অনেক গুলো বছর হয়ে গেল ,স্বাধীনতার সাথে আমার বন্ধুত্বের শুরুয়াত। একটু বড়ো হয়ে অক্ষরজ্ঞান – মাতৃভাষা পরিচয়ের সাথে সাথে শৈশবকাল থেকে- একসাথেই বড়ো হয়ে উঠছিলাম আমরা দুজনেই। স্কুলের শিশু শ্রেণীর সেই দিনগুলোতে স্বাধীনতা আমাকে গল্প শোনাতো সাহসের। গল্প শোনাতো বীরত্বের। স্বাধীনতার বয়স আমার থেকে একটু বেশী হলেও- আমাদের বন্ধুত্বের বোঝাপড়া ছিল দারুণ। প্রাইমারি ক্লাসে পড়ার সময় সবাই বাচ্চা বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলেও , স্বাধীনতা কিন্তু একদিনের জন্যেও তা করেনি। আবার স্বাধীনতা মাঝে মাঝে একটু কঠিন কথা বলতো – যা আমি বুঝতে না পারলেও অবাক হয়ে শুনতাম। নিজেদের মধ্যের গল্পে একে অপরের সাথে মশগুল থাকতাম আমরা। যাকে বলে একদম গলায় গলায় বন্ধুত্ব।
স্বাধীনতার মুখে সাহসের গল্প শুনে সেই ছোট্ট আমিও কল্পনা করতে শুরু করেছিলাম যে আরেকটু বড়ো হলে আমিও খুব সাহসী হবো। একদম শৈশবে ভালো বুঝতে না পারলেও একটু বড়ো হতে হতেই বুঝতে পারলাম স্বাধীনতা – যে সাহসের গল্প বলত আমাকে সেটা মোটেও সহজ জিনিস নয়।
শৈশবের পর অল্প বয়সের কিশোরী বেলায় সাধ জাগতো মনে যে উৎসবের সময়ের রাত কেমন হয় তা দেখবো। নিজের শহরে দূর্গা পুজোর রাতের আলোয় কলকাতার সাজ দেখতে চেয়েই এল প্রথম ধাক্কা- বাড়ির বড়োরা বলে দিল হবেনা – সব স্বাধীনতা সবার জন্য নয়। মেয়েদের একটু সাবধানে থাকতে হয়। বলাইবাহুল্য বয়ঃসন্ধির সেই উথাল পাথাল আবেগের সময় এই না করাকে আমি মোটেও ভালো ভাবে নেইনি। জেদ ধরেছিলাম যেতে দিতেই হবে – দাদা যেতে ভাই যেতে পারে রাত দেখতে তাহলে আমি কেন পারবোনা?
বড়োরা কেউ পক্ষে ছিলনা সেদিন সেই বারো ক্লাসের মেয়েটার। পাশে ছিল একমাত্র স্বাধীনতা নামের বন্ধুটা।
বন্ধু নীরবে প্রতিনিয়ত কানের কাছে বলে গিয়েছে- নিজের শহরে পুজোর রাত দেখার ইচ্ছে হয়েছে যখন ইচ্ছেকে মরতে দিওনা। আজ না পারলেও কাল তুমি পারবেই। এক না একদিন তুমি নিজের সাহসে ভর করে – দুচোখ মন ভরে আলো দেখতে পারবেই ঠিক নিজের শহরেই। সেদিন কেউ তোমায় বাঁধবেনা – কেউ বলবেনা একা মেয়ে রাতে বাড়ির বাইরে কেন?
সেদিনের সেই নাবালিকা কিশোরী আজ পূর্ণ যুবতী। রাতে বাইরের বাইরে থেকে এত বড়ো বিশ্বপ্রকৃতির খুব ক্ষুদ্র অংশ হলেও একা একা দাঁড়িয়ে থেকে উপভোগ করার সেই সুযোগ টুকু আমি পেয়েছি।
পেয়েছি একা পাহাড়ের ধারে বসে নিকষ কালো অন্ধকারে , দূরের জঙ্গলে লাল গনগনে তেজী দাবানলের আগুন দেখার সুযোগ।
আর সেই দাবানলের আগুন দেখতে দেখতেই আমি আমার পাশে আবার অনুভব করেছি আমার সবচেয়ে পুরোনