রাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক একটি নির্দেশিকাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষামহল ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। ইউডাইস প্লাস (UDISE+) পোর্টালে প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, রাজ্যে চার হাজারের বেশি এমন সরকারি বিদ্যালয় রয়েছে যেখানে একজনও ছাত্রছাত্রী নেই। এই প্রেক্ষাপটে, নবান্নের পক্ষ থেকে সমস্ত জেলাশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ওই শূন্য স্কুলগুলির জমি, ভবন ও অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তির বিশদ মূল্যায়ন বা ‘স্টক টেকিং’ করতে। প্রশাসনিক স্তরে এই সম্পত্তিগুলির সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারের কথা বলা হলেও, বিরোধীরা একে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেসরকারিকরণ ও পরিকাঠামো বিক্রির সুদূরপ্রসারী ছক হিসেবে দেখছেন।
গত আগস্ট মাসে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের প্রকাশিত তথ্যে সামনে আসে যে, পশ্চিমবঙ্গের ৪,১৩৩টি সরকারি স্কুলে কোনো ছাত্রছাত্রী নেই। এই পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে আসার পর নবান্ন থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয় থেকে বিদ্যালয় শিক্ষা দপ্তরের কাছে পাঠানো চিঠির ভিত্তিতে গত সপ্তাহে রাজ্যের স্কুল শিক্ষা দপ্তরের অতিরিক্ত মুখ্যসচিব সমস্ত জেলাশাসক এবং কলকাতার মিউনিসিপ্যাল কমিশনারকে নির্দেশিকা পাঠান।

এই নির্দেশিকা অনুযায়ী জেলাশাসকদের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠিত হয়েছে। এই কমিটি প্রতিটি ছাত্রশূন্য স্কুলে গিয়ে সেখানকার ক্লাসরুম, ভবন এবং জমির পরিমাণ ও বর্তমান বাজারদর মূল্যায়ন করবে। প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে, এই সম্পত্তিগুলিকে কোনো কল্যাণমুখী প্রকল্প, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা প্রাণী সম্পদ বিকাশ দপ্তরের কাজে লাগানো হতে পারে, কিংবা পিপিপি (PPP) মডেলে বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম বা অন্য কোনো সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার বিকল্প চিন্তাও রয়েছে। আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এই সংক্রান্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী দল ও ছাত্র সংগঠনগুলির অভিযোগ, গ্রামীণ ও প্রান্তিক স্তরে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে সরকার স্কুলগুলি বন্ধ করে দেওয়ার পাকাপাকি বন্দোবস্ত করছে। এসএফআইসহ বিভিন্ন বামপন্থী ও বিরোধী দলগুলির দাবি, সরকারি স্কুলের এই বেসরকারিকরণ সাধারণ মানুষের মৌলিক শিক্ষার অধিকারকে সংকুচিত করবে।
অন্যদিকে, রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার মান নিয়ে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। শাসকদলের শীর্ষ নেতৃত্বও স্বীকার করেছেন যে জাতীয় স্তরে রাজ্যের স্কুল শিক্ষার অবস্থান পিছিয়ে পড়েছে এবং তা পুনরুদ্ধারে দীর্ঘ সময় লাগবে। এমন এক সময়ে ছাত্রশূন্য স্কুলগুলির পুনরুজ্জীবনের চেয়ে সেগুলির সম্পত্তি মূল্যায়ন ও পিপিপি মডেলের মাধ্যমে বেসরকারিকরণের ভাবনাকে শিক্ষাঙ্গনের অধিকারক্ষুণ্ণকারী পদক্ষেপ বলেই মনে করছেন সমালোচকরা।
একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রে শিক্ষার প্রসারে সরকারি বিদ্যালয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু জনস্বার্থের স্কুলগুলিতে পঠনপাঠন ফিরিয়ে আনার স্থায়ী কোনো রূপরেখা না দিয়ে সেগুলির সম্পত্তি বাণিজ্যিক বা পিপিপি মডেলে হস্তান্তরের ভাবনা রাজ্যের শিক্ষানীতিকে এক নতুন মোড়ে নিয়ে ফেলেছে। আগামী দিনে এই চার হাজারের বেশি ছাত্রশূন্য স্কুলের ভবিষ্যৎ কী হবে এবং জেলাশাসকদের কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে সরকার ঠিক কী পদক্ষেপ নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

