নব্বই দশকের পরপরই কোকাকোলার এই বিজ্ঞাপনটি মুক্তি পেয়েছিল। আমরা তখন সবে সেকেন্ডারি, পেনসিল ছেড়ে পেন, প্রেম বলে একটা বস্তু হয় সেটা কুছ কুছ হোতা হ্যায় দেখে শিখেছি। এতদিন দুর্গাপুজো মানে ছিল নতুন জামা-জুতো, ভাই বোনের সাথে ঠাকুর দেখা, নিদেনপক্ষে পারিবারিক আত্মীয়রা। সেই প্রথম এই চলতি সমীকরণ ভেঙে গেল। স্কুলে সিনিয়র দাদাদিদিরা ‘সপ্তমীতে প্রথম দেখা’ গুনগুন করতে করতে করিডোরে ঘুরে বেড়াতো। পঞ্চমীর দিন স্কুলে রঙিন জামা পরার ব্যবস্থা ছিল বলে আমরা সকলেই বেশ নড়েচড়ে বসতাম। মিন্ত্রা নেই, সাউথ সিটি নেই, ফ্ল্যাট ফিফটি অফের কোনো হিড়িক নেই। তার জায়গায় আছে মুখে মুখে দর করে গড়িয়াহাট, দেশপ্রিয় পার্ক আর হাতিবাগানের ফুটপাত। ছোট বলে পুজোয় অনায়াসেই সাত আটটা জামা হয়ে যেত, সেখান থেকে বাছতে হতো পঞ্চমীর ড্রেস। সেটা অষ্টমীর থেকেও বেশি কেতাদুরস্ত হওয়া চাই। ওই একদিনই স্কুলের প্রিয় মানুষটাকে ইউনিফর্ম ছাড়া অন্য পোশাকে দেখা যাবে, সেই সুযোগে পুজোর সবথেকে ভালো নতুন জামাটা পরে নেওয়া অবশ্য কর্তব্য।

তখন আমরা ক্লাস সিক্স, বন্ধুদের সাথে টইটই করার অনুমতি পাইনি, তাই পঞ্চমীটাই ছিল বয়ঃসন্ধি প্রেমের নাগাল পাওয়ার একমাত্র চেষ্টা। বাংলা, হিন্দি সিনেমা দেখে রোম্যান্স আয়ত্ত হয়েছে, সবে সবে টিনেজার হচ্ছি, কিন্তু শরীর বা মনের ঔৎসুক্য অনুযায়ী ঘুরে বেড়ানোর অনুমতি মিলছে না। তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরও তিন চার বছর। ২০০৭ সাল থেকে চিত্রটা একটু বদলালো। যে সিনিয়র দিদিদের দেখে মুক্ত পরী মনে হতো, তাদের বয়সে আসতেই দুর্গাপুজোর একটা উত্তরণ ঘটলো। ভিজিয়ে ক্যামেরা, নোকিয়া মিউজিক এক্সপ্রেসে পুজোর গান, কলকাতার পশ জায়গায় কি একটা ফোরাম মল বলে বস্তু হয়েছে, সেখানে যেতে পারলে বিদেশ বিদেশ লাগে, এইসব দেখেশুনে বড় হচ্ছি। আমার দৌড় যদিও গড়িয়াহাটের চুমকি বসানো সালোয়ার আর দেশপ্রিয় পার্কের শাড়ি-ব্লাউজ। সেই ফুটপাতি জামা পরেই ট্যাস দাদা আর তার সদ্য জোটা প্রেমিকার সাথে গেছিলাম ফোরাম মলে সিনেমা দেখতে। যে বান্ধবী আবার কাকতলীয়ভাবে আমারই ক্লাসমেট, তাকে বাড়ি থেকে বের করে আনার ফন্দি এটেছিল দাদা, আর আমিই ছিলাম এই দুঃসাধ্য কাজ উতরে দেওয়ার জন্য দাদার পয়লা পছন্দ। পুজোর প্রেম দেখার সেই আমার প্রথম অভিজ্ঞতা। সিনেমা বা বইয়ের পাতা নয়, একেবারে রিয়াল লাইফে ঘটকালি যাকে বলে। পরে বুঝেছিলাম কাল হো না হোর শাহরুখের মতো এই বলিদানের কোনো প্রয়োজন ছিল না। বাড়ি থেকে বেরোবার অনুমতি যখন পাওয়াই গেছে তখন অন্যের প্রেমে ধুনো দিয়ে লাভ কী!

যখন ক্লাস নাইনে পড়ি, তখন থেকে দুর্গাপুজোয় পেলাম অবাধ স্বাধীনতা। আমার বান্ধবীরা যখন নানা অজুহাতে অন্তত সকালটা বেরোনোর চেষ্টায় ব্রতী, কারফিউ আছে বিকেল পাঁচটা অব্দি, আমি তখন এক্কেবারে খাঁচা ছাড়া পাখি। আর এক বান্ধবীকে বগল দাবা করে সেবার সাউথে ঠাকুর দেখেছিলাম। মাথায় অঞ্জলির (কাজল অভিনীত) মতো কাপড়ের হেয়ার ব্যান্ড, চোখে মুখে ব্র্যান্ডহীন, নামহীন আই লাইনার, লিপস্টিক আর সাথে ছোট্ট ভ্যানিটি ব্যাগ। রাস্তাঘাট কিছুই চিনি না, তাই যেদিকে ভিড় যাবে, সেদিকেই আমরা যাবো, এই ছিল ষষ্ঠী সপ্তমীতে আমাদের ফুল প্রুফ প্ল্যান। দুদিন ঘোরার পর হঠাৎ মনে হলো সকলে তো প্রেম করে, আমরা কেন বাদ যাবো? স্কুলের যে দুজনকে আমরা চোখে হারাতাম তারা একই বাসে যেত, কাছাকাছি থাকতো। তাই তাদের বাড়ির আশেপাশেই ঠাকুর দেখতে হবে; যদি কোনোভাবে ভুল করে দেখা হয়ে যায়। এতো ফন্দি ফিকির করে যদিও কোনো লাভ হয়নি শেষ পর্যন্ত। পনেরোর যুবারা যে আমাদের মেয়েদের থেকে অনেক বেশি ঘুরে দেখেছে শহরটাকে, পুজো মানে তারা বাড়ির সামনে ঘুরঘুর না করে সবচেয়ে দূরের ঠাকুরটাই দেখতে যাবে, এ কথা আমাদের কাঁচা মাথায় ঢোকেনি তখন। দুজনেই ঝাল মুড়ি খেয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম কাঁচুমাচু মুখে। পুজোয় পছন্দের মানুষকে না দেখার আফসোস যদিও পরের বছরই মিলিয়ে গেছিল। ইতিমধ্যে প্রেম নিবেদন, আবেদন হয়ে গিয়ে ক্রমশ আঠেরোর দিকে পা বাড়াচ্ছি। ক্লাস টেন মানে বন্ধুরা একসাথে বেরোবো, যুগলদের আর আলাদা করে চেনার উপায় নেই। দুর্গাপুজোর এটাই মজা, ভিড়ে মিশে দারুন সময় কাটানো যায়।

এরপর থেকে পুজোর প্রেম মানে ম্যাডক্স স্কোয়ার, সেখানে মীর আর অঞ্জন দত্তের কনসার্টে হাতে হাত রাখলে কিছুই আর দেখা যায় না বাইরে থেকে। কলেজে উঠে প্যান্ডেল হপিং কমলো আর বেড়ে চললো খাওয়া দাওয়া, আড্ডা মারার লম্বা লিস্টি। ২০১১ সালের পর থেকে কলকাতা শহরে ক্যাফের সংখ্যা হুহু করে বাড়তে লাগলো। এমনি সময় ক্যাফেতে যাওয়ার পকেট বা সাহস কোনোটাই ছিলনা, কিন্তু পুজোর ব্যাপারটা আলাদা। স্কুলে পড়াকালীন যেমন কটা ঠাকুর দেখা হল সেই প্রশ্নই ছিল মুখ্য, কলেজে উঠে বন্ধুদের সাথে দেশপ্রিয়তে গল্প, পুজোর সিনেমা, কিংবা কোথায় খেতে যাওয়া হবে সেই কথাই ভেবে চলতাম। এই সময় থেকেই কলকাতার পুজো এক্কেবারে বদলে গেল। ১৮ বছর বয়স মানেই হাতে একটা ডি এস এল আর, অজস্র বিউটি পার্লার, অভিনেত্রীদের মত পিন স্ট্রেট চুল; মানে সেলুলয়েডে আমরা যা যা দেখি, সেগুলো সবই হাতের নাগালে পাওয়ার লোভ। পুজোর ফেস্টুনে এ লি ডি টিভি আসছে; স্মার্ট ফোন, সেলফি, প্রেমিক যুগলের হাসি কান্না, ঝগড়া সবই প্রকাশ্য বাজারে ঘুরে বেড়াতো লাগলো। এটাও মনে হলো যে উৎসব মানে শুধু প্রেমটেম, মিলন আবহ নয়, দুর্গাপুজোয় ব্রেক আপও নাকি হাল ফ্যাশনের মধ্যে পড়ে। অনেক বন্ধুরা পুজোয় একটা প্রেম চাই বলে জুটি খুঁজতো। ক্ষণস্থায়ী সম্পর্ক, যতদিন চলতে পারে চলুক, তারপর টাটা বাই বাই।

