ক্যাম্পাসে গ্রাফিতিতে চুনকাম ও রাষ্ট্রের ছায়া বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় বন্ধ করে সার্বিক হোক নির্বাচন! তবেই সাপমুক্তি হবে পশ্চিমবঙ্গের? বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটে জিতে মোদীর সঙ্গে ব্রেকফাস্ট! সায়নী, কাকলীরা আর জিতবেন? প্রতিবাদী মানেই ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ নয়, ভাগবতের কথা কি মাথায় রাখবে তথাকথিত ‘দেশভক্ত’রা? বাঁকিপুরের ঝাঁকি, সঙ্গে CJP! ঘুরে দাঁড়াতে পারবে BJP? গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কাঁটা মোদী-শাহ’র CPIM থেকে BJP হয়ে তৃণমূল! বিরোধী হলেই কাদা-ডিম্ ছোঁড়ার রাজনীতি বাংলায়, কবে বদলাব আমরা? জমিতেও হিন্দু-মুসলমান? মুখ্যমন্ত্রীর ‘ল্যান্ড জিহাদ’ মন্তব্যে শোরগোল বঙ্গ রাজনীতিতে রেখা পাত্রের বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের অভিযোগ, শর্বরীর বিরুদ্ধে দোকান! তোলাবাজির TMC-BJP হয়?

চদর বাঁধনি : টেকনোলজির দাপটে হারিয়ে যেতে বসা সাঁওতাল সমাজের বায়োস্কোপ

৭৬ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

পর্ঞ্চশের দশকের শেষভাগের বাংলা সিনেমা ‘ভানু পেলো লটারি’ তে শ্যামল মিত্রের গাওয়া এক অতি পরিচিত গান “পুতুল নেবে গো পুতুল”, আজও বাংলার মাঠে – ঘাটে – হাটে, মাইকে কিংবা মোবাইল ফোনে হটকেক আইটেমের মতো প্রায়ই শোনা যায় | কিন্তু সেদিনের বাংলার মাটির পুতুল, কাঠের পুতুল, গালার পুতুল সময়ের অভিঘাতে তাল মেলাতে না পেরে অনেকটাই লুপ্তপ্রায় | ঠিক যেমন গ্রামের মেলা থেকে বিলুপ্তপ্রায় হয়েছে বায়োস্কোপ | আর ততোধিক লুপ্তপ্রায়, পুতুল নাচ আর বায়োস্কোপের মিলিত প্রাণবন্ত রূপ নিয়ে গড়ে ওঠা সাঁওতাল সমাজের নিজস্ব সংস্কৃতি ‘ চদর বাঁধনি’ বা ‘ চদর বদর’ | চদর বাঁধনি সাঁওতাল সমাজের মধ্যে প্রচলিত এক বিরলতম পুতুল নাচ, যেখানে চতুর্ভুজ কিংবা আয়তাকার একটি বক্সের খাঁচা, তিন থেকে চার ফুট উঁচু একটি বাঁশের ওপর দাঁড় করানো থাকে | বক্সের ভেতরে থাকে সাঁওতালি নাচের প্রথাগত ভঙ্গিমাতে দাঁড়িয়ে থাকে নরনারীর সাদৃশ্য পুতুল | আদিবাসী সংস্কৃতির অন্যান্য নাচের মতো সাঁওতালি নাচের লিখিত কোনও ব্যাকরণ না থাকলেও, নাচের সময় সাধারণত দেখা যায় একদিকে ধামসা মাদল বাজাতে থাকেন পুরুষেরা, অন্যদিকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে মহিলারা নৃত্য পরিবেশন করেন ; সাঁওতাল সমাজের একটুকরো ক্ষুদ্র সংস্করণ সমৃদ্ধ এই বাক্সের ভেতরেও চিরাচরিত সাঁওতাল নাচের ভঙ্গিতেই পুতুলদের সাজানো হয় | সাত থেকে আট ইঞ্চি লম্বা এইসব পুতুলদের ঘাড়ে অথবা পায়ের কাছে দড়ি বাঁধা থাকে যা যুক্ত করা হয় খাঁচার নীচে পোঁতা বাঁশের সঙ্গে | দড়িটি পা দিয়ে অথবা হাত দিয়ে টেনে নাড়া দিলেই খাঁচার ভেতরে থাকা কলের মানুষেরা প্রাণবন্ত হয়ে নেচে ওঠে | খাঁচার মতো দেখতে পুরো মঞ্চটাই রঙিন চাদরে মুড়ে খুব সুন্দর করে সাজানো হয়, সেই চাদর থেকেই এই কাঠপুতুল নাচের ‘চদর’ আর যেহেতু মঞ্চের ভেতরে থাকা শিল্পীরা বাঁধা থাকে রশির সাহায্যে তাই এই বন্ধনের শৃঙ্খল থেকেই ‘বাঁধনি’, সাঁওতাল সমাজে লোকমুখে অবশ্য এই শিল্প ‘চদর বদর’ নামেই বেশী জনপ্রিয় | ইতিহাসের কোন বাঁকে কীভাবে এই নামের বিবর্তন তা ধারণা করা কঠিন, তবে সম্ভবত ভাষার অপভ্রংশ রূপ থেকেই বদলেছে নাম |

