কহি জোড় হাতে,
আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে…
রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র এর লেখা অন্নদামঙ্গল কাব্যে দেবী অন্নপূর্ণা একজন সাধারণ গৃহ বধূর ছদ্মবেশে দিন আনা দিন খাওয়া এক মাঝি ঈশ্বরী পাটনীর নৌকায় উঠেছিলেন। দেবীর পা রাখা কাঠের সেঁওতি সোনায় বদলে গেলে মাঝি বোঝেন তিনি কোনও সাধারণ গৃহবধূ নন। এরপর মাঝিকে নিজের পরিচয় দিয়ে ইচ্ছে মতো বর চাইতে বলেন দেবী, মাঝি তখন করজোরে এই উক্তি করেন, ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’। আসলে আমাদের বাংলার আপামোর মা বাবাদের এই একই চাহিদা। সন্তানের সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য আর দিনের শেষে পেট ভরে দুধ-ভাত।
মাথার উপর ছাদ থাকুক বা ত্রিপল, ঘুমোনোর বিছানা থাকুক বা রাস্তা- এই বিশ্বের কোনও মায়ের কাছেই শিশুকে অভুক্ত রাখার মতো যন্ত্রণা বুঝি আর কিছুতে নেই। সম্প্রতি, কলকাতার ফুটপাতকে দখলমুক্ত করতে অতি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন রাজ্যের পুর নগরোন্নয়ন মন্ত্রী Agnimitra Paul। মাঝেমধ্যেই রাস্তায় নেমে সরেজমিনে তিনি খতিয়ে দেখছেন ফুটপাতের অবস্থা।

মাথায় গোলাপ ফুল গুঁজে বেশ কয়েকটি ক্যামেরা, প্রশাসন ও পুরসভার আধিকারিক সহযোগে শনিবার ফের অভিযানে নেমেছিলেন অগ্নিমিত্রা। আর সেখানেই এক মহিলাকে রীতিমতো ধমক চমক দেন রাজ্যের মন্ত্রী। ফুটপাতে উনুন জ্বালিয়ে বাচ্চার দুধ গরম করছেন কেন ওই মহিলা? ফুটপাত কি বাচ্চার দুধ গরম করার জায়গা? কেন সংসার পেতেছেন ফুটপাতে? বাড়ি কোথায়? মজা পেয়েছেন নাকি? ক্যামেরার সামনে একের পর এক প্রশ্ন ছুঁড়তে থাকেন অগ্নিমিত্রা। মন্ত্রীর প্রশ্নের মুখে ‘বাচ্চার জন্য দুধ গরম করছি‘ ছাড়া আর কোনও সদুত্তর দিতে পারেননি ওই মহিলা। শেষে ধমক দিয়ে অগ্নিমিত্রা বলেন ফুটপাত ছেড়ে উঠে যেতে হবে।
এভাবেই তিলোত্তমার একাধিক ফুটপাত থেকে বাসিন্দা সরাতে গাড়ি নিয়ে এসে অভিযান চালাচ্ছে পুরসভা। পরিবারগুলির থাকার মধ্যে যেটুকু চাদর, বাসনপত্র, খাবারের কৌটো রয়েছে তা তুলে নিয়ে যাচ্ছে গাড়ি। বালিগঞ্জের মেরলিন পার্ক এলাকায় ফুটপাতবাসী ৮টি পরিবারকে এক সপ্তাহের মধ্যে উঠে যেতে বলা হয়েছে, নতুবা উচ্ছেদ করার হুঁশিয়ারিও দিয়ে যাওয়া হয়েছে। বালিগঞ্জের আতঙ্কের রেশ ছড়িয়েছে গড়িয়াহাটের ফুটপাতবাসীদের মধ্যেও। কারও কোলে ১৮ মাসের সন্তান, কারও বা দুই বছরের বাচ্চা- জন্ম থেকে ফুটপাতই ঘর, পার্কিং-এর শেডই তাঁদের ছাদ। উঠে যেতে বললে কোথায় যাবেন তাঁরা? জানেন না। শুধু ফুটপাতবাসীই কেন? ফুটপাতে যারা ঝড়, বৃষ্টি, রোদ মাথায় করে রুটি রুজির তাগিদে বসতেন, তাদেরও শেষ দেখে ছাড়া হবে। হকার উচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে অহরহ। তাই ফুটপাতে ব্যবসা করে পেট চালানো মানুষদের সন্তানদের দুধ-ভাতেও পড়েছে টান।
তবে মন্ত্রীর স্পষ্ট সাফাই, ‘এক গামলা দুধ তো আর ৬ মাসের শিশু খাবে না’, যারা মন্ত্রীর ব্যবহার নিয়ে নিন্দা করলেন তাঁদের অগ্নিমিত্রা বললেন, ‘বিরোধীদের অনেক কান্নাকাটি শুনলাম দুধ গরম করা নিয়ে৷ কিন্তু কেউ একবাটি দুধ নিয়ে এগিয়ে যায়নি ওই পরিবারের কাছে’।
এখন প্রশ্ন হল এই রাজ্যের প্রতিটা মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের ন্যূনতম চাহিদা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কাদের? কোন পরিস্থিতিতে কোনও মানুষ ফুটপাতে থাকার জীবন বেছে নেন? রাস্তার পাশে বাচ্চার জন্ম দেন? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর অধরা। এই ঘটনার ঠিক দিন দুয়েক আগে জাতীয় পতাকার সঙ্গে ভারতমাতার একটি ছবি এঁকেছিলেন অগ্নিমিত্রা পাল। এই দেশের সমস্ত মানুষ যদি ভারতমাতার সন্তান হন, তবে ভারতমাতা কি চাননা তাঁর সমস্ত সন্তান থাক দুধে ভাতে?

