থায় ভারতে আসতে পারে। বাকি ৯৪টি বিমান ভারতে উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় উপাদানের অংশ প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছনোর লক্ষ্যও রয়েছে।
কিন্তু এই MRFA প্রকল্প আসলে নতুন কোনও গল্প নয়। এর শিকড় সেই MMRCA প্রকল্পে, যার সূচনা হয়েছিল ২০০৭ সালে।
তখন ভারতীয় বায়ুসেনা ১২৬টি Medium Multi-Role Combat Aircraft কেনার জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র ডাকে। দীর্ঘ এবং কঠোর মূল্যায়নের পর ২০১১-১২ সালে Dassault Rafale-কে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। প্রতিযোগিতায় ছিল Eurofighter Typhoon, মার্কিন F-16 ও F/A-18, সুইডেনের Gripen এবং রাশিয়ার MiG-35।
পরিকল্পনাটি ছিল উচ্চাভিলাষী। প্রথম ১৮টি বিমান সরাসরি বিদেশ থেকে আসার কথা থাকলেও বাকি ১০৮টি ভারতে Hindustan Aeronautics Limited (HAL)-এর মাধ্যমে তৈরি হওয়ার কথা ছিল। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল প্রযুক্তি হস্তান্তর, দেশীয় উৎপাদন এবং ভারতের বিমান নির্মাণ শিল্পকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য।
অর্থাৎ, MMRCA শুধু ১২৬টি যুদ্ধবিমান কেনার প্রকল্প ছিল না। এর মাধ্যমে ভারত উন্নত বিমান নির্মাণে দক্ষতা, প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং একটি শক্তিশালী দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলতে চেয়েছিল।
কিন্তু উৎপাদনের দায়িত্ব, মূল্য, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং HAL-এর তৈরি বিমানের দায়বদ্ধতা নিয়ে আলোচনা ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ২০১৬ সালে ভারত ফ্রান্সের সঙ্গে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকার চুক্তিতে মাত্র ৩৬টি Rafale সরাসরি কেনে।
এই ৩৬টি বিমান ভারতীয় বায়ুসেনার সক্ষমতা নিঃসন্দেহে বাড়িয়েছে। কিন্তু IAF-এর দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিমান ঘাটতি মেটাতে তা যথেষ্ট ছিল না। বর্তমানে অনুমোদিত ৪২টি ফাইটার স্কোয়াড্রনের তুলনায় বায়ুসেনার কার্যকর স্কোয়াড্রনের সংখ্যা প্রায় ২৯-এর কাছাকাছি বলে বিভিন্ন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর মধ্যে দিয়ে কেটে গেছে প্রায় দুই দশক। আর এই সময়ে ভারতের কৌশলগত পরিবেশও বদলে গেছে।
চিন দ্রুত তার বিমানবাহিনী আধুনিক করেছে। উন্নত চতুর্থ ও পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান যুক্ত করার পাশাপাশি তিব্বত অঞ্চলে বিমানঘাঁটি ও সামরিক পরিকাঠামো বাড়িয়েছে বেইজিং। একই সময়ে পাকিস্তানও চিনের সহযোগিতায় JF-17-এর মতো যুদ্ধবিমান এবং উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও সেন্সর প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে।
তাই MMRCA-র দীর্ঘসূত্রিতার মূল্য শুধু অর্থে মাপা যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারতের সামরিক প্রস্তুতি এবং কৌশলগত সক্ষমতার প্রশ্নও।
আরও বড় ক্ষতি হতে পারে শিল্পক্ষেত্রে। MMRCA পরিকল্পনা অনুযায়ী ১০৮টি যুদ্ধবিমান ভারতে তৈরি হলে দেশীয় শিল্প উন্নত বিমান নির্মাণ, সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ-শৃঙ্খলে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারত। সেই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে ভারতের নিজস্ব Advanced Medium Combat Aircraft (AMCA) প্রকল্পেও কাজে লাগতে পারত। আজ MRFA-র মাধ্যমে ভারতকে আবার সেই উৎপাদনভিত্তি তৈরির চেষ্টা করতে হচ্ছে। অর্থাৎ, যে যাত্রা প্রায় ২০ বছর আগে শুরু হতে পারত, সেটিই এখন অনেক বেশি খরচে নতুন করে শুরু করার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এখানেই উঠে আসে সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি: এই দীর্ঘ বিলম্বের দায় নেবে কে?
প্রতিরক্ষা ক্রয়ে সিদ্ধান্তের দায় বহু স্তরে ভাগ হয়ে যায়। মন্ত্রক, সামরিক বাহিনী, আমলাতন্ত্র, প্রযুক্তিগত কমিটি এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে দায় ছড়িয়ে থাকায় শেষ পর্যন্ত কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের উপর সম্পূর্ণ জবাবদিহিতা স্থির করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু বিলম্বের আর্থিক ও কৌশলগত মূল্য শেষ পর্যন্ত বহন করে রাষ্ট্র এবং তার করদাতারা।
MMRCA থেকে MRFA-র এই দীর্ঘ যাত্রা তাই শুধু রাফালে কেনার গল্প নয়। এটি ভারতের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় সিদ্ধান্তহীনতা, দীর্ঘসূত্রিতা এবং শিল্পগত সুযোগ হারানোর গল্পও। প্রায় ২০ বছর আগে যে সক্ষমতা তৈরি করার সুযোগ ছিল, আজ ভারতকে তারই জন্য আবার বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
রাফালে কেনা যায়। প্রযুক্তি কেনা যায়। এমনকি হারানো সামরিক সক্ষমতাও কোনওভাবে পুনর্গঠন করা যায়।
কিন্তু একটি জিনিস কেনা যায় না হারিয়ে যাওয়া সময়।

