হে বঙ্গবালা, ত্রিশূল সরাও – লাগছে, বড় লাগছে!

১২৬ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সবে পেরিয়েছে। সংসদে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস ও বিরোধী – সবাই খুশি! পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক জয়ে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যেন ‘দুর্গা’। তৎকালীন বিরোধী দলনেতা , ভারতীয় জনসঙ্ঘের অটলবিহারী বাজপেয়ী তাঁকে ‘অভিনব দুর্গা’ সম্বোধন করেছিলেন। মহিলা প্রধানমন্ত্রী ‘দুর্গা’ হতে আপত্তি জানালেন। মাঝে অবশ্য বিতর্ক হয়েছিল বিস্তর। সিপিআই-সাংসদ এস এ দাঙ্গে আপত্তি জানান। বলেন, -“ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ সহ, ভারতের বেশ কিছু অঞ্চলের আদিবাসী সম্প্রদায় (অসুর জাতি) একজন বীর রাজা হিসেবে মহিষাসুরকে দেখেন। তারা মনে করেন, তাদের পূর্বপুরুষ বীর মহিষাসুরকে দেবী দুর্গা ছলনা করে হত্যা করেছেন। তাই দুর্গাপূজা তাদের কাছে শোক।” ইন্দিরা গান্ধী ভারতের অনার্য, দলিত, আদিবাসি, বহুজনের মান্যতা জানতেন। ফলে ‘দুর্গা’ সম্বোধন খারিজ করেন।

মুক্তিযুদ্ধ, জরুরি অবস্থা পার করে – ইন্দিরার হত্যার পর ১৯৮৪-র ভারত দেখেছিল রাজীব গান্ধির রেকর্ড জয়। পরের নির্বাচনে এলো অন্য সমীকরণ। দলিত ভারত সংসদে উপস্থিতি জানালো জোরালো ভাবে। এলো যুগযুগ ধরে পিছিয়ে থাকা মানুষের সংরক্ষণের দাবি – মণ্ডল কমিশন। সেবার ভোটের আগে উচ্চবর্ণের ভোটব্যাঙ্ক পেতে – অযোধ্যায় বিতর্কিত রামমন্দিরের তালা খুললেন রাজীব গান্ধী। অবশ্য তালা খোলার পক্ষে ফৈজাবাদ জেলা আদালতের রায় ছিল। সংশ্লিষ্ট মহল অবশ্য দাবি করে, – শাহবানু মামলার রায়ের পর সংখ্যালঘু তোষণের সমালোচনায় ভারসাম্য আনতে ‘হিন্দু কার্ড’ খেলেন রাজীব। না, ৮৯-এ ভিপি সিং এর পর প্রধানমন্ত্রী বদলানোর সময় – সেদিনের অটলবিহারী বাজপেয়ি ও লালকৃষ্ণ আদবানিরা – পাকাপকি হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক চিনতে ও নতুন সমীকরণ বুঝতে ভুল করেননি। ফলাফল,- মণ্ডল কমিশনের বিরুদ্ধে – তাদের ইস্যু –কমণ্ডলু। মানে, বাবরি ভেঙ্গে রামমন্দির। বাকি ইতিহাস সবার জানা।

ভারতে দলিত রাজনীতির উত্থান, ক্ষমতার সমীকরণে দলিতদের নেতৃত্ব, ক্ষমতা দখল দেখা গেছে এর পর থেকে। লালুপ্রসাদ যাদব, মুলায়ম সিং যাদব, রামবিলাস পাসোয়ান, শারদ যাদব, মায়াবতীরা – ৮৯-এ ভিপি সিংয়ের প্রধানমন্ত্রিত্বের পর হয়ে উঠলেন ভারতীয় সংসদীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। অবশ্য, কাশিরাম-রা হিন্দিভারতের নানা প্রান্তে – দলিত অনার্যের অধিকার ও সংসদীয় রাজনীতিতে তাদের অধিকারের পক্ষে সওয়াল করে গেছেন। ফলাফলে, এরপর কংগ্রেস ক্রমেই রাজ্যগুলিতে ক্ষমতা হারিয়েছে। আর, দলিত ভোটব্যাঙ্কের বিপরীতে ক্ষমতা ভাগাভাগি করেছে বিজেপি।

