যে মাটিতে একদিন শিক্ষার আলো ছড়িয়েছিলেন বিদ্যাসাগর বা রবীন্দ্রনাথ, সেই মাটিতেই আজ শিক্ষক আছেন, কিন্তু একটিও ছাত্র বা ছাত্রী নেই—এমন স্কুলের সংখ্যা ৪ হাজার ১৩৩! এই সংখ্যাটি শুধু পরিসংখ্যানের মারপ্যাঁচ নয়, এটি এক গভীর নীতিহীনতার শ্বেতপত্র।
কেন্দ্রীয় রিপোর্টে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা যেকোনো শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে স্তম্ভিত করে দেবে।
দেশজুড়ে যেখানে পড়ুয়াশূন্য স্কুলের মোট সংখ্যা ৫ হাজার ৬৬৩, সেখানে একাই পশ্চিমবঙ্গ দখল করে রয়েছে প্রায় ৭৩ শতাংশ, অর্থাৎ ৪ হাজার ১৩৩টি স্কুল।আশ্চর্যের বিষয় হলো, পড়ুয়া না থাকা এই বিদ্যালয়গুলিতে বেতনভুক শিক্ষক-শিক্ষিকার সংখ্যা নেহাত কম নয়—কমপক্ষে ১৯ হাজার ৫০২ জন শিক্ষক সেখানে কর্মরত।
অন্যদিকে মুদ্রার উলটো পিঠে রয়েছে আরও এক করুণ ছবি। রাজ্যের ৬ হাজার ৭৬৯টি স্কুলে মাত্র একজন করে শিক্ষক শিক্ষাদান করছেন, অথচ সেই স্কুলগুলিতে পড়ুয়ার মোট সংখ্যা ২ লক্ষ ২৯ হাজার ৫৬৯।
২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষেই রাজ্যে এই সংখ্যাটি ছিল ৩ হাজার ২৫৪। পরের শিক্ষাবর্ষেই তা প্রায় ৯০০ বেড়ে পৌঁছে গেছে ৪ হাজার ১৩৩-এ। এমনকি গত বছর ওই শূন্য স্কুলগুলিতে ১৪ হাজার ৬২৭ জন শিক্ষক থাকলেও, এ বছর সেই সংখ্যা আরও স্ফীত হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে এই তালিকায় দেশের মধ্যে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে পশ্চিমবঙ্গ।
বিরোধীদের অভিযোগ, নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতা, সঠিক পর্ষদভিত্তিক শিক্ষক বদলি নীতির অভাব এবং প্রশাসনিক স্থবিরতার ফলেই রাজ্যের এই দুরবস্থা। অন্যদিকে, শাসক শিবিরের একাংশের পালটা যুক্তি, ভৌগোলিক অবস্থান, বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রাম বা পাহাড়ি এলাকায় জনবসতির পরিবর্তন এবং বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের প্রতি সাধারণ মানুষের অন্ধ ঝোঁক এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। কিন্তু এই রাজনৈতিক দড়িটানাটানির খেলায় পিষে যাচ্ছে প্রান্তিক গ্রামীণ শিক্ষা ব্যবস্থা।
শিক্ষার আলো ছাড়া কোনো জাতির মেরুদণ্ড সোজা থাকতে পারে না। পশ্চিমবঙ্গ আজ এক অদ্ভুত ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে। একদিকে স্কুলছুটের ক্রমবর্ধমান হার, অন্যদিকে পড়ুয়াহীন বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের অলস সময় কাটানো—এই দুইয়ের ভারসাম্যহীনতা দ্রুত সমাধান না করলে আগামী প্রজন্ম এক গভীর অন্ধকার সংকটের মুখে পড়বে।

