পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক ঘোষণায় রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা ‘মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন’ সম্পূর্ণভাবে তুলে দিয়ে সমস্ত শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া স্কুল সার্ভিস কমিশনের (SSC) একক কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করে ২৫২টি মাদ্রাসা বন্ধের নির্দেশ এবং ১০০টি মাদ্রাসাকে শোকজ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের নেপথ্য রয়েছে বহুমুখী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমীকরণ।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিচার করলে দেখা যায়, ২০০৮ সালে বামফ্রন্ট আমলের পর থেকে রাজ্যে পৃথক মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন আইনের মাধ্যমে সংখ্যালঘু মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগ হয়ে আসছিল। বর্তমান সরকারের এই নতুন সিদ্ধান্ত সেই স্বতন্ত্র কাঠামোর অবসান ঘটিয়ে ‘এক দেশ, এক নিয়োগ কাঠামো’ বা সাধারণ নিয়মের ধাঁচে পুরো প্রক্রিয়াটিকে নিয়ে এল। সরকারের যুক্তি, এর ফলে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বৈষম্য দূর হবে এবং সাধারণ স্কুল ও মাদ্রাসা উভয়ের ক্ষেত্রেই অভিন্ন স্বচ্ছতা বজায় রাখা সম্ভব হবে। চাকরিপ্রার্থীদেরও আর আলাদা করে দুটি পৃথক পর্ষদের জন্য প্রস্তুতি বা দৌড়ঝাঁপ করতে হবে না।
ঘোষণাটি বাস্তবায়িত করতে রাজ্য বিধানসভায় প্রয়োজনীয় বিল এনে বিদ্যমান এসএসসি আইনে সংশোধন আনা হবে। আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার পরই নতুন নিয়মে যৌথ বা অভিন্ন পরীক্ষা ও নিয়োগ প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আলাদা কমিশনের জন্য যে পরিকাঠামোগত খরচ ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতো, এই একত্রীকরণের ফলে তা বহুলাংশে হ্রাস পাবে।
এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিকটি হলো শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। সংখ্যালঘু কল্যাণ ও মাদ্রাসা শিক্ষা দফতরের সমীক্ষার ভিত্তিতে ২৫২টি অনুমোদনহীন মাদ্রাসা বন্ধের নির্দেশ এবং ১০০টি মাদ্রাসাকে শোকজ করার ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একাংশের মতে, অতীতে বাম ও তৃণমূল সরকারের আমলে মাদ্রাসাগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও অনুমোদন নিয়ে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। বর্তমান প্রশাসনের এই কড়া পদক্ষেপ শিক্ষা ক্ষেত্রে ভুঁইফোড় বা বেনিয়ম প্রতিষ্ঠানের দৌরাত্ম্য খর্ব করতে সাহায্য করবে। তবে রাজনৈতিক মহলে এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে তীব্র তরজা শুরু হয়েছে। সমালোচকদের একাংশ একে সংখ্যালঘু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধিকার খর্ব করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন৷
সর্বোপরি, মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের বিলুপ্তি এবং এসএসসির সঙ্গে তার মার্জ করার সিদ্ধান্তটি কেবল একটি সাধারণ প্রশাসনিক রদবদল নয়, এটি রাজ্যের সামগ্রিক শিক্ষা নীতি ও রাজনৈতিক মতাদর্শগত রূপবদলেরই প্রতিফলন। আইনি জট কাটিয়ে এই যৌথ নিয়োগ পদ্ধতি কতটা দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব রাজ্যের লক্ষ লক্ষ চাকরিপ্রার্থীর ভাগ্যে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