সংসদীয় রাজনীতিতে দলিত নেতৃত্ব উঠে এলে – সমাজজীবনে সংঘাত বাড়ল। সংরক্ষণ এলো, এলো বিতর্ক। দলিত রাজনীতির চেয়ে বেশ পিছিয়ে রইল আদিবাসি পরিচিতিসত্তা। যে পরিচিতিসত্তার কথা – ১৭ বছর আগে ভারতের সংসদে উল্লেখ করেছিলেন – এস এ দাঙ্গে। উচ্চবর্ণের দুর্গার বিগ্রহে যে – রক্তাক্ত বুক, তিনি আদিবাসি বীর, হুদুর দুর্গা, মহিষ রাজা। মানে – জঙ্গলের অনার্য ভারত।

হুদুর দুর্গা

১৯৭১ থেকে ২০১১। চল্লিশ বছরে বদলে গেছে ভারতে ক্ষমতার সমীকরন। বামদুর্গ পশ্চিমবঙ্গে সে বছর ক্ষমতা হারাবে ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকা বামফ্রন্ট। ৩ বছর পর – অটল-আদবানি টপকে ক্ষমতায় দীর্ঘ সফর শুরু করবেন বিজেপির, আরএসএস-এর নরেন্দ্র মোদী। ২০১১, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে , দলিত শিক্ষক ও ছাত্ররা মহিষাসুরের স্মরনে আয়োজন করেন চিত্র ও তথ্য প্রদর্শনী। ‘কিসকা পূজা করতা রাহা বহুজন।‘ ২০১৪ সালে, যা পাল্টে হল – সরাসরি স্মরণসভা। নবমীর রাতে, মহিষ রাজার স্মরণ অনুষ্ঠানে আক্রমন করে বজরং দল। আহত হন বেশ কয়েকজন।

এদিকে বাংলার পুরুলিয়ায় – ‘স্যান্সক্রিটাইজ়েশন ভারসেস নির্বাকাইজেশন’ –এর লেখক, নৃতত্ত্ববিদ, এবং আদিবাসি গবেষক ডঃ পশুপতি প্রসাদ মাহাতো আটের দশক থেকে ‘হুদুর দুর্গা’ নিয়ে গবেষণা শুরু করেছেন। ভারতীয় সমাজ ও রাজনীতি বদলের প্রভাব বোঝা যাচ্ছিল পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রামের জঙ্গলে। ২০১১ সালে অজিত হেমব্রমের নেতৃত্বে পুরুলিয়ার ভালাগাড়ায় হল অসুর পুজো। যে বছর দিল্লির বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজন করেছিল অসুর-প্রদর্শনী। ২০১৪ সালে মালদার গাজলে অসুরের স্মরণসভার আয়োজন করলেন নিত্যানন্দ হেমব্রময়ের দলবল। পরের ৩-৪ বছরের মধ্যে উত্তর-দক্ষিণবঙ্গ ও বিশেষত জঙ্গল মহল মিলিয়ে মহিষাসুর স্মরণ অনুষ্ঠান ৭০০ ছাড়িয়ে যায়। ২০২৫ সালে, ৩০০০ টপকে যায় জঙ্গলের মানুষের, দলিতের, বহুজনের আয়োজন। বহুকাল ধরে বহুজন অধিকার আন্দোলন ও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত শরদিন্দু বিশ্বাস তিন দশকের বেশি জুড়ে থেকেছেন নানান দলিত আন্দলনের সঙ্গে। কলকাতার গায়ে গড়িয়ায় তারা নিয়মিত আয়োজন করেছেন – মহিষাসুর স্মরণসভা।

