“-আমরা গয়া জেলায় বাস করি।
-ভারতবর্ষের নাম শুনেছ?
ভানুমতী মাথা নাড়িয়া জানাইল সে শোনে নাই। কখনও কোথাও যায় নাই চকমকিটোলা ছাড়িয়া। ভারতবর্ষ কোন দিকে?”
আরণ্যকের পটভূমি বিহারের পূর্ণিয়া জেলার অন্তগর্ত লবটুলিয়া জঙ্গল। আপাতদৃষ্টিতে এটি নদীর তীরবর্তী এক নির্জন, দুর্গম বন্য প্রান্তর।কিন্তু, এই লবটুলিয়া আসলে আপামর ভারতবর্ষেরই একটি সংক্ষিপ্ত মূর্ত চিত্র। ভারতের গ্রামীণ সমাজের বৈচিত্র্য, শোষণের ইতিহাস, বঞ্চনা, মানুষের সরলতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে জীবনের নিত্যসংগ্রাম—সবকিছুই যেন প্রতিফলিত হয়েছে এই লবটুলিয়ায় ।

ভারতের সমাজব্যবস্থার মূলে রয়েছে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের সন্ধান, আবার একই সঙ্গে রয়েছে শ্রেণিভেদের নির্মম বাস্তবতা। লবটুলিয়ার প্রান্তরে দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ এসে ভিড় জমিয়েছে। কেউ এসেছে পেটের টানে, কেউ বা সর্বস্ব হারিয়ে। কথক নিজে কলকাতার এক মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালি যুবক, যিনি জীবিকার তাগিদে এই প্রান্তরকে বন্দোবস্ত দেওয়ার কাজে নিযুক্ত হয়েছেন। এই লবটুলিয়ার বুকে দাঁড়িয়েই তিনি উপলব্ধি করেন, এই অরণ্য কেবল গাছপালা বা পশুর আশ্রয় নয়, এটি বহু মানুষের বিচিত্র জীবনের এক জীবন্ত রঙ্গমঞ্চ।ভারতের সমাজব্যবস্থার মতোই এই লবটুলিয়ায় রয়েছে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের সন্ধান, আবার একই সঙ্গে রয়েছে শ্রেণিভেদের নির্মম বাস্তবতা।
লবটুলিয়ার আদিবাসী সমাজ ভারতের শোষিত ও বঞ্চিত মূলবাসী জনজাতির প্রতীক ধাওয়ল ও রাজকি:। রাজকি তার সহজ সরল সৌন্দর্য ও বন্য মহিমায় অনন্য। অথচ এই আদিবাসীরাই সভ্যতার আগ্রাসনে তাদের চিরায়ত অধিকার হারাচ্ছে। তাদের সরল মনে লোভ নেই, আছে শুধু প্রকৃতির নিয়ম মেনে বাঁচার আকুতি।
অরণ্যের আদিম অধিবাসী ভুলু ও তাতাই, যারা সভ্য সমাজের স্পর্শ থেকে দূরে থেকেও তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই চালিয়ে যায়। তাদের জীবন সংগ্রাম আসলে আদিম মানবসভ্যতা থেকে আধুনিক যুগে উত্তরণের এক বেদনাদায়ক অধ্যায়।
মতিনা ও বেচনী। গ্রামীণ ভারতের নারীদের আত্মত্যাগ, সহনশীলতা ও নীরব বেদনার প্রতীক। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও কঠিন প্রকৃতির নিষ্ঠুরতার মাঝেও তারা বেঁচে থাকার আলো খুঁজে নেয়।
আধ্যাত্মিকতা এবং রহস্যময়তার প্রতীক নকুড় মিশ্র যেন ভারতের অন্তরাত্মার সন্ধান দেয়। জাগতিক মোহাচ্ছন্নতার ঊর্ধ্বে এক অদ্ভুত দার্শনিক শান্তিতে তার বাস, যা ভারতীয় সংস্কৃতির প্রাচীন রুহানিয়তের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

ভানুমতী৷ ভানুমতী অরণ্যের সন্তান। তার গতিবিধি, স্বভাব এবং জীবনযাপন প্রকৃতির সহজ নিয়মে বাঁধা। অরণ্যের দুর্গমতা, তার রহস্যময়তা এবং মুক্ত রূপ যেমন মানুষের মনকে এক অদ্ভুত টানে বেঁধে ফেলে, ভানুমতীর চরিত্রটিও ঠিক তেমনি। সে নাগরিক সভ্যতার কৃত্রিমতা ও জটিলতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত—ভারতের সেই আদিম রূপের প্রতিনিধি।কথক যখন মোহিতপুর ও ধবলগড় অঞ্চলের জঙ্গল কেটে বসতি গড়ার বা আধুনিকতার ছোঁয়া লাগানোর চেষ্টা করেন, তখন ভানুমতী যেন সেই আদিম প্রকৃতির অবয়ব হয়ে বারবার সামনে আসে—যাকে সম্পূর্ণ দখল করা যায় না৷ যান্ত্রিক সভ্যতার ছাঁচে ফেলা যায় না।ভারতীয় আবহমান সংস্কৃতির গভীরে যে আদিম প্রাণশক্তি, সৃষ্টি ও ধ্বংসের এক অমোঘ রহস্য লুকিয়ে আছে, ভানুমতীর অস্তিত্ব যেন সেই শাশ্বত জীবনপ্রবাহেরই স্মারক।
লবটুলিয়ার বিস্তার মানেই অরণ্য বিনাশ এবং তথাকথিত আধুনিক ‘সভ্যতা’র অনুপ্রবেশ। এস্টেটের লোভ, ইজারাদারদের শোষণ এবং মহাজনদের ঋণের জালে জর্জরিত সাধারণ মানুষ—এই সবকিছু মিলিয়ে লবটুলিয়া হয়ে ওঠে ব্রিটিশ ভারতের একটি মাইক্রোকসম বা ক্ষুদ্র প্রতিরূপ। জঙ্গল কেটে বসতি স্থাপন, আদিবাসীদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা এবং প্রকৃতির বুক চিরে মুনাফা অর্জনের যে দৌড় উপন্যাসে দেখা যায়, তা আধুনিক ভারতের শিল্পায়ন ও উন্নয়নের নামে চলা পরিবেশ ধ্বংসের ইতিহাসেরই পূর্বাভাস।
শেষতক তাই লবটুলিয়া কেবল একটি ভৌগোলিক স্থানে আবদ্ধ থাকে না, তা এক চিরন্তন মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক উপাখ্যানে রূপ নেয়। প্রকৃতির সুষমা এবং মানুষের আদিম প্রবৃত্তি যেখানে একাকার হয়ে যায়। লবটুলিয়ার ধুলোমাটি, হাওয়ার শব্দ, আর সেখানে বসবাসকারী বঞ্চিত মানুষগুলোর দীর্ঘশ্বাসের ভেতর দিয়েই যেন সমগ্র ভারতবর্ষের অবয়ব ফুটে ওঠে—যেখানে একদিকে রয়েছে অফুরান প্রাণশক্তি, অন্যদিকে রয়েছে অন্তহীন বঞ্চনা ও টিকে থাকার অমর সংগ্রাম।

