পৃথিবীটা তবে ছোট হতে হতে ‘অ্যান্টি রোমিও স্কোয়াড’-এ বন্দি!

২৯ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

আজ থেকে কিছু বছর আগেও আমাদের সংস্কৃতিতে একটা পাড়ার প্রেম ছিলো৷ অ্যান্টি রোমিও স্কোয়াড বলতে তখন বোঝাতো কাকিমাদের, বাঁকা চাহুনি আর বাড়িতে জানার ভয়। কোনো স্যোসাইটির জ্যাঠামশাইরা নীতিপুলিশ সেজে নিরাপত্তার দায়িত্ব ঘাড়ে নিয়ে বসেননি তখনো। পাড়ায় ঢুকলে ঠ্যাং খোঁড়া হওয়ার ভয় থাকলেও, ছিল না বন্দুকের ভয়৷ আর আজ, এই রঞ্জনাদের কলকাতা শহর সাক্ষী থাকলো এক অবিশ্বাস্য ঘটনার৷ যে ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলে দিলো- ভালোবাসা অপরাধ? জুলিয়েটরা হারিয়ে গেলো। বেলা বোস কাঁদলো কি? অঞ্জন জানলো না।

পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে ১৮ বছরের এক তরুণের সঙ্গে গল্প করতে দেখা গেছিল ১৩ বছরের একটি মেয়েকে। সেই অপরাধে ওই তরুণ ও তাঁর বন্ধুকে তুলে আনা হয় নাবালিকার বাড়িতে। ডেকে আনা হয় তরুণের বাবাকেও। ঘরে আটকে রেখে বন্দুক দেখিয়ে চলে মারধর। এর পরে তিন জনকে নগ্ন অবস্থায় রাস্তা দিয়ে প্রায় ৫০ মিটার ঘোরায় মেয়েটির পরিবার৷
কলকাতার বুকে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি নাগরিক সমাজকে স্তম্ভিত করেছে। আইনের শাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই ধরনের প্রকাশ্য লিঞ্চিং প্রমাণ করে যে, সমাজে অপরাধ দমনের নামে এক বিপজ্জনক ফ্যাসিবাদী মানসিকতা তৈরি হচ্ছে, যেখানে জনতার আদালত বিচারকের ভূমিকা পালন করছে।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সৌদি আরবের মতো রাষ্ট্রে প্রেম করার অপরাধে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা কঠোর শরিয়তি আইনের চরম রূপকে তুলে ধরে। ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণশীল নৈতিকতার কোপ বহু ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বৈধতা এবং ধর্মীয় অনুশাসন যখন ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর খবরদারি করে, তখন নাগরিকের মৌলিক মানবাধিকার চরম হুমকির মুখে পড়ে।

একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র থেকে শুরু করে রক্ষণশীল সমাজ—সবক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি হলো মানুষের মনস্তত্ত্ব। রাষ্ট্র বা সমাজ যখন দেখে যে অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব কিংবা রাজনৈতিক ব্যর্থতা থেকে সাধারণ মানুষের নজর ঘোরাতে হবে, তখন তারা ‘নৈতিকতা রক্ষা’র জিগির তোলে। প্রেম, বিশেষ করে সীমানা, জাতি, ধর্ম বা সংস্কৃতির গণ্ডি পেরোনো প্রেম, সমাজ কাঠামোর প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতা বিন্যাসকে চ্যালেঞ্জ করে। তাই একে দমন করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
বিশ্ব রাজনীতিতে ডানপন্থী ও রক্ষণশীল রাজনীতির উত্থান জনমানসে এক ধরনের অসহিষ্ণুতা তৈরি করেছে। আইনের প্রতি আস্থার অভাব এবং বদলার সংস্কৃতির কারণে সাধারণ মানুষ সহজেই মব বা উন্মত্ত জনতার অংশ হয়ে উঠছে। ফেসবুকে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রোলের সংস্কৃতি থেকে শুরু করে রাস্তায় নগ্ন করে ঘোরানো—সবকিছুর মূলে রয়েছে অন্যের ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতি চরম ঘৃণা।

আমাদের রাজ্য রাজনীতি এবং সমাজ কাঠামো আজ এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলি যখন মেরুকরণের রাজনীতিকে হাতিয়ার করে, তখন সমাজের সাধারণ স্তরেও তার প্রভাব পড়ে। মানুষ ক্রমশ অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। পাশের মানুষটির ব্যক্তিগত পছন্দ, পোশাক বা জীবনযাপনকে নিজের বিশ্বাসের পরিপন্থী মনে হলেই তার ওপর চড়াও হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
​এই মানসিকতা আমাদের সমাজকে মধ্যযুগীয় বর্বরতার দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মনস্তত্ত্বের দিক থেকে এটি নিরাপত্তাহীনতার প্রতীক। যে সমাজ বা রাষ্ট্র নিজের নাগরিকদের স্বাধীনতা ও ভালোবাসার অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, সে সমাজ ধীরে ধীরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। প্রশ্ন জাগে, এই অসহিষ্ণুতার ভালোবাসা ছাড়া আর উত্তরণ কোথায়? কারণ- ওই যে! “আমাদের ভালোবাসা এখনো গোলাপে ফোটে।”
​

নির্ভীক ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পাশে থাকুন

সত্যকে স্বাধীন রাখতে আমাদের পাশে থাকুন। অনুদান দিতে QR কোড স্ক্যান করুন অথবা আমাদের UPI ID ব্যবহার করুন।

UPI ID 8240214079@okaxis

অন্যান্য প্রতিবেদন.