চদর বদরের খেলা দেখাচ্ছেন আদিবাসি শিল্পী

সাঁওতাল জনজীবন কয়েক বছর আগেও ছিল অত্যন্ত সহজ – সরল – অনাড়ম্বর ; তারই যেন একঝলক প্রতিচ্ছবি আমরা দেখতে পাই চদর বদরের পুতুল, খাঁচা, চাদর সহ সমস্ত কিছুতে | এই মঞ্চ কিংবা পুতুল তৈরীতে ব্যবহার হয়না মেহগিনি কিংবা সেগুনের মতো দামী কাঠ | পুতুল তৈরী হয় শিরিষ, জাম, ডুমুরের মতো জঙ্গলের সাধারণ কাঠ দিয়ে ; মঞ্চ তৈরীতে ব্যবহৃত হয় বাঁশ | যে চাদর জড়ানো থাকে মঞ্চের গায়ে তা বাড়িতে ব্যবহৃত রঙিন চাদর | এই অস্থায়ী মঞ্চ কাঁধে করেই পাঁচ ছয় জনের শিল্পীর দল বীরভূম, পূর্ব বর্ধমান, বাঁকুড়া, কিংবা ঝাড়খন্ডের আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় লাল মাটির পথ ধরে বাড়ি বাড়ি ঘুরে “বানাইলাম বানাইলাম, কাঠের পুতুল / বানাইলাম চদর বদনি” গান গেয়ে ধামসা, মাদল, করতাল, বাঁশির সুরের গুঞ্জনায় আশেপাশকে মুখরিত করেন |যেকোনো শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আর্থিক লাভের আশা, অর্থ ছাড়াতো শিল্প বা শিল্পী কেউই বেঁচে থাকতে পারেনা ! আবার লোকশিল্পের সমৃদ্ধির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে থাকে উৎসব, চদর বদর ও প্রাথমিক স্তরে উৎসব নির্ভর | চদর বদর শিল্পীরা কয়েকবছর আগেও তাদের ঝাঁপি নিয়ে মূলত দুর্গাপুজোর দাঁশাই( দশমীর সাঁওতালি প্রতিশব্দ) এর দিন আশেপাশের বাঙালি গ্রামে গিয়ে নিজেদের শিল্পকলা প্রদর্শন করে শাক- সবজি, টাকা – পয়সার ‘সিধে’ নিতেন | দুর্গাপুজোর পাশাপাশি সাঁওতালদের সহরাই বা বাঁদনা পরব, বিয়ের অনুষ্ঠানেও নিজেদের গ্রামে অব্যর্থ বিনোদনের ওষুধ ছিলো চদর বদর |যে শিল্প যুগ যুগ ধরে মাঠে ঘাটে ছড়িয়ে থাকে, জড়িয়ে থাকে একটি জাতির ঐতিহ্যের সাথে তাকে কী শুধু বিনোদনের দাড়িপাল্লায় মাপা যায় ! নাট্যকার বাদল সরকার একবার বলেছিলেন “পৃথিবীর মধ্যেই আরেকটা পৃথিবী রয়েছে, সেটা থিয়েটারের পৃথিবী | সেখানে চোখ রাঙানো কাঁটাতারের বেড়া নেই | আছে চোখভরা বেড়া ভাঙার স্বপ্ন” পুতুল নাচ আদতে তো শুধু পুতুলের নৃত্য নয়, গান- নাচ – গল্পের জমজমাট মিশেলে একে যদি থিয়েটারের ক্ষুদ্র সংস্করণ হিসেবে ধরে নেওয়া যায় তাহলে বলতে কোনও দ্বিধা নেই, বাদল বাবুর কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায় চদর বদরের ওই রংবেরঙের কাঠের পুতুলে | যুগের পর যুগ ধরে চদর বদর কার্যত একটি সমাজের প্রতিবাদের ভাষা ! শিল্পীদের মুখেমুখে প্রচলিত ভাষ্য অনুসারে ‘হুল’ বিদ্রোহের সময় সিধু- কানু – চাঁদ – ভৈরব দের ব্রিটিশ ও জমিদার বিরোধী লড়াইয়ের বার্তা চদর বদরের গানের তালে তালে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়তো, এখনো সাঁওতাল বিদ্রোহের বীরগাথা নিয়ে চদর বদরের বিশেষ বিশেষ গান গাওয়া হয় | যুগ বদলায়, শাসক বদলায় কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের সমস্যা হয়তো বদলায়না ; তাই চদর বদরের গানে স্থান করে নিয়েছে এখনকার যুগের দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ঘটনা, ঘটনার বিবরণ দিয়ে শিল্পীরা করুণ সুরে গেয়ে ওঠেন “ থিথারি পিথারি শাক দি আমায়, বন্ধু খায়না ভাত / কোথায় পাবি জিয়ল মাগুর মাছ, হয় রে…” | স্কটিশ নৃবিজ্ঞানী স্যার জেমস জর্জ ফ্রেজার তাঁর ‘ The Golden Bough’ তে বর্ণনা করেছিলেন আদিবাসী সংস্কৃতির মূল তত্ত্বই হলো প্রযুক্তিগত সারল্য, এই তত্ত্বকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে যুগ যুগ ধরে সাঁওতাল আদিবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতি ‘চদর বদর’ দড়ি বাঁধা পুতুলের অসাধারণ প্রযুক্তি নিয়ে স্বমহিমায় বহমান হয়ে প্রমান করে ভারতীয় আদিবাসী সংস্কৃতিকে ইউরোপীয় সংস্কৃতির সঙ্গে এক কাঠামোয় মেলানো কার্যত অসম্ভব |