দাঁশাই উৎসব


কেউ মূর্তি বানিয়েছেন। তামাটে ভারতীয় জঙ্গলের রাজা। কেউ বা আয়োজন করেছেন আলোচনাসভা। এমনিতেই জঙ্গল ছাড়িয়ে পুজোর চার দিন – দাশাই নাচ রাঢ় বাংলায় নয়ের দশক থেকেই দেখা যেত। এখন তা কলকাতামুখি।দাশাই নাচের গল্পে মিলেমিশে একাকার হন ‘হুদুর দুর্গা’। দেবতারা বা দুর্গা স্বয়ং যাকে – ছলনা করে লুকিয়ে নিয়ে গেছেন। প্রিয় সে মহিষ রাজার খোঁজে বেরিয়ে – বিষাদ হয়েছে নাচ। দাশাই যার নাম। অবশ্য, এই গল্পের বিস্তারে মিশে যান – কর্ণাটকের মহিষমণ্ডলের, বা মহীশূরের মহিষরাজা। মার্কণ্ডেয় পুরানের পাতা থেকে, বাঙ্গালির বিশ্বপরিচিতি হয়ে ওঠা দুর্গাপুজো – আসলে আড়াই হাজার বছরের আর্য আগ্রাসনের অভিমুখ। গুজরাতের নর্মদা অববাহিকার চণ্ডীকে – জমিদার বাড়ির বদ্ধতা থেকে বের করে – বাড়ির মেয়ে বানিয়েছেন বাংলার মানুষ। গানে, কবিতায়, চিত্রকলায়, শিল্পকলায়, বাজার নিয়ন্ত্রনে – দুর্গা শব্দের নতুন অর্থ বানিয়ে বাঙালি। যার মানে – উৎসব। মানে সর্বজনীন আনন্দ। কিন্তু অসুর? সেও কি আমার নয়? আমিই নই? আমরাই?

২০১৪ থেকে ২০২৬। কেন্দ্রে বিজেপি সরকারের নেতৃত্বে ২,১৫,৯৪৩ হেক্টর (প্রায় ২.১৬ লাখ হেক্টর) বনভূমি ধ্বংস করা হয়েছে। বিভিন্ন পরিকাঠামো উন্নয়ন, খনি ও অ-অরণ্য কাজের জন্য ব্যবহারের জন্যও বনভুমি কাটা হয়েছে।প্রায় ১.৬ কোটি গাছ কাটা পড়েছে । ঝাড়খণ্ডের পাতালগড়ি আন্দোলন, ছত্তিশগড়ের হাসদেও আরন্দ বাঁচাও আন্দোলন, নতুন বন সংরক্ষণ ও বন অধিকার আইন (FRA) নিয়ে প্রতিবাদ সামিল হয়েছেন আদিবাসীরা। জঙ্গল থেকে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান আদিবাসিরা। এই একি সময়ে সাঁওতাল, মুণ্ডা, ওরাওঁ, হো এবং কুরুখ সহ ছোটনাগপুর মালভূমি এবং পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, বিহার ও ছত্তিশগড় রাজ্যের বিভিন্ন উপজাতি সম্প্রদায় সারনা ধর্ম কোড চালুর দাবিতে অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।প্রকৃতি-উপাসনার সারনা ধর্মের ভিত্তি হলো জল, জঙ্গল ও জমিন।

সারনা ধর্মকোড ও আদিবাসী আন্দোলন


থমথমে পুজোর বাজার পার করে – বিজেপির বাংলায় প্রথম দুর্গাপুজো এলো। জঙ্গলের ভোটব্যাঙ্কে যেন খানিক সাবলীল ভোট পেয়েছে বিজেপি। গত পাঁচ-সাত বছরের অসুর পুজোর আয়োজনের পাশে – বজরং দল, হিন্দু সুরক্ষা মঞ্চ মায় আরএসএস বা সরাসরি বিজেপিকে দেখা গেছে কাছাকাছি। বাংলা তথা ভারতের বনবাসি মানুষের অধিকার আন্দোলন, সমাজস্বীকৃতির আন্দোলন হয়ে গত দেড় দশক যে মহিষাসুর স্মরণ অনুষ্ঠান হল, তা কি বিজেপির এই বাংলায় দেখা যাবে? নাকি সরাসরি মুছে যাবে? জানা নেই। তবে, যে দুর্গা, বসুন্ধরা বা উমা হয়ে বঙ্গবালা হলেন, এই আনন্দের শরত উৎসব, বেশ কিছুকাল মিনতি জানায়, – ‘হে বঙ্গবালা, ত্রিশূল সরাও – লাগছে, বড় লাগছে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.