ধর্ম কারো হোক না হোক, উৎসব যেন সবার হয়

৭১ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

ছোটবেলা থেকেই একটা কথা শুনে আমরা বড় হয়েছি ” ধর্ম যাঁর যাঁর, উৎসব সবার”। এই বছর হঠাৎ করেই এই ভাবনাটা কেমন যেন পাল্টে যাচ্ছে। পাল্টে যাচ্ছে বলা ভুল, পাল্টানোর চেষ্টা হচ্ছে। শোনা যাচ্ছে, নতুনভাবে ধর্ম যাঁর উৎসবও তাঁর। ২০২৬ সালের দুর্গা পুজো আসতে আর খুব বেশি হলে কয়েকটা দিন বাকি, কিন্তু কোথাও যেন কাশফুলের সেই আগমনী ভাবটা নেই। কোথাও যেন সবাই খুব বেশি খুশি নেই। অভাব আগেও ছিল এখনও আছে কিন্তু তা সত্ত্বেও বলা যায় কী যেন একটা নেই। যাঁরা রাস্তাঘাটে বেরোচ্ছেন, দোকান বাজারে যাচ্ছেন কিম্বা নিদেন পক্ষে পুজো উপলক্ষে সামাজিক মাধ্যমে নতুন নতুন রিল বানাচ্ছেন পোস্ট দিচ্ছেন, তাঁরা অনেকেই স্বীকার করবেন যে এই বছর কলকাতায় কী যেন একটা নেই। কারণটা কী, সেটাও আমাদের জানা নেই কিন্তু এই অস্বস্তি বোধ এই একটা চাপা আতঙ্ক, ভয় কেমন যেন কলকাতাকে ঘিরে রেখেছে মনে হচ্ছে।

মানুষ ধর্ম মানুক অথবা না মানুক, এই সময়টাতে মানুষের মধ্যে যে বিদ্বেষগুলো আছে সেগুলো কেটে গিয়ে একটা ভালো লাগা তৈরি হয়। আর এই বছর দেখা যাচ্ছে, খাওয়া থেকে শুরু করে, বই নিয়ে বসা, প্রগতিশীল বইয়ের সম্ভার নিয়ে দোকান দেওয়া, সেগুলো নিয়েও চর্চা শুরু হয়েছে। বাঙালি কোনদিনই খুব বেশি ধর্ম নিয়ে গোঁড়ামি করেছে এমনটা নয়। আমাদের বাড়িতে মা ঠাকুমারাও পুজো করেছেন বা এখনও করেন কিন্তু তাদের মধ্যে এত উচ্চকিত ধর্ম ছিল না কিংবা নেই। একটু খোঁজ নিলেই দেখা যাবে অনেক বাড়িতে অনেক বয়স্ক মহিলারা আছেন যারা রোজ নিয়ম করে গীতা পড়েন নিয়ম করে তুলসী তলায় প্রদীপ দেন, লক্ষ্মীর পাঁচালী পড়েন, কিন্তু তারা সেই ধর্মটাকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন না। সেটা তাদের অন্দরমহলেই আছে। ঘরের মধ্যে একটা ঠাকুর ঘর থাকে, জায়গার সংকুলান হলে একটা ঠাকুরের আসন থাকে, তাঁরা পুজো দেন, কিন্তু কোনদিনই খুব বেশি উচ্চকিত হয়ে আমরা ধার্মিক আমরা ধার্মিক তা বলেন না। এবার কোথায় যেন একটা অনেক বেশি ধর্ম চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় আসছে। কিন্তু এই বাংলা এই কলকাতা শহর তো শুধুমাত্র হিন্দুদের করা দুর্গাপুজোর জন্য নাম হয়নি। এই শহরটা আসলে অনেক মানুষকে আশ্রয় দেয়। এই শহরের আনাচে-কানাচে অনেক ধর্মের অনেক জাতির অনেক বর্ণের মানুষ বাস করেন এবং তারা একসাথেই বাস করে এসেছেন, আজকে হঠাৎ করে তাদের মধ্যে বিভেদ করতে চাইলে সেটা তো শহরটাও মেনে নেয় না সেটা তো সেই শহরের মানুষ কিংবা সেই রাজ্যের মানুষও মেনে নেয় না। সেই জন্যই কি মানুষগুলোর অভিমান হয়েছে? সেই জন্যই কি তাঁরা এই “ধর্মীয়” সামিল হতে, কুন্ঠা বোধ করছেন?