দুর্গাপুজোয় সম্পর্কে ইতি টানা নিয়ে মনে পড়ে দুটো সিনেমার কথা। ঋতুপর্ণ ঘোষের উৎসব আর অপর্ণা সেনের পরমা। কলেজে পড়াকালীন দেখেছিলাম উৎসব, দুর্গাপুজোকে নেপথ্যে রেখে দুটো জুটির রাগ অভিমান, অবদমনকে কী সুন্দর ভাবে দেখিয়েছিলেন পরিচালক। একটি দৃশ্য আমার মনে ভীষণভাবে গেঁথে আছে। বিজয়ার দিন প্রণাম করতে এসেছে দীপঙ্কর দে, যার সাথে অজাচারি সম্পর্কের রটনা রয়েছে বাড়ির মেজ মেয়ের। খুব অল্প আলোয় বাড়ির দালানে দাঁড়িয়ে এক নারী ও পুরুষ, পুজোর শেষে বিষাদ মাখা গন্ধে তাদের পুরোনো সম্পর্কের ছাই যেন আজও মৃদু মৃদু জ্বলছে। বিরহ আর শারদোৎসবকে যে এক সূত্রে বাঁধা যায়, সেই দৃশ্যকল্প এঁকে গেছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। পরমা সিনেমায় আবার গল্পের শুরুতেই দুর্গাপুজো। মুকুল শর্মা যেখানে পরমা ওরফে রাখী গুলজারকে প্রথম লক্ষ্য করলেন, সেই ক্ষেত্রটাই তৈরি হচ্ছে শারদোৎসবকে কেন্দ্র করে। মায়ের কাছে শুনেছি ১৯৮৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত পরমাকে বলা হতো অ্যাডাল্ট ফিল্ম। আমি যখন দেখি, তখন মনে হয়েছিল transgressive love বা সমাজবিরুদ্ধ প্রেমকে খুব সন্তর্পণে অপর্ণা সেন একটু একটু করে উন্মোচন করেছেন গল্পে। যার প্রথমেই দুর্গাপুজো, তারপর আস্তে আস্তে পরিবার থেকে ব্যক্তিগত, পুজোর যৌথতা থেকে নিজস্ব সুখ কিংবা বনেদী বাড়ির বৌমা থেকে দামাল প্রেমিকা। এই ধীর পরিবর্তন দেখানোর জন্য চিরাচরিত দুর্গাপুজো যেন একটা স্টার্টিং পয়েন্ট বা সূচনালগ্ন তৈরি করে চিত্রনাট্যে। বারবার মনে হয় প্রেমকে নানা রূপে দেখানোর জন্য কেন বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবকে বেছে নিয়েছেন পরিচালকরা। শুধু প্রেম নয়, কলঙ্কের প্রেম, সীমালঙ্ঘনকারী প্রেম; আবারও ফিরে যাই উৎসব সিনেমায়। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে অজাচারী সম্পর্ক দেখানো হয়েছে, তাও আবার এত গভীর, নিপুণভাবে, দুর্গাপুজোর প্রেক্ষাপটে, এমন উদাহরণ শুধুমাত্র এই সিনেমার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। শুধু দীপঙ্কর দে ও মমতা শঙ্করের জুটি নয় বরং জয় আর শম্পার (অর্পিতা চ্যাটার্জী অভিনীত) উৎসব জুড়ে খুনশুটি, রাগ, অভিমান প্রেমের এক অন্য সমীকরণ তৈরি করে। আমরা দর্শকরা আমাদের চিরাচরিত মূল্যবোধ দিয়ে অগ্রাহ্য করতে থাকি এমন সম্পর্ককে, কিন্তু সহজাত মনের মিল এড়াতে পারিনা কেউই। প্রেমের আবার শ্লীল অশ্লীল হয় নাকি, সামাজিক, অসামাজিক হয় কিনা, এই প্রশ্ন করতে থাকি নিজেকে। পুজো শেষ হয় দশমীতে, অনেক জট খোলে, অনেকগুলো বন্ধই থেকে যায়। এই সিনেমাগুলো আমাদের জীবনের মতনই এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করে। দুর্গাপুজো আসে যায়, ভাবতে বসি পুরনো স্কুল কলেজের দিনগুলি। পুজোর প্রেম, পুজোর বন্ধুতা, যাদের সাথে আর দেখা হবেনা কোনোদিন। কেউ হয়তো নেই শহরে, কারুর সাথে সম্পর্কের ইতি টেনেছি নিজেরাই। তবু পুজোর এই পাঁচদিন যেন গতে বাঁধা, হারিয়ে না যাওয়া গ্যাস বেলুনের মত। সবকিছু পাল্টে যায়, কিন্তু পঞ্চমী থেকে দশমী আসবে চিরটাকাল, এই থেকে যাওয়া নিয়েই এগিয়ে যাই আগামীতে।

