প্রথমে একটা প্রশ্ন করি।কোনো সরকার নির্বাচনে বিপুল ভোটে জিতে ক্ষমতায় এল।তারপর সেই সরকার যা সিদ্ধান্ত নেবে,তা নিয়ে কি আর কোনও প্রশ্ন তোলা যাবে না? বিরোধিতা করলেই কি তাকে দেশদ্রোহী, উন্নয়নবিরোধী কিংবা ষড়যন্ত্রকারী বলে দাগিয়ে দেওয়া হবে? যদি তাই হয়, তা হলে হয়তো নির্বাচনের প্রয়োজন আছে,কিন্তু গণতন্ত্রের আর কী প্রয়োজন?
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য তো সেখানেই যেখানে ভিন্নমতকে আনত শ্রদ্ধায় গ্রহণ করা হয়।
মাথায় রাখতে হবে গণতন্ত্র মানে শুধু পাঁচ বছর অন্তর ইভিএম টিপে ভোট দেওয়া নয়।গণতন্ত্র মানে সাধারণ মানুষের কথা বলার অধিকার এবং স্পষ্টভাবেই ক্ষমতায় থাকা সরকারের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার সুযোগ।
অবশ্যই এই কাজগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার দায় বিরোধী দলের।
বিরোধী দল সরকারের শত্রু নয়,গণতন্ত্রের প্রয়োজন। এই কথাটা বুঝতে পারা জরুরি।কারণ, যে কোনও সরকারই ভুল করতে পারে।ক্ষমতায় থাকার সময় অনেক সিদ্ধান্তই শাসকের কাছে সঠিক বলে মনে হতে পারে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের প্রভাব যখন সাধারণ মানুষের জীবনে পড়ে,তখন তার ভালো-মন্দ বিচার করার প্রয়োজন হয়।বিরোধী দল সেই বিচারপ্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যায়।সরকারের নীতির সমালোচনা করে,মানুষের সমস্যার কথা তুলে ধরে এবং প্রয়োজনে বিকল্প পথের সন্ধান দেয়।
ধরা যাক,সরকারের কোনও নতুন নীতির ফলে সাধারণ মানুষের খরচ বেড়ে গেল,কোনও প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ উঠল,কিংবা কোনও সিদ্ধান্তে একটি বিশেষ শ্রেণির,জাতির মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেন।
তখন প্রশ্ন উঠবে না কেন? সরকারকে জবাব দিতে হবে না কেন? শুধু সরকারের বক্তব্য শুনেই কি মানুষের সন্তুষ্ট থাকা উচিত? বিরোধী দল এই প্রশ্নগুলিই করবে সরকারকে।তাই গণতন্ত্রে বিরোধী দলের কণ্ঠস্বর দুর্বল হয়ে পড়া মানে শুধু সেই একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষতি নয়,সাধারণ মানুষের প্রশ্ন করার পরিসরও সংকুচিত হয়ে আসা,গণতন্ত্রে ঘুন ধরা।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের রাজনীতিতে তাকালে আমরা দেখতে পাবো, মতের অমিল নতুন কোনো বিষয় নয়।
গান্ধী,নেহরু ও সুভাষের মধ্যেও বিবিধ বিষয়ে একাধিকবার মতবিরোধ হয়েছে।সেই বিরোধ কখনও তীব্র হয়েছে,কখনও সাংগঠনিক সংকটও তৈরি করেছে।তবু লক্ষ্য ছিল একমাত্র দেশের স্বাধীনতা অর্জন।আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়(১৯৪০ সালে) ব্রিটেনে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চার্চিল ও ক্লিমেন্টের দল একসঙ্গে সরকারে কাজ করেছে।
এই ইতিহাস আমাদের শেখায়,রাজনীতিতে বিরোধিতা থাকবে,প্রতিযোগিতাও থাকবে,কিন্তু দেশের ঊর্ধ্বে কিছুই নয়।
গণতন্ত্রে সরকার ও বিরোধী দলকে বন্ধু হতে হবে একথা বলছি না,কিন্তু একে অপরকে শত্রু ভাবলে চলবে না।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নানা দল,নানা মত, আদর্শ থাকবে এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার, কিন্তু লক্ষ্য রাখা উচিত রাজনৈতিক আদর্শের ভিন্নতা যেন দেশের উন্নয়নের পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।
প্রতিটি রাজনৈতিক দলের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত রাষ্ট্রের অগ্রগতি ও মানুষের কল্যাণ।
সলিল চৌধুরী তাঁর একটি গণসংগীতে বলেছিলেন,
“আমাদের নানান মতে নানান দলে দলাদলি/
কেউ বা চলে ডাইনে বা কেউ বাঁয়ে চলি..….যখন প্রশ্ন ওঠে যুদ্ধ কি শান্তি/আমাদের বেছে নিতে হয় নাকো ভ্রান্তি/
আমরা জবাব দিই শান্তি শান্তি শান্তি!”
সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
যদি আমরা ভাবি,সংসদ কেবল আইন পাশ করার জায়গা,তবে সেটি ভুল।সেখানে আইনের ভালো-মন্দ বিচার হওয়া উচিত,সরকারের কাজের হিসাব চাওয়া উচিত এবং দেশের মানুষের সমস্যা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত বিরোধীপক্ষের।
প্রশ্নোত্তর পর্ব,বিতর্ক,সংসদীয় কমিটি – এই সব ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই সরকারের কাজের উপর নজরদারি করা সম্ভব।
মনে রাখতে হবে,সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই যে সরকার যা ইচ্ছা করবে,আর সংসদে বিরোধীপক্ষের সাংসদরা শুধু হাত তুলে সেই সিদ্ধান্তে সিলমোহর দেবে,গণতন্ত্রের ধারণা এমন মোটেই নয়।
একটা তথ্য জানিয়ে রাখি,ভারতীয় রাজনীতির এই উত্তাল পরিস্থিতিতে চলতি বছরের লোকসভার বাদল অধিবেশনে বিরোধিতা ও নানান কারণে বারবার অধিবেশন মুলতুবি হওয়ার কারণে লোকসভা নির্ধারিত সময়ের মাত্র ১৫ শতাংশ কাজ করতে পেরেছিল,রাজ্যসভায় কাজ হয়েছিল ৩৩ শতাংশ সময়।
প্রশ্ন হলো,বিরোধী দল যদি মানুষের হয়ে কথা বলার সুযোগই না পায়,তা হলে সে তার ভূমিকা কীভাবে পালন করবে? আবার বিরোধী দল যদি প্রতিবাদের নামে দিনের পর দিন সংসদ অচল করে রাখে,তা হলেও কি সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা হয়?
সংসদে হইচই হতে পারে,প্রতিবাদও হতে পারে। কিন্তু সেই প্রতিবাদের পরিণতি যদি হয় আলোচনা বন্ধ হয়ে যাওয়া, তা হলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিটা কার? উত্তরটা খুব সহজ, ক্ষতিটা হলো সাধারণ মানুষের।
এখানেই আসে বিরোধীদলের দায়িত্বেবোধের মূল প্রশ্ন,
সরকারের চোখে আঙুল দিয়ে ভুল ধরিয়ে দেওয়া যেমন তার কাজ,তেমনই নিজের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি ও তথ্য হাজির করাও তার দায়িত্ব। শুধু সরকারের সমালোচনা করলেই বিরোধী দল দায়িত্ব পালন করে,এমনটা বলছি না।
যেমন বেকারত্বের সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন তুললে কর্মসংস্থান বাড়ানোর বাস্তব প্রস্তাবও দিতে হবে বিরোধী দলকে,মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ করলে বিকল্প অর্থনৈতিক নীতির কথা বলতে হবে তাদেরকে,দুর্নীতির অভিযোগ তুললে তার পক্ষে প্রমাণ হাজির করতে হবে,তবেই তা হবে সুষ্ঠু বিরোধিতা।এদেশে মানুষের ক্ষোভকে অনেকসময় রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত করে হাতিয়ার বানানো সহজ ঠিকই কিন্তু সেই ক্ষোভের সমাধানের পথ দেখানো অনেক কঠিন।
ঠিক এখানেই দায়িত্ববোধ দেখাতে হবে বিরোধী দলকে।
একই সঙ্গে সরকারকেও মনে রাখতে হবে,বিরোধী দলের প্রতিটি প্রশ্নকে অপমান হিসেবে দেখলে চলবে না।সমালোচনা শুনতে না চাওয়া কোনও শক্তিশালী সরকারের লক্ষণ নয়। বরং গণতন্ত্রে যে সরকার নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে পারে,ভুল হলে তা সংশোধন করতে পারে এবং বিরোধী মতকে সম্মান জানায়, তার গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। বিরোধী দলের বক্তব্য ভুল হলে সরকার যুক্তি দিয়ে তার জবাব দিক।কিন্তু ভিন্নমত,বিরোধী প্রশ্নকেই যদি অপরাধ বলে গণ্য করা হয়,তা হলে গণতন্ত্রের ভিতটাই ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে আর স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা শিকড় গাড়ার অবাধ পরিসর পায় ।
অবশ্য বিরোধী দলের প্রতি মানুষের আস্থা অর্জন করাও একান্ত জরুরি।আমার মনে হয়,শুধু ক্ষমতাসীন দলকে হারানোর আকাঙ্ক্ষা দিয়ে সেই আস্থা তৈরি হয় না।বিরোধী দলকে নিজেদের ভুল স্বীকার করতে হবে, মানুষের সমস্যার পাশে থাকতে হবে এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের বদলে নীতিগত বিতর্কে গুরুত্ব দিতে হবে। সরকার যা করছে,তার সবই ভুল- এমন মনোভাব যেমন অযৌক্তিক তেমন নীতিগত সমালোচনার পরিবর্তে ব্যক্তিআক্রমণ, বিরোধী রাজনীতিকে কদর্যতায় পরিণত করাও গণতন্ত্রের জন্য ভীষণ মারাত্মক ও ক্ষতিকর।
কোনো গণতন্ত্রের সবচেয়ে ভয়ংকর সময় তখনই যখন রাজনীতি বিরোধীশূন্য হয়ে পড়ে,তখন স্বাভাবিকভাবেই গণতন্ত্রের ভিত ক্রমশ নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
কারণ,যে ক্ষমতার উপর কোনও কার্যকর নজরদারি নেই,সেই ক্ষমতা একসময় নিজেকেই আইনের ঊর্ধ্বে, সংবিধানের উর্ধ্বে ভাবতে শুরু করতে পারে।
উল্লেখ্য,হিটলারের জার্মানি তার এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। ১৯৩৩ সালে নাৎসি বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দমন করে জার্মানিকে একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত করে।
সেই ইতিহাস আমাদেরকে দেখায়, ক্ষমতার উপর কার্যকর কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকলে গণতন্ত্র কীভাবে একনায়কতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
প্রসঙ্গত,বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে একে সরাসরি বিরোধীশূন্য রাজনীতি বলা না গেলেও,এই বিভক্ত ও অনিশ্চিত অবস্থায় বিরোধী রাজনীতির কার্যকারিতা নিয়ে যে আশঙ্কা রয়েছে,তা বললে বোধহয় খুব একটা অত্যুক্তি হবে না।
পরিশেষে বলি,শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের সৌন্দর্য সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে কে কাকে হারাল,শুধু তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।আসল প্রশ্ন হল,এই রাজনৈতিক লড়াইয়ে দেশের সাধারণ মানুষের কতটা লাভ হল। সরকার যদি কাজ করে,তার প্রশংসা হবে,ভুল করলে প্রশ্ন উঠবে ঠিকই।বিরোধী দল যদি মানুষের স্বার্থে কাজ করে,তার সমর্থন বাড়বে,ব্যর্থ হলে তারও সমালোচনা হবে,আস্থা হারাবে এ কথাও ঠিক।
কারণ,গণতন্ত্রে সরকারকে কাজ করতে হয়,আর সেই কাজের হিসাবও দিতে হয়।
মনে রাখা জরুরি,যে দেশে মত,দল,আদর্শ নির্বিশেষে প্রশ্ন করার অধিকার বেঁচে থাকে,সেই দেশেই গণতন্ত্রের প্রাণ বেঁচে থাকে।

