স্থান – আসাননগর, নদিয়া। ১৮০৮ সালের শরৎকাল। বটগাছে ঝুলছে লোহার খাঁচা। তাতে আটকে আছে নিথর দেহ। শকুন, চিল, কাকের ভিড়। ভয়ঙ্কর সেই সাজা! নিচে – মৃতের মায়ের চিৎকার – অন্তত জলে ফেলে দেওয়া হোক লাশ। মরা শরীর শান্তি পাবে!বিশ্বনাথ বাগদি, মানে বিশে ডাকাত। নীলকর স্যামুয়েল ফেডির অত্যাচারে গ্রামীণ হিন্দু-মুসলিম কৃষকদের নিয়ে সংগঠিত সশস্ত্র আন্দোলন করলেন। শান্তিপুরের তাঁতি আর নীলচাষীদের নিয়ে লেঠেল-বাহিনী গড়ে তোলেন বিশ্বনাথ সর্দার। শান্তিপুর কুঠি আক্রমণের পর – চিত্রশালী নীলকুঠি ও পরে নদিয়া ইন্ডিগো কনসার্নের নীলকর স্যামুয়েল ফেডির কুঠি ধ্বংস করেন নীলচাষীরা। নেতৃত্বে বিশ্বনাথ। পরপর বাঁশবেড়িয়া, খালিবোয়ালিয়া, নিশ্চিন্তপুর নীলকুঠি – সংগঠিত আক্রমণে মিশে গেল মাটিতে। রবিনহুডের মতো বিশে ডাকাত থেকে নীলবিদ্রোহের প্রথম নেতা হয়ে ওঠা বিশ্বনাথ সর্দারকে একদিন ইংরেজ সেনাপতি ব্ল্যাক ওয়ার ও ইলিয়টের পুলিশ ঘেরাও করে। সঙ্গের তাঁতি ও চাষীদের প্রাণ বাঁচাতে আত্মসমর্পণ করেন সর্দার স্বয়ং। পাল্টা ভয়ঙ্কর শাস্তির আয়োজন করে ইংরেজ। যেন জানতে পারে বাংলার কৃষক! তারপর – চিল-শকুন দিয়ে খাইয়ে দেওয়ার আয়োজন ও বিশ্বনাথ বাগদির মৃত্যুদণ্ড।

পরের পাঁচ দশক নীলকর সাহেব আর বামুন-কায়েত জমিদাররা নীলচাষ চালিয়ে গেছেন। ক্রমাগত দাদনের ফাঁদে বাংলার কৃষককে ফাঁসানো হয়েছে। একবার দাদন মানে – আজীবন ঋণের ফাঁস। যা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ধাওয়া করত। এভাবেই পেরিয়ে গেছে দশকের পর দশক। নীলচাষ করতে না চাইলে চলত ভয়ঙ্কর অত্যাচার। বেআইনি আটক, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, কৃষকের মেয়ে-বৌকে ধর্ষণ ও অত্যাচার ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।
১৮৫৭-র সিপাহি বিদ্রোহের ২ বছর পর, পুনরায় সংগঠিত হল নীলবিদ্রোহ। এবার নানান অঞ্চল, নানান নেতা। আরও জোটবদ্ধ বাংলার তাঁতি ও কৃষক। শুরুটা নদিয়ার গোবিন্দপুরে। প্রথমে নীলচাষ করতে অস্বীকার করলে আক্রান্ত হন বিদ্রোহীরা। নদিয়ার চৌগাছা গ্রামে দিগম্বর বিশ্বাস ও বিশ্বচরণ বিশ্বাসের নেতৃত্বে চাষিরা নীলচাষের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু করেন। তাঁরা তীর-ধনুক, বল্লম ও লাঠি নিয়ে নীলকুঠি ও সাহেবদের ওপর বাধ্য হয়ে আক্রমণ চালান। মহিলারাও রান্নার সরঞ্জাম ও পাত্র নিয়ে প্রতিরোধে যোগ দেন। নদিয়া থেকে যশোর, পাবনা থেকে খুলনা, ঢাকা থেকে মালদার নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে বিদ্রোহ। ১৮৫৯-৬০ সালের ঐতিহাসিক নীলবিদ্রোহের নেতা হিসেবে পাবনার কাদের মোল্লা, মালদার রফিক মণ্ডল জুড়ে যায়।

১৮৬০ সালে বিদ্রোহ চূড়ান্ত আকার নিলে নীল কমিশন গঠন করে ব্রিটিশ সরকার। নীলচাষ আসলে নির্যাতন, মেনে নেয় তারা। বাংলায় নীলচাষ বন্ধ হয়। সে বছরই দীনবন্ধু মিত্র ‘নীলদর্পণ’ নাটকটি রচনা করেন।
১৮৬০ সালে গন্ধর্ব নারায়ণ মিত্র, ওরফে দীনবন্ধু – বছর তিরিশের যুবক। আগে, উত্তর ২৪ পরগণা জেলার চৌবেরিয়ার বাড়ি থেকে পালিয়ে আসা গন্ধর্ব নাম পাল্টে আমহার্স্ট স্ট্রিটের অবৈতনিক সিএমএস স্কুলে পড়েন দীনবন্ধু। পরে হেয়ার স্কুল এবং আজকের প্রেসিডেন্সি কলেজ, তৎকালীন হিন্দু কলেজ। পুরনো পরিচয়ের সূত্রে নীলদর্পণ বইটি পৌঁছোয় অ্যাংলো-আইরিশ মিশনারি সোসাইটির ধর্মযাজক জেমস লঙয়ের কাছে। বছর ছেচল্লিশের এই পাদ্রীই ছিলেন দীনবন্ধু মিত্রের প্রথম স্কুলের পরিচালক।

জেমস লঙ চার্চ মিশনারি সোসাইটির সদস্য হয়ে ১৮৪০-এ কলকাতায় আসেন। ১৮৭২ পর্যন্ত ঠাকুরপুকুরের মিশনের প্রধান ছিলেন। নীলকরের অত্যাচার ও নীলবিদ্রোহ তিনি দেখেছেন। ইউরোপের নানান দেশের পার্লামেন্ট ও মনীষীদের কাছে, এই ভয়াবহ ব্রিটিশ-নির্যাতনের বিবরণ ও তথ্য পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন। শুরুতে ঢাকা থেকে নীলচাষের রায়ত ও মজুরদের ওপর নীলকরদের অকথ্য অত্যাচার ও দাস হিসাবে নিপীড়নের পটভূমিতে লেখা ‘নীলদর্পণ’ – বেনামে প্রকাশ করেন দীনবন্ধু মিত্র। পাদ্রী জেমস লঙ বিষয়টি বাংলার গভর্নরের ইন্ডিগো কমিশন বা নীল কমিশনের তৎকালীন সভাপতি হেনরি সেটন-করের নজরে আনেন। কথা বলেন লেফটেন্যান্ট গভর্নর জন পিটার গ্রান্টের সঙ্গে। গ্রান্ট ‘নীলদর্পণ’-এর ইংরেজি অনুবাদ চাইলে, স্বয়ং জেমস লঙ বেনামে স্বরচিত ভূমিকাসহ ইংরেজি অনুবাদ করা কপি দেন, লেখকের নাম হয় ‘বাই এ নেটিভ’। আসলে, গোপনে ‘নীলদর্পণ’ অনুবাদ করেন বছর ছাব্বিশের নব্য খ্রিস্টান মাইকেল মধুসূদন দত্ত।১৮৬১-র এপ্রিল-মে মাসে মুদ্রিত ‘দা ইন্ডিগো প্ল্যান্টিং মিরর’ নামে এই অনুবাদ পাড়ি দেয় ইউরোপে। তার আগে পাণ্ডুলিপি – ক্যালকাটা প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিং প্রেসের ক্লিমেন্ট হেনরি ম্যানুয়েলের কাছে পাঠান। ৩০০ টাকায় ৫০০ কপি ছাপানো হয়। গোপনে খামে ঢুকিয়ে দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট ইউরোপিয়ানদের পাঠাতে শুরু করেন। খামের ওপর লেখা ছিল ‘মহামান্য রাণীর সেবায়’।

‘নীলদর্পণ’ ইউরোপে পৌঁছলে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। নীলকরদের অত্যাচার ও জেমস লঙয়ের উদ্যোগে প্রশাসন এতই ক্ষুব্ধ হয় – তৎকালীন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সংবাদপত্রে অনুবাদক ও প্রকাশক ক্লিমেন্ট হেনরি ম্যানুয়েলের বিরুদ্ধে প্রচার শুরু হয়। বিভিন্ন সরকার-সমর্থিত পত্রিকায় খবর প্রকাশের পর, জেমস লঙের বিরুদ্ধেই মানহানির মামলা হয়। সে বছর ১৯-২৪ জুলাই কলকাতার সর্বোচ্চ কোর্টে শ্বেতাঙ্গদের নিয়ে গঠিত জুরি বোর্ড ও বিচারক এম এল ওয়েলস, জেমস লঙকে দোষী সাব্যস্ত করেন। ১০০০ টাকা জরিমানা ও এক মাসের জেল হয় তাঁর। আর সেই জরিমানার টাকা দেন খোদ হুতোম প্যাঁচা কালীপ্রসন্ন সিংহ।

১৮৭২ সালে ভারত ছাড়ার আগে কলকাতাকে, এই দেশকে অফুরান ভালোবেসে গেছেন যাজক জেমস লঙ। ইংরেজ শাসক, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুবিধাভোগী সাবর্ণ জমিদারিতে নিম্নবর্গের সোনার মাটি নির্যাতনের শিকার। ইউরোপে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে ভূমিকা নেওয়া আইরিশ পাদ্রী এসেছিলেন এক সন্ধিক্ষণে। নীলবিদ্রোহের আগের বছর, মানে ১৮৫৮ সালে ভারত সরকারের আইন অনুযায়ী – ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সমস্ত প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়। ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিলুপ্ত হয়। ধারা বদলায় ব্রিটিশ উপনিবেশ। আর, সারাবিশ্বে আলোচিত হতে থাকে – বাংলার কৃষকের সফল সশস্ত্র গণ-আন্দোলন। বাংলার মাটিতে রচিত হয় এক আন্তর্জাতিক আন্দোলনের পটভূমি। নানান বাঁক পেরিয়ে, বাংলার নানাপ্রান্তে অতি-সংখ্যালঘু বাঙালি খ্রিস্টান সম্প্রদায় আক্রান্ত হবার দিনে – পিছনে ফিরে দেখি, শাসকের গরিমার চেয়ে অপমান ও অন্ত্যজের কান্না নিয়ে – শান্তি ও সহাবস্থান চায় – জেমস লঙ ও মধুসূদনের সমকাল। আমেন!