চদর বদর এর পুতুল

এতো কৃষ্টি – সৃষ্টি – হিস্ট্রি সমৃদ্ধ হওয়ার পরও মার্শাল ম্যাকলুহানের “গ্লোবাল ভিলেজ” এর বর্তমান প্রেক্ষাপটে টেকনোলজির আধিপত্যে কমেছে চদর বদরের কদর, হারিয়ে যাচ্ছে শিল্প | গত কয়েক বছর আগেই বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গেছেন উত্তর দিনাজপুরের শেষ চদর বদর শিল্পী দমন মুর্মু, তাঁর পরবর্তী প্রজন্ম পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে রাজ্য ছেড়েছেন | সম্ভবত উত্তর বঙ্গে সাঁওতাল সমাজের আর কেউই এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত নন | পূর্ব বর্ধমানের আউসগ্রাম অঞ্চলে টিম টিম করে কয়েকজন শিল্পী এখনো টিকিয়ে রেখেছেন এই শিল্পের ধারা, তবে তাঁদের অধিকাংশ জনই বৃদ্ধ অথবা প্রৌঢ় ; নতুন প্রজন্মের এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা এখানেও নেহাতই ক্ষীণ | বীরভূমের বোলপুর- ইলামবাজার সংলগ্ন কামারপাড়া, গোপালনগর, নিমডাঙায় আজও সুকুল, চরকু, খান্দু মার্ডি’ রা বাঁচিয়ে রেখেছেন শিল্পকে | ঝাড়খন্ডের দুমকা জেলায় চাষের মরসুমের সময় ছাড়া অর্থাৎ ভদ্র থেকে অগ্রহায়ণ পর্যন্ত শিল্পীরা গ্রামেগঞ্জে নিজেদের অবসর সময় যাপনে এই শিল্পের সহায়তা নিতেন, সেখানেও এখন বাংলার মতোই শিল্পচর্চার পরিসর কমেছে | পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও UNESCO দিল্লির যৌথ উদ্যোগে ২০১৩ সালে শুরু হওয়া “Rural Craft Hubs (RCH) project” রিপোর্ট এর তথ্য অনুসারে, রাজ্যে ৭৪ জন চদর বদর শিল্পী এখনো নিয়মিত কাজ করছেন | যদিও এই রিপোর্ট এর পর পেরিয়ে গেছে প্রায় এক যুগ, এই একযুগে শিল্পীর সংখ্যা কতজনের কোঠায় এসে দাঁড়িয়েছে তা বোঝা মুশকিল |

সাঁওতালি ভাষার অলচিকি হরফের প্রবক্তা পন্ডিত রঘুনাথ মুর্মু বলেছিলেন “ হারিয়ে গেলে ভাষা / তোমার হারিয়ে গেলে বর্ণ / নিজেই তুমি হারিয়ে যাবে / হারিয়ে গেলে তোমার ধর্ম” | লোকসংস্কৃতি না বাঁচলে বাঁচবেনা “লোক” বাঁচবেনা, দেশ – কাল | তাই আমাদের দেশের হারিয়ে যেতে বসা যেকোনো সংস্কৃতিকে বাঁচানোর দায়িত্ব নাগরিক দেরই কাঁধে তুলে নিতে হবে, বাঁচাতে হবে চদর বদর ; বাঁচাতে হবে দেশ – কাল, সংস্কৃতি |

অন্যান্য প্রতিবেদন.