আম আদমির কিস্তি বনাম শিল্পপতির হাজার কোটি টাকা মকুব: সুভাষ চন্দ্রের রায়ে প্রশ্নবিদ্ধ করপোরেট নীতি ক্রেনশক্তিতে উপড়ে গেলো নেহেরু মূর্তি;কংগ্রেস-বিজেপি-তৃণমূলের ত্রিমুখী তরজা ভারতের শেষ গ্রামে দুর্বিষহ জীবন, পদ্মা নদীর ছন্দেই বাঁচে ওরা! নেই হাসপাতাল, স্কুল, রোজগার! ভাতের বদলে কাফন? ১৯৫৯ সালের যে রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে কেঁপেছিল রাইটার্স! আহমেদাবাদের স্টাডি সার্কেলে হামলা; নিষিদ্ধ আনা ফ্রাঙ্ক,মালালা ইউসুফজার! কেন বুদ্ধবাবু পারেননি তসলিমাকে নিরাপত্তা দিতে? কেন বিজেপি ফেরাল? কার দখলে বাংলার বিরোধী রাজনীতি? তৃণমূলের শেষে আশার আলো দেখছে CPIM? কার দখলে বাংলার বিরোধী রাজনীতি? তৃণমূলের শেষে আশার আলো দেখছে CPIM? ককরোচদের (CJP) আন্দোলনে জেরবার BJP! কোন পথে ঐতিহাসিক জয় প্রশান্ত কিশোরের?

বীণা দাস: বিস্মৃত সেই অগ্নিকন্যা

৬ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

​পথের নাম বদলের রাজনৈতিক কুচকাওয়াজে যখন দুদিনের তকমা আঁটা উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে, তখন শহরের কংক্রিটের ধমনীতে কিছু নাম ক্ষণিকের জন্য ফেরে—যেমন সোহরাওয়ার্দী সরণি কিংবা অন্য কোনো বিতর্কিত সোপান। কিন্তু সেই বিতর্কের ভিড়ে আড়ালেই থেকে যায় সেইসব মুখ, যাঁদের রক্তে লেখা রয়েছে এই ভূখণ্ডের শেকড়। ক্যালেন্ডারের পাতা উলটে আজ চব্বিশে আগস্ট—বাংলার সেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাপিয়ে দেওয়া অগ্নিকন্যা বীণা দাসের জন্মদিবস। অথচ নিদারুণ বাস্তব এই যে, শহুরে কোলাহল বা রাজনৈতিক সৌজন্যের বর্ম ভেদ করে আজ তাঁর প্রতি এক ফোঁটা অর্ঘ্য বা শ্রদ্ধাঞ্জলির ফুলও এসে পৌঁছয়নি। পাথরের মূর্তির মতো বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছেন তিনি।


​১৯১১ সালের এই দিনে নদীয়ার কৃষ্ণনগরে জন্ম নিয়েছিল এক অনন্য প্রতিবাদী আত্মা। পিতা বেণীমাধব দাস ছিলেন দেশপ্রেমের এক প্রজ্জ্বলিত মশাল, যাঁর দীক্ষায় বীণার কৈশোর থেকেই রক্তে মিশেছিল দেশমাতৃকার পরাধীনতার গ্লানি মোচনের মন্ত্র। তখনকার দিনে বাঙালি ভদ্রমহিলাদের অন্দরমহলের গণ্ডি পেরিয়ে বন্দুকের নল গর্জে ওঠার সাহস দেখানো ছিল এক অসম্ভব কল্পনাবিলাস। সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছিলেন বীণা দাস। ১৯৩২ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন কক্ষ। গাউন পরা এক শান্ত স্নিগ্ধ তরুণী এগিয়ে গিয়েছিলেন মঞ্চের দিকে। তারপর আচমকাই গর্জে উঠেছিল রিভলবার। লক্ষ্য ছিলেন বাংলার তৎকালীন ব্রিটিশ গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসন। যদিও গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, তবুও পরাধীন ভারতের বুকে একুশ বছরের এক তরুণীর সেই সাহসিকতা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রক্তে ত্রাসের শীতল স্রোত বইয়ে দিয়েছিল।


​বিচারালয়ে দাঁড়িয়ে সেদিন বীণা দাস যে জবানবন্দি দিয়েছিলেন, তা আজও বাংলা সাহিত্যের কোনো মহাকাব্যের চেয়ে কম শক্তিশালী নয়। তিনি সগর্বে বলেছিলেন, তিনি তাঁর দেশকে ভালোবেসেছেন এবং পরাধীনতার অপমান থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই এই পথ বেছে নিয়েছেন। এর ফলস্বরূপ তাঁর কপালে জোটে দীর্ঘ ন’ বছরের কঠোর কারাবাস। কারাগারের অন্ধকূপ, একাকী সেল আর ব্রিটিশ পুলিশের নির্মম নির্যাতনও তাঁর মেরুদণ্ড বাঁকাতে পারেনি। মুক্তি পেয়েও তিনি থেমে থাকেননি; যোগ দিয়েছেন ভারত ছাড়ো আন্দোলনে, নোয়াখালীর দাঙ্গাবিধ্বস্ত মাটিতে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন , স্বাধীনতার পরে বিধায়ক হিসেবে কাজ করেছেন সাধারণ মানুষের কল্যাণে।


​অথচ, জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে রাজনৈতিক ক্ষমতার বৃত্ত তাঁকে ভুলে যায়। স্বামী যতীশ ভৌমিকের মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে লোকচক্ষুর অন্তরালে, সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গতায় চলে যান তিনি। এরপর উত্তরাখণ্ডের হৃষীকেশ বা হরিদ্বারের কোনো এক অজ্ঞাত গঙ্গার ঘাটে মিলল এক বৃদ্ধার গলিত দেহ। পুলিশি নথিপত্র ঘেঁটে বহু দিন পর জানা গেল, মৃতদেহটি আর কেউ নন—বাংলার অগ্নিযুগের সেই অকুতোভয় বিপ্লবী বীণা দাসের। রাষ্ট্র যাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করেছিল, তাঁকেই কিনা বরণ করতে হলো এক করুণ, অনাদৃত ও মর্মান্তিক পরিণতি!
​আজ যখন রাস্তার নামফলক বদল নিয়ে আমাদের মেকি রাজনৈতিক সংস্কৃতি বাহবা কুড়াতে ব্যস্ত, তখন বীণা দাসের জন্মদিনের এই নীরব প্রয়াণ আমাদের সমাজসচেতনতার এক চরম দেউলিয়াপনাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। আমরা এমন এক জাতি, যারা ক্ষমতার পালাবদলে নাম কিনতে জানি, কিন্তু আত্মত্যাগের ইতিহাসকে চিরতরে কবর দিতে সিদ্ধহস্ত। বীণা দাস হয়তো কোনো রাজনৈতিক স্লোগানের মুখ নন আজ, কিন্তু বাংলার ধূলিকণা, এখানকার প্রতিটি মুক্ত বাতাসের সুবাসে মিশে আছেন তিনি। এই অবহেলা ও বিস্মৃতির কুয়াশা ভেদ করে বীণা দাসের আদর্শ কি কখনো আবার আমাদের প্রজন্মের পথ দেখাবে?

অন্যান্য প্রতিবেদন.