বাংলার পুজোয় ধর্মের মিলন

শোনা যাচ্ছে পার্ক স্ট্রিটে এবার একটা বড় জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপুজো হচ্ছে। কেন হচ্ছে? না ওই অঞ্চলটাতে আজ পর্যন্ত কোনদিন দুর্গাপুজো হয়নি কিন্তু ওই অঞ্চলটাতে বড় দিন পালিত হয় বলে দুর্গা পুজোও নাকি ওখানেই করতে হবে। তো সেটা হতেই পারে, কিন্তু আমরা কি জানি এই কলকাতার মধ্যে এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে দুর্গা পুজোটা নানান সম্প্রদায়ের মানুষ মিলে করেন? এই জন্যই দুর্গাপুজোকে উৎসব বলে। কলকাতার খিদিরপুরের ওয়াটগঞ্জ অঞ্চলের একটি ছোট্ট জায়গার নাম মুন্সিগঞ্জ। মূলত বন্দর এলাকা ছিল। একটা সময় ওই বন্দরে জাহাজ নোংড় করা হত, আর সেই জাহাজ থেকে যারা এই শহরটাই প্রবেশ করতেন তাদের অনেকেই ছিলেন শ্রমিক। ভিন রাজ্য থেকে তারা আসতেন। ওই মুন্সিগঞ্জ অঞ্চলে একটা ছোট যৌনপল্লী আছে। ওই ভিন রাজ্যের শ্রমিক এবং খালাসীরা ওই যৌনপল্লীতে যেতেন। একটা সময় গমগম করত ওই অঞ্চলটা। তারপরে কারখানা বন্ধ হয়েছে জাহাজ আসা বন্ধ হয়েছে, কিন্তু ঐ অঞ্চলে একটা দুর্গাপুজো হয় সেটা কিন্তু বন্ধ হয়নি। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে ঐ দুর্গা পুজোটি যারা করেন মানে দুর্গাপূজার কাজটি যারা করেন তারা শুধু হিন্দু নয়। মুসলমান মানুষ, শিখ মানুষ এবং ঐ যৌনপল্লীর মহিলারা মূলত নিজেদের উদ্যোগে এই পুজোটি করে চলেছেন। খিদিরপুরের ফাইভ স্টার ক্লাব দুর্গাপুজো। আশ্চর্যের বিষয় পুজোর আগে যে নবরাত্রি পালন হয় যদিও বাঙালিরা খুব একটা নবরাত্রি নিয়ে ভাবিত নয় কিন্তু ওখানে যে মুসলমান মানুষ জন আছেন তারা ওই নবরাত্রি সময়টাতে নিরামিষ খান, এবং তারপরে তারা পুজোর কাজ করেন।

বিকাশ সিংহ, আব্দুল, বলবন্ত এই মানুষেরা মিলেমিশেই এই পুজোটা করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে। আমাদের মত কিছু মানুষ ওই পুজোটার খোঁজ পেয়ে তাদের একজন দুজনের ব্যাংকের একাউন্ট নাম্বারে কিছু সাহায্য করার চেষ্টা করে এসেছে অনেকদিন। এই বছর তারা সরকারের কাছেও আবেদন করেছে অনুদান পাওয়ার জন্য কিন্তু এখনও পর্যন্ত জানা যায়নি সরকার এই আবেদনে সাড়া দেবে কি দেবে না। আসলে এটা তাদের যৌথ যাপন, এটা তাদের শিখিয়ে দিতে হয় না। বহু মানুষ ওই পুজোতে গিয়ে খোঁজ নিয়ে তাদের সাহায্য করেন। ওই যৌনপল্লীর বাড়ির ছেলে-মেয়েদের জামা কাপড় দিয়ে আসার চেষ্টা করেন। এই ভাবেই চলে আসছে। এই বছর আবার যৌনপল্লীর মহিলাদের পেশা এবং রুজিতে কিঞ্চিত টান পড়েছে। টান পড়েছে সেই কোভিডের সময় থেকেই কিন্তু এই বছর ভোটের কারণে বেশ কিছু মহিলার নাম বাদ গেছে, ফলে তারা অন্য কোথাও চলে গেছেন।

