আমাদের নানা সাহেব

৭৭ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

সময়টা আশির দশকের মাঝামাঝি। আমরা তখন একাদশ শ্রেণি, আমরা তখন কলেজ। শিখে গেছি ক্লাস ফাঁকি দিয়ে আসানসোলের সমস্ত সিনেমা হলে সঠিক সময়ে পৌঁছে যেতে। ছারপোকা কবলিত চেয়ারে আমাদের তিনঘন্টার স্বপ্নবিলাস জারি থাকছে। একদিন বন্ধু এসে জানাল পাড়ার চিত্রা সিনেমা হলে একটা ফাটাফাটি সিনেমা এসেছে, নাম ‘আজ কি আওয়াজ’। হিরো রাজ বাব্বর, হলিউডি কায়দায় গোটা পাঁচেক খুন, বদলার গল্প সাড়ে ষোল আনা উশুল। সেখানে প্রথম নজরে পড়ে এক রোগা চেহারার মানুষকে যার শীতল চোখে মৃত্যুর ঠিকানা লেখা।সব মিলিয়ে দশ মিনিটের স্ক্রিন প্রেজেন্স, তাতেই মাত। কেউ একজন বলল মারাঠা অভিনেতা, নাম নানা পাটেকর। তার বছরখানেক পর নানাকে দেখলাম এন চন্দ্রার ‘অঙ্কুশ’ সিনেমায়। বেকারি আর দুর্নীতির যাঁতাকলে পিষ্ট কিন্তু আদর্শের প্রতি দায়বদ্ধ চারটে ছেলের এক গ্রুপ। নানা সেই দলের নেতা।সত্তর দশকের সেই ব্যক্তিগত বিদ্রোহীর গল্প তখন বলিউডে ফিকে হয়ে আসছে। প্রতিবাদের যৌথতা ভাষা পাচ্ছে। এই ছেলেগুলো শেষপর্যন্ত আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। জমির কাছাকাছি মানুষদের গল্প হিট করে, নানা বুঝিয়ে দেন বলিউডে তিনি থাকতে এসেছেন। নানার প্রতি একটা অন্য ধরণের সমীহ আমার সেই থেকে শুরু।

নানার জীবনে  ভিনি ভিসি ভিডি হল বিধু বিনোদ চোপড়ার ‘পারিন্দা’। নব্বই দশক শুরু হল এই সিনেমা দিয়ে। মুম্বাইয়ের আন্ডার ওয়ার্ল্ড, ড্রাগস, চোরাকারবার নিয়ে আগেও অনেক সিনেমা হয়েছে। এই ধরণের সিনেমায় আগে থাকত গুহার মত ভিলেনের ডেরা, তাতে ঝুলন সাজানোর মত লাল- নীল আলো, ভ্যাম্পের কম্পালসারি নাচ আর শেষ দৃশ্যে নায়ক ও খলনায়কের মধ্যে মারপিট। বিধু বিনোদের পারিন্দা ছিল অন্য জগত। আন্নার ভূমিকায় নানার শঠতা, অন্তর্লীন হিংসা এমন পর্যায়ে ছিল যেখানে দর্শকের মেরুদণ্ডে শীতল স্রোত বয়ে যেত। শোলেতে যেমন সঞ্জীবকুমার, অমিতাভ  বচ্চন, ধর্মেন্দ্রকে ছাপিয়ে চলে যান গব্বরের ভূমিকায় আমজাদ খান, তেমনি সেই সময়ের হিট জুটি অনিল কাপুর, মাধুরী দীক্ষিত, জ্যাকি শ্রফ ম্লান হয়ে যান পর্দায় নানার শ্বাসরোধী উপস্থিতিতে। এই ক্রুরতার মধ্যেও একটা পাগলামো ছিল যা অন্য ভাবে প্রতিভাত হয় হলিউডের বানিজ্য সফল ছবি ‘স্লিপিং উইথ এনিমি’র রিমেক ‘অগ্নিসাক্ষী’তে। আমরা উপলব্ধি করতে পারি কেন সিনেমার নায়িকা (মনীষা কৈরালা) তার স্বামীর কাছ থেকে পালিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে চান। চোখের তারায় হিংসাকে লুকিয়ে রাখার এই শৈলী বার বার আমাদের মোহমুগ্ধ করে তোলে।

ক্রান্তিবীর ছবির এক দৃশ্যে নানা পাটেকর (১৯৯৪)

নানা সৌভাগ্যবান কারণ তিনি যখন অভিনয় জীবন শুরু করেছেন তখন সত্তর দশক থেকে চলে আসা মূলধারার বানিজ্যিক সিনেমা ও আর্ট হাউস সিনেমার তথাকথিত পার্থক্য রেখা বিলীয়মান। সিনে ক্রিটিকরা সিনেমার এক নতুন তত্ত্বায়ন শুরু করেছেন যার আনুষ্ঠানিক নাম মিডল রোড সিনেমা। হৃষীকেশ মুখার্জী, বাসু চ্যাটার্জী, বাসু ভট্টাচার্যের দেখানো পথ ধরে এগিয়ে আসছেন সাই পরাঞ্জপে, কেতন মেহেতা, সৈয়দ মির্জা, কুন্দন শাহ, নবেন্দু ঘোষেরা। ভালো অভিনেতারা সব ধরণের ছবিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিকে নানা দারুন ভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন। অনেকের মনে থাকবে রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মান্ডি হাউসেও খোলা হাওয়া বইতে শুরু করে।প্রতি শুক্রবার গভীর রাতে দূরদর্শনে দেখানো হতে থাকে প্রাপ্তমনস্ক বিশ্ব চলচ্চিত্র। টিভির পর্দায় এসময় নানা পাটেকর অভিনীত দুটো সিনেমা দেখি। প্রথমটি ‘গিধ’ (পরিচালক এন রঙ্গা)। দেবদাসী প্রথাকে সামনে রেখে নারী পাচারের এক জ্বলন্ত ছবি। এক দালালের ভূমিকায় নানা অনবদ্য। দ্বিতীয়টি হল নবেন্দু ঘোষের ‘তৃষাগ্নি’। বৌদ্ধ দর্শনকে ভরকেন্দ্রে রেখে সন্ন্যাসী জীবনের কামনা- বাসনা, লোভ-হিংসার এক জটিল আখ্যান শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায়ের ‘মরু ও সঙ্ঘ’ উপন্যাস। এই কঠিন টেক্সট শুরু ও শেষ হয় মরু ঝড় দিয়ে। মাঝখানে চরাচর ব্যাপী কামনার আগুন। এক কামদগ্ধ, পরশ্রীকাতর পৌঢ়ের ভূমিকায় নানার অভিনয় আমাদের স্মৃতিতে রয়ে যায়।

এই পর্বে ১৯৮৮ সালে মুক্তি পায় মীরা নায়ারের প্রথম চলচ্চিত্র ‘সালাম বম্বে’। মায়ানগরীর তলপেটে লুকিয়ে থাকা পঙ্খিল জীবনের জলছবি। নানার চরিত্রায়ন যথাযথ। দস্তয়ভস্কির কালজয়ী উপন্যাস ‘দি ইডিয়ট’ বারবার বিভিন্ন ভাষায় রুপালী পর্দায় এসেছে।বাংলাতে হয়েছিল ‘অপরিচিত’। হিন্দি রূপান্তর ‘যুগপুরুষ’, নাম ভূমিকায় নানা পাটেকর। সমাজের প্রবহমানতার সঙ্গে যুক্ত হতে না পাওয়ার যন্ত্রণা জীবন্ত করে তোলেন নানা। তবে তুলনায় অনেক কম আলোচিত ভিন্ন ধর্মী সিনেমার আর এক পরিচালক গুলজারের ‘হু তু তু’। এক আপাদমস্তক পচে যাওয়া সিস্টেমের বিরুদ্ধে সমাজের উচ্চকোটির দুই যুবক যুবতীর রক্তাক্ত প্রতিবাদ। এই সিনেমায় দলিত গায়কের চরিত্রে ছায়া পড়ে,  বিপ্লবী গায়ক গদরের। গদরের পারফরম্যান্স সামনে থেকে দেখার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি নানা এই চরিত্রে নিজেকে ছাপিয়ে গেছেন। গুলজার ব্যালাড ধর্মী গানগুলোকে ব্যবহার করে সিনেমাতে এক অন্যরকম আবহাওয়া তৈরি করতে পেরেছিলেন। বেশ কয়েক বছর পর গৌতম ঘোষের ‘যাত্রা’ দেখার অভিজ্ঞতা হয়। সেখানে বরং পুরষ্কার প্রাপ্ত লেখকের ভূমিকায় নানার অভিনয় নেহাৎই সাদামাটা।

সালাম বম্বে ছবির দৃশ্যে নানা পাটেকর (১৯৮৮)

নানার আর এক ক্ষেত্র হল রোমান্স।বাজার চলতি প্রেমের আখ্যান নয় বরং এমন এক ভালোবাসা যা জীবনকে দেখতে শেখায়। আমার মনে হয় অমল পালেকরের ‘থোড়া সা রুমানি হো যায়’ এই গোত্রের সেরা উদাহরণ। রিচার্ড ন্যাশের ‘রেনমেকার’ নাটকের অনুপ্রেরণায় তৈরি এই ছবির চিত্র নাট্য। আগাগোড়া ছন্দোবদ্ধ এই গল্পে বৃষ্টির স্বপ্ন ফেরি করেন নানা। বারিশওয়ালা ও তার আশেপাশের চরিত্ররা পরাবাস্তব ও বাস্তবের আলো আঁধারির মধ্যে যাত্রা করে যেখানে শেষপর্যন্ত সমস্ত নৈরাশ্যের মেঘ কেটে গিয়ে উদিত হয় অপাপবিদ্ধ রবি কিরণ। সম্ভবত হিন্দি লিরিক্যাল সিনেমার এখনও পর্যন্ত সেরা উদাহরণ। শাহরুখ খানের প্রথম দিকের অভিনীত ছবি ‘রাজু বন গ্যায়া জেন্টলম্যান’ এও নানার চরিত্র ভালোবাসার অ-আ-ক-খ শেখায়। ব্যক্তি স্বার্থের উপরে উঠতে পারলে জীবন যে অনেক সুন্দর — এই বার্তাও তো ভালোবাসার। আরো গভীর হল সঞ্জয় লীলা বনশালির ‘খামোশি- দি মিউজিকাল’। মূক ও বধির নানা ও সীমা বিশ্বাসের নীরব কিন্তু বাঙ্ময় অভিব্যাক্তির মধ্যে ফল্গুধারার মত বয়ে চলে ভালোবাসার গান।

১৯৯১ সালে নানা পরিচালক হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। সিনেমার নাম ‘প্রহার’। এক শৃঙ্খলা পাগল আর্মি অফিসার ও তার এক দুর্ঘটনায় আহত এবং পরে খুন হয়ে যাওয়া ক্যাডারের গল্প। ইদানীং সামরিক বাহিনীকে উগ্র জাতীয়তাবাদী জিগির তুলে যেভাবে চিত্রিত করা হয়,এই ছবি তেমন নয়। এখানে উপজীব্য সামরিক ও সিভিলিয়ান জীবনের দ্বন্দ্ব, মধ্যবিত্তদের ভীত, মেরুদণ্ড হীনতা। আমরা এক সম্ভাবনাময় পরিচালককে দেখেছিলাম প্রহারে। গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে বিশিষ্ট নাট্য নির্দেশক হাবিব তনবীরকে দিয়ে অভিনয়, শোভা গুটরুর গলায় ‘ইয়াদ পিয়া কি আয়ে’র মত ক্ল্যাসিকের ব্যবহার বুঝিয়েছিল, নানা অন্য পথে হাঁটতে চান। যদিও পরিচালক হিসাবে আর সেভাবে আমরা তাকে পাইনি।

এত বৈচিত্র্য সত্বেও শেষ পর্যন্ত জনমানসে নানা ‘ক্রান্তিবীর’ হিসাবেই বেঁচে থাকবেন। সিস্টেমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী এককের  লার্জার দ্যান লাইফ ইমেজ তুঙ্গে ওঠে ক্রান্তিবীরে যদিও এর সলতে পাকানোর পর্ব শুরু হয়েছিল ‘তিরঙ্গা’ থেকে। তারপর গুলাম-ই- মুস্তাফা, যশোবন্ত সহ একাধিক সিনেমা যেখানে নানা নিজের ইমেজে বন্দী। সাফল্যের ফর্মুলার রিপিট ভ্যালুতে বিশ্বাসী বলিউডের মশালা ডিরেক্টরদের কারণে একই ম্যানারিজম নানাকে গ্রাস করেছে। যদিও যখনই সুযোগ পেয়েছেন নিজের জাত চিনিয়েছেন। দুই পর্বের আব তক ছাপ্পানের ট্রিগার হ্যাপি পুলিশ ইন্সপেক্টর বা ওয়েলকামের আশ্চর্য কমিক টাইমিং – নানা অনবদ্য। প্রথাগত ছকের নায়ক না হয়েও শুধুমাত্র অভিনয়ের জোরে বলিউডের যে অভিনেতারা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন, আমাদের নানা সাহেবের সেই তালিকায় থাকা নিশ্চিত।

অন্যান্য প্রতিবেদন.