জাগলেই কোজাগরী, লক্ষ্মীছাড়াই লক্ষ্মীমেয়ে

১৪ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

সেবার ঘূর্ণিঝড় ‘আয়লা’ পেরিয়েছে ৬ মাস। সুন্দরবনের অজ-পাড়াগাঁয়ে চলেছেন লক্ষ্মী। অনেকটা পথ নৌকায়, কিছুটা ভ্যানে, তারপর মাথার ওপর চেপে দীর্ঘপথ। সাংবাদিক অভয় নাগ সে ছবি ধরেছিলেন। উঠোনে পৌঁছতেই গৃহিণী, কন্যা-সহ প্রতিবেশীরাও কাঁদছেন। লুটিয়ে পড়ছেন বিগ্রহের সামনে। লক্ষ্মী এলেন। মাটির ঘরের কোণে এরপর ঠায় দাঁড়িয়ে হবেন প্রেরণা-স্রোত। পয়মন্ত। দুঃখ-সুখের সাক্ষী। হবেন মর্যাদার প্রতীক। ঝড় লক্ষ্মীশ্রী উধাও করেছিল। লক্ষ্মী ফেরেন – বিশ্বাসীর নিজগৃহে। না, এই দৃশ্যের আশেপাশে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ‘এসো মা লক্ষ্মী বসো ঘরে’ বাজছে না।

২০০৯ সালে আয়লার ১২ বছর পর ২০২১-এর পয়লা সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গে মহিলাদের জন্য ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ ভাতা-প্রকল্প শুরু হয়। ততদিন গ্রামবাংলার সমাজ বহুলাংশে বদলেছে। ২০২৬-এর নির্বাচনে ভোটার তালিকায় ঝাড়াইবাছাই, মানে এসআইআরের পর, জয় নিশ্চিত করতে জনপ্রিয় লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বদলে, ভাতার পরিমাণ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি মহিলা ভোট বাড়িয়ে দেয়। নাম হল ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’। নতুন সরকার ৬ মাস হতে চলল। অন্নপূর্ণার ভাণ্ডার নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। হিন্দু-মুসলিম বিভাজন হয়েছে। কেউ নিয়মিত পাচ্ছেন না। কেউ একবারও পায়নি। অতএব, কে জাগে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে, খোঁজ নেওয়া যাক।

বাজারে শাক-সবজি, মাছ-মাংসের দামে ছেঁকা লাগছে। থমথমে পুজোর বাজার, আর পুজোর ভিড়ে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ সহনাগরিকের মৃত্যু বিষাদময় করেছে শরৎ। সর্বজনীন উৎসবে লেগেছে ‘আমরা-ওরা’-র অনভ্যস্ত জড়তা। কে জাগে এই প্রাক-হেমন্তে?

ভোররাতে নামখানা, ক্যানিং, জয়নগর, ডায়মন্ডহারবার হয়ে – কাকভোরে দক্ষিণের ফ্ল্যাট বা শহরতলিতে পৌঁছে যাওয়া মেয়ের দল জানে – লক্ষ্মী মানে রোজগার। গতর লাগে তাতে। ধনে সৌভাগ্য বাড়ে। সৌন্দর্যে বাড়ে শ্রী। সমৃদ্ধি, সে তো নিজেই মায়া। অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের ভাতা এলে – কারো কারো ব্যাঙ্ক-লোনের ইএমআই শোধ হবে। কে জাগে মানে? জেগে থাকতে হয়। জেগে আছে মানেই – চিন্তায় আছে। চিন্তায় দুশ্চিন্তার ঝোঁক বাড়ে। থমথমে মানে – সচেতন নীরবতা। এমন বাজারদরে, বই-ছেঁড়া পুজো পেরিয়ে – শান্ত, বড় শান্ত কোজাগরী! তাঁকে, সুশীলা বলে ভুল করো না।

বদলেছে গঞ্জের শব্দ। নতুন নেতা কে? কে নাম লেখালো হিন্দু সুরক্ষা মঞ্চ, হিন্দু জাগরণ মঞ্চ বা বজরং দলে? জমির দালাল, প্রোমোটার, আরও আছে – মাঝামাঝি কাজ। জানো না, লক্ষ্মী – চঞ্চলা! ধরে ফেলতে হবে সহসা। নইলে অন্যের পকেটে যাবে। যেমন যায়। আরও আছে। মর্যাদার প্রতীক তিনি – সমাজ বা পরিবারে আমাদের মেয়েটি জানে না, গত ৫ মাসে ২৫৫৬টি ধর্ষণ নথিবদ্ধ হয়েছে। তালিকায় আছে ৬০০টি খুন, ১৩,১১৪টি খুনের চেষ্টা এবং ৩২,৩৪১টি গুরুতর আঘাতের ঘটনা। জানে কি গঞ্জ-গ্রাম, লক্ষ্মী-চরিত্র অনুযায়ী, দেবী কেবল ধন-সম্পদই দেন না, বরং মানুষের জীবনের ‘চার পুরুষার্থ’— ধর্ম, কর্ম, অর্থ ও মোক্ষ প্রদানে সহায় হন। তবে কি এই থমথমে চারপাশে, নয়া পুরুষার্থ গড়ে ওঠার দিন এলো? হয়তো! আলপনা ডিঙিয়ে গৃহিণীর সিংহাসনে বসে, নিশ্চিত আগামী দিনগুলিতে পুরুষার্থ মেপে নেবেন পরমা!