যৌনপল্লী মুন্সিগঞ্জের দুর্গা মায়ের বিসর্জন

কলকাতায় এমন উদহারণ আরও আছে। খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা গেল মধ্য কলকাতার বিখ্যাত মহবম্মদ আলী পার্কের পুজো কমিটির সদস্য পাপ্পু সামসি। দীর্ঘদিন ধরে এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত। শেষ মুহূর্তে পুজোর অন্য সংগঠকদের সঙ্গে এই পাপ্পু সামসিকেও পাওয়া যায়। ২০১৭ সালে মোহাম্মদ আলী পার্ক দুর্গাপূজা কমিটির ৭০০ সদস্যের মধ্যে প্রায় ১০০ জন ছিলেন মুসলমান। অর্থাৎ শুধুমাত্র তারা উৎসবে সামিল হচ্ছেন এমনটা নয়। তারা এই উৎসবের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে থাকছেন। এটাই তো উৎসবের সঙ্গে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ফারাক। মোহাম্মদ নাদির ও মোহাম্মদ নিসার কলকাতার ছাতা গলির দূষধ সেবা সংঘের সদস্য, ছোটবেলা থেকেই তাঁরা দুর্গাপুজোর প্রস্তুতিতে কাজ করছেন। ওই দুষধ সেবা সংঘের সম্পাদক রোশান রানার কথা অনুযায়ী মহরমের তাজিয়ার সময় হিন্দু মুসলমান একসঙ্গে থাকেন আবার দুর্গাপূজার সময়তেও তাঁরা একসঙ্গে চাঁদা তুলতে বেরোন। মুন্সীগঞ্জের মানুষজনের সঙ্গে কথা বলেও এই একই ছবি পাওয়া যায়।

বাংলায় এরকম অনেক উদাহরণ আছে। গ্রামেগঞ্জে তো বটেই, শহর কলকাতাতেও। এই উৎসবটা সবার। এই উৎসব থেকে এই মানুষগুলোকে বাদ দিয়ে দিলে উৎসবের প্রাণটা থাকে না দেহটা পড়ে থাকে। এবার কেমন যেন মনে হচ্ছে কলকাতা শহরের প্রাণটা নেই। সে তার নিজের মতো করে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছেনা। এটি শুধুমাত্র সামাজিক সমীকরণের জন্য হচ্ছে এমনটাও কিন্তু নয়। অর্থনৈতিক কারণও যথেষ্ট আছে, সারা দেশে যেমন মানুষের টাকা পয়সার সংকুলান নিয়ে সমস্যা হচ্ছে তেমনি এই রাজ্যেও হচ্ছে। সেইখান থেকেও মানুষ খুব বেশি বহিঃমুখী হতে পারছেন না, সামিল হতে পারছেন না হয়তো। এই সময়টা তো ছিল বেঁধে বেঁধে থাকার। দেশভাগের পরে মানুষ অত্যন্ত ভীত ছিল, তখনই এসেছিল উৎসব। সেই ভয় কাটিয়ে সমস্ত জাতি সমস্ত ধর্মের মানুষজন সামিল হয়েছিল উৎসবে। যাঁদের ভরসা দেওয়ার কথা ছিল, তারাই যদি ভয়ের সঞ্চার করেন, সব মানুষ তাহলে উৎসবে সামিল হয় কি করে? ধর্ম কারো হোক না হোক উৎসব যেন সবার হয়।

১৯০৮ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন “শারদোৎসব” নাটকটি। সেদিনের লক্ষীশ্বর যেমন চেষ্টা করেছিলেন যাতে সমস্ত মানুষ উৎসবে সামিল না হতে পারে এবং তার বিরুদ্ধে কীভাবে বাঙালির উৎসবকে সর্বধর্ম নির্বিশেষে পৌঁছে দেওয়া যায় রবীন্দ্রনাথ সেদিন সেইটুকুই চেষ্টা করেছিলেন। সেদিন তার ঐ নাটকটি হয়ে উঠেছিল সম্প্রীতির দ্যোতক। আজকে এত বছর পরে আবার আমাদের সেই প্রাণের ঠাকুর রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করতে হচ্ছে। আসলে দীর্ঘদিন আমরা রবীন্দ্রনাথকে দেবতার আসনে বসিয়েছি। কিন্তু তাঁর কথাগুলোকে যদি আত্মস্থ না করতে পারি তাহলে আর লাভ কী হল? এখনই রবীন্দ্রনাথ পড়ার সময়, ফিরে দেখার সময়।

অন্যান্য প্রতিবেদন.