বিংশ শতকের বিশের দশক ভারতীয় রাজনীতি, সমাজ এবং সাহিত্যজগতে এক গভীর ও দূরপ্রসারী পরিবর্তনের কাল। একদিকে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের তীব্রতা, অন্যদিকে শোষিত, বঞ্চিত ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের আপসহীন লড়াই—এই দুইয়ের এক অনন্য যুগসন্ধিক্ষণে জন্ম নেয় একটি যুগান্তকারী মুখপত্র—’লাঙল’। ১৯২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে (২৫শে ডিসেম্বর, ১৯২৫) প্রকাশিত এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটির প্রাণকেন্দ্র এবং মূল চালিকাশক্তি ছিলেন বাংলার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। এটি কেবল একটি গতানুগতিক সাহিত্যিক পত্রিকা ছিল না, বরং এটি ছিল খেটে খাওয়া মানুষ, কৃষক এবং শ্রমিকের মুক্তির এক জোরালো রাজনৈতিক ও সামাজিক ইশতেহার।
১৯২৫ সালের শেষের দিকে বাংলায় শ্রমিক ও প্রজাদের অধিকার দৃঢ়ভাবে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে গঠিত হয় ‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ সম্প্রদায়’। এই রাজনৈতিক দলের মুখপত্র হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করেছিল ‘লাঙল’ পত্রিকা। পত্রিকার নামকরণের মাধ্যমেই এর মূল আদর্শ ও দর্শন স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল—’লাঙল’ হলো খেটে খাওয়া চাষির প্রতীক, যা শ্রমের সর্বোচ্চ মর্যাদা এবং উৎপাদনের ওপর শ্রমিকের নায্য অধিকারকে নির্দেশ করে।
সেকালে সাম্যবাদী ও সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা যখন ধীরে ধীরে ব্রিটিশশাসিত ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করছে, তখন নজরুল ও তাঁর সমমনস্ক বুদ্ধিজীবীরা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছিলেন যে, রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক মুক্তি এবং একটি শ্রেণিহীন সমাজ গঠন অত্যন্ত জরুরি। ‘লাঙল’ পত্রিকা সেই বিপ্লবী রাজনৈতিক দর্শনেরই মূর্ত প্রতীক হয়ে ওঠে, যেখানে বুর্জোয়া শোষণের বিরুদ্ধে প্রলেতারিয়েতের বা সর্বহারার কণ্ঠস্বর অত্যন্ত জোরালোভাবে উচ্চারিত হয়েছিল।

১৯২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর বড়দিনের দিন কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় ‘লাঙল’-এর ঐতিহাসিক প্রথম সংখ্যা। পত্রিকাটির প্রচ্ছদে বিশেষভাবে আঁকা থাকতো লাঙল কাঁধে এক আপসহীন কৃষকের ছবি, যা এর আদর্শকে ফুটিয়ে তুলত। প্রতিটি সংখ্যার শুরুতে চণ্ডীদাসের অমর বাণী— “শুনহ মানুষ ভাই-/ সবার উপরে মানুষ সত্য/ তাহার উপরে নাই”—মুদ্রিত থাকত, যা মানবতাবাদের এক অনন্য নজির।
প্রথম সংখ্যাটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাজুড়ে এক বিরাট চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। প্রায় পাঁচ হাজার কপি ছাপা হয়েছিল এবং তা মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সম্পূর্ণ বিক্রি হয়ে যায়। এই ঐতিহাসিক প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত হয় নজরুলের বিখ্যাত ও চিরকালীন সৃষ্টি—’সাম্যবাদী’ কবিতার অন্তর্ভুক্ত এগারোটি কবিতা। এই সৃষ্টির মাধ্যমেই কবি ঘোষণা করেছিলেন সর্বমানবতার চিরন্তন জয়গান:
”গাহি সাম্যের গান—
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!”
’সাম্যবাদী’ কবিতার পাশাপাশি এই সংখ্যায় এবং পরবর্তী সংখ্যাগুলোতে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘সর্বহারা’ ও অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের বিপ্লবী কবিতা এবং অজস্র গান। ‘লাঙল’-এর পাতার মাধ্যমেই নজরুল বাংলা সাহিত্যে সমাজচেতনাস্মরণী বামপন্থী ও সাম্যবাদী ধারার শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করেন।
তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনীতি, কার্ল মার্কস ও ভ্লাদিমির লেনিনের সাম্যবাদী মতবাদ এবং বিশ্বজুড়ে চলা মেহনতি মানুষের বিপ্লবের কথা নিয়মিত স্থান পেত এই পত্রিকায়।
বিখ্যাত রুশ লেখক ম্যাক্সিম গোর্কির কালজয়ী উপন্যাস ‘মা’ (নৃপেন্দ্রকিশোর চট্টোপাধ্যায়ের মাধ্যমে অনূদিত) এই পত্রিকাতেই ধারাবাহিকভাবে প্রথম প্রকাশিত হওয়া শুরু হয়। প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী ও লেখক যেমন সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, মুজফফর আহমেদ প্রমুখ নিয়মিত এই পত্রিকায় লিখে এর আদর্শকে আরও শাণিত করে তুলতেন।

’লাঙল’ পত্রিকা সাহিত্যকে কেবল নিছক বিনোদন বা মন ভোলানোর মাধ্যম হিসেবে দেখেনি, বরং একে বানিয়েছিল সমাজ পরিবর্তনের এক ধারালো হাতিয়ার। নজরুল দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে সাহিত্য তখনই সার্থক ও মহৎ হয়, যখন তা নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের বেদনার্ত হৃদয়ে আশার আলো জ্বালাতে পারে।
পত্রিকার সম্পাদকীয় ও প্রবন্ধগুলিতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শোষণ, দেশীয় জমিদারদের অত্যাচার এবং সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের দুরবস্থার চিত্র অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরা হতো।
খুব দীর্ঘস্থায়ী ছিল না ‘লাঙল’-এর পথচলা। আর্থিক সংকট, রক্ষণশীল সমাজের বাধা এবং রাজনৈতিক দলীয় নানা জটিলতার কারণে এটি বেশি দিন টিকে থাকতে পারেনি। ১৯২৬ সালের ১৫ই এপ্রিল এর পঞ্চদশ ও শেষ সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে এটি কমরেড মুজফফর আহমদের সম্পাদনায় প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘গণবাণী’ পত্রিকার সাথে একীভূত হয়ে যায়। স্বল্পায়ু হলেও বাংলা সাংবাদিকতা এবং বামপন্থী রাজনীতির ইতিহাসে এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী ও চিরস্মরণীয়।