সন্ধ্যার সুরেলা ছন্দ ডাকে, মায়ের নিত্যকর্মে বৃহস্পতিবার দেখতে পাই যেন। অবন্তীনগরের ধনেশ্বর বণিকের ছেলেরা অহঙ্কারী হয়ে ওঠে। পাঁচালির পাতা বেয়ে – অহঙ্কারের বিসর্জন হয়। কারা জাগে দিনভর, যাদবপুর বা সত্যজিত রায়ের নামাঙ্কিত সিনেমা শেখার স্কুলে? বাইরে কি অহঙ্কার, নাকি যৌবনের ক্রোধ! ভুলপথে তারাই ছিঁড়লো বই? কুটিকুটি করছে – কবেকার প্রবাহ। স্বপ্ন, কৃষ্টি, শ্রম, যৌবন – এরও অপচয় ছিল। অপচয় হয়। অনুতপ্ত হয়ে অবন্তীনগরের যৌবন – ব্রত রাখে। আর নয় অপচয়। ধন-সম্পদ ফেরান লক্ষ্মী। তেমনই মানবসম্পদ। ক্রমাগত অপচয় শেষে, বাংলার পথঘাটে অচেনা দিন হয়ে ধরা দেয় – ডবল ইঞ্জিন! জানি না, এখানে অবন্তীনগর কেন থমথমে মাগো!

এই যে গেল বই ছেঁড়ার দিন! দুপাশে দুই লাল বইয়ের স্টলে সপ্তমীর রাতে নামলো পুলিশ। মাঝে নির্ঝঞ্ঝাট দাঁড়িয়ে আরএসএসের বইয়ের স্টল। গায়ে অজস্র ভুল বানান আর বিকৃত ছবির মাঝে – প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার আর কল্পনা দত্তের ছবি। না, সারদামণির ছবি নেই তাতে! কী বেআক্কেলে! ব্রিটিশের সেনা জোগান দেওয়া সংগঠনে এমন লক্ষ্মীছাড়াদের ছবি কেন? হিন্দু নাম বলে? ও মেয়ে মুহূর্তে জানের বাজি ধরে। লড়ে যায় লক্ষ্মীছাড়া। প্রয়োজনে মুখে রাখে পটাশিয়াম সায়ানাইড। মাস্টারদা সূর্য সেন প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির চট্টগ্রাম শাখার কল্পনা দত্তকে রবীন্দ্রনাথ ‘অগ্নিকন্যা’ বলেছেন। বীরাঙ্গনা প্রীতিলতার বীরাঙ্গনা সহযোদ্ধার পরের গন্তব্য কমিউনিস্ট পার্টি। আজীবন লক্ষ্মীছাড়াই থেকে গেলেন লক্ষ্মীমেয়ে।

দেশ বদলায়, বদলায় কাল। মন্বন্তরের দেশে, দেশভাগের দেশে, লক্ষ্মীভোগ ধানের দেশে আসে নতুন ধুরন্ধর। মাটির ঘর-সিমেন্টের মেঝে পেরিয়ে পাহাড়-কাটা পাথরে চকচকে হয় ফ্লোর। ভাদু-টুসুর মা-বোনেরা রাত জাগে। জঙ্গলে স্লোগান তোলে – ‘গাছ বাঁচাও’। নইলে আসছে দিন, বয়ে যাওয়া হাওয়ায় – কাঁপবে না বনলক্ষ্মী। তখন না-হয় মেনে নিও – যে জাগে, সে লক্ষ্মীছাড়া। জাগে চেতনা। জাগে ভোররাতের ট্রেনের মেয়েরা, জাগে প্রীতিলতা, কল্পনা জাগে। জাগেন মাতঙ্গিনী। জাগেন দেশকালের মঙ্গলের জন্য। জাগেন, কারণ – শান্তির পথে আসে সমৃদ্ধি। জাগলেই – কোজাগরী। চাঁদ হবে পূর্ণ-গোলক। আর, জাগা না জাগার মাঝে – যা কিছু থমথমে, তার ওপারে ঠায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন যিনি – তিনি বিজয়লক্ষ্মী। লক্ষ্মীছাড়াই তাঁকে চেনে ভালো!

অন্যান্য প্রতিবেদন.