দিল্লির রাস্তায় নামল ‘চলমান জেলখানা! আন্দোলন মোকাবিলায় নয়া পন্থা দিল্লি পুলিশের

১০ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

গণতন্ত্র, ভিন্নমত ও নাগরিক অধিকারের পরিসর সঙ্কুচিত হওয়ার সাম্প্রতিক প্রবণতা কোন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, দিল্লির রাজপথে প্রবর্তিত ‘চলমান জেলখানা’ বা ‘মোবাইল প্রিজন’-এর ব্যবহার তার দৃষ্টান্ত। ​দিল্লির সাম্প্রতিক ছাত্র বিক্ষোভে সাধারণ পুলিশ বাসের পরিবর্তে হাই-সিকিউরিটি প্রিজন ভ্যান বা চলমান জেলখানা ব্যবহার করা হয়েছে। সাধারণত সন্ত্রাসবাদ, গণহত্যামূলক অপরাধ বা হাই-প্রোফাইল কুখ্যাত অপরাধীদের স্থানান্তরের জন্য এই ধরনের বিশেষ গাড়ি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কিন্তু সেই একই কড়া নিরাপত্তাবলয়যুক্ত ও দমবন্ধকর গাড়ি যখন ১৮-১৯ বছরের তরুণ ছাত্র-ছাত্রী বা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক কর্মীদের দমনের জন্য ব্যবহার করা হয়, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে রাষ্ট্রশক্তি আজ নিজের নাগরিকদেরই সম্ভাব্য শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করেছে।


​গণতান্ত্রিক আন্দোলনের চরিত্র এবং তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক সক্রিয়তাকে সরকার এক গভীর হুমকি হিসেবে দেখছে। শনিবারের বিক্ষোভে সাধারণ পুলিশের বাসে তোলার পর বহু ছাত্র-ছাত্রী সুযোগ বুঝে বেরিয়ে যাওয়া এবং পুনরায় বিক্ষোভে সামিল হওয়ার ঘটনা প্রশাসনের প্রশাসনিক দুর্বলতা বা কৌশলগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু সেই ব্যর্থতার মোকাবিলা করতে গিয়ে সরকার যে পথ বেছে নিয়েছে, তা চরম অগণতান্ত্রিক। পালানোর পথ বন্ধ করতে জানালা আটকে দিয়ে লোহার সেল ও দুই স্তরের গেটযুক্ত ভ্যান নামানো হয়েছে।


​এই পুরো ব্যবস্থার পরিচালনভার দিল্লি পুলিশের হাত থেকে সিআরপিএফ-এর হাতে তুলে দেওয়ার মাধ্যমে একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলার স্বাভাবিক পরিধি পেরিয়ে রাজনৈতিক প্রতিবাদের ক্ষেত্রে আধাসামরিক কায়দায় বলপ্রয়োগের এই প্রবণতা প্রমাণ করে যে, সরকার ভিন্নমতকে আলোচনার টেবিলে বা আইনি কাঠামোর মধ্যে সমাধান করতে ইচ্ছুক নয়। বরং বলপ্রয়োগ ও শক্তির প্রদর্শনই তাদের প্রধান নীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।


​এই মোবাইল প্রিজনগুলির অভ্যন্তরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকে মারাত্মকভাবে নাড়া দেয়। পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না করা দমবন্ধকর পরিবেশ, গাদাগাদি করে মানুষ রাখা এবং তার পাশাপাশি শারীরিক নির্যাতন, অকথ্য গালিগালাজ ও ধর্মীয়-জাতিগত আক্রমণের যে অভিযোগ আন্দোলনকারীরা তুলেছেন, তা ফ্যাসিবাদী শাসনপদ্ধতির লক্ষণ স্পষ্ট করে।


​এই প্রেক্ষাপটে প্রবীণ বাম নেতা এম এ বেবি, বৃন্দা কারাত, আইসা নেত্রী নেহা বোরাসহ বিভিন্ন ছাত্রনেতার গ্রেপ্তার এবং মোবাইল প্রিজনের ভেতর থেকে তাঁদের দেওয়া ভিডিও বার্তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন যে, কোন গভীর দুর্নীতি বা অপরাধমূলক ব্যর্থতাকে ঢাকতে মোদী সরকার দেশের সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে এই ধরনের যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি তৈরি করছে? আসলে, যখনই কোনো শাসকগোষ্ঠী জনগণের অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক প্রশ্নের মুখে পড়ে এবং জনসমর্থন হারাতে শুরু করে, তখনই তারা পুলিশি রাষ্ট্র বা পুুলিশ তন্ত্রের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে দেয়।


​দিল্লির এই ঘটনা কেবল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের আন্দোলন দমনের চিত্র নয়; এটি ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং সাংবিধানিক মৌলিক অধিকারের ওপর এক সরাসরি আঘাত। বাসকে জেলখানায় রূপান্তরিত করে নাগরিকদের কণ্ঠ রোধ করার এই রাজনীতি দেশের গণতন্ত্রকে এক অন্ধকার সুড়ঙ্গের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ভিন্নমতকে দেশদ্রোহিতা হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার এই সংস্কৃতি কেবল রাজনৈতিক বিরোধীদের নয়, বরং দেশের সামগ্রিক সামাজিক স্থায়িত্ব ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকেই চরম সংকটের মুখে ফেলছে। জনগণের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারকে পদদলিত করে এই ধরনের ভয়ের রাজত্ব কায়েম করে যে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান পাওয়া যায় না, ইতিহাসের পাতা বারবার তারই সাক্ষ্য দিয়েছে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.