পশ্চিমবঙ্গের ঘাটাল শহরে সরকারি জমি উদ্ধারের নাম করে প্রায় সাড়ে তিনশো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকারদের উচ্ছেদ করা হয় পরিবর্তনের বাংলায়৷ দেখা যাচ্ছে পরবর্তীতে সেই জমিতেই গড়ে উঠেছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস) ও বিজেপির রাজনৈতিক পরিকাঠামো।
ঘাটাল শহরের প্রগতি মার্কেট ছিল স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ভোর চারটে থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত তিন দফায় চলা এই পাইকারি ও খুচরো বাজারে সবজি, মাছ ও মাংস বিক্রির উপর শহরের ১২টিরও বেশি ওয়ার্ডের সাধারণ মানুষ নির্ভরশীল ছিলেন। হকার্স ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে শুরু হওয়া উচ্ছেদ অভিযানের ফলে প্রায় ৩৫০ জন স্থায়ী দোকানদার এবং পাইকারি-খুচরো ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ৫০০-রও বেশি পরিবারের জীবিকা সরাসরি বিপন্ন হয়েছে। গরিব খেটে খাওয়া মানুষের রুজিরুটির ওপর বুলডোজার চালানোর এই ঘটনা তাঁদের বেঁচে থাকার অধিকারকেই গভীর সংকটের মুখে ফেলেছে।
সরকারি জমি জবরদখলের অভিযোগ তুলে যখন ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করা হয়, তখন প্রশাসনের একমাত্র যুক্তি ছিল আইন রক্ষা করা। কিন্তু দুর্গাপুজোর আগে সেই জমিতে নির্মাণকাজ শুরু হলে বিজেপি বিধায়ক শীতল কপাট এটিকে বইয়ের স্টল তৈরির অস্থায়ী কাঠামো বলে দাবি করলেও, পুজো শেষ হতেই সেখানে স্থায়ী রূপ নেয় ‘সেবা সঙ্কল্প সহায়তা কেন্দ্র’। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এই কেন্দ্রটি নামেই সেবাশিবির, বাস্তবে এটি বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির রাজনৈতিক দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে স্বস্তিক চিহ্নযুক্ত ব্যানারও টাঙানো হয়েছে। পাশাপাশি, অন্য একটি মাংসের দোকান উচ্ছেদের পর সেখানে গঙ্গাজল ছিটানোর ঘটনা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আইনের মারপ্যাঁচ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের এই বৈপরীত্যের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ঘাটাল হকার্স ইউনিয়ন। সংগঠনের নেতা শ্রীকৃষ্ণ শীলের প্রশ্ন, সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে সরকারি জমির নিয়ম কঠোরভাবে প্রযোজ্য হলেও রাজনৈতিক বা মতাদর্শগত সংগঠনের ক্ষেত্রে কেন সেই নিয়ম শিথিল করা হবে? উচ্ছেদ হওয়া ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন এবং প্রশাসনিক উদাসীনতার প্রতিবাদে হকার্স ইউনিয়নের পক্ষ থেকে মহকুমা শাসকের দপ্তরে অভিযান ও বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা করা হয়েছে। প্রয়োজনে আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের অধিকার ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানানো হবে বলে জানিয়েছে নেতৃত্ব।
ঘাটালের প্রগতি মার্কেটের এই ঘটনাটি প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাতে প্রান্তিক মানুষের অসহায়তার একটি স্পষ্ট দলিল। জনকল্যাণ ও আইনের শাসন যখন সাধারণ মানুষের জীবিকাকে বলি দিয়ে দলীয় বা আদর্শগত কার্যালয় স্থাপন করা হয়, তখন তা সুশাসন ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর নিরপেক্ষতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে। পুনর্বাসনের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ছাড়া এই ধরনের উচ্ছেদ অভিযান উন্নয়নমূলক পদক্ষেপের পরিবর্তে প্রান্তিকীকরণের প্রক্রিয়াকেই ত্বরান্বিত করে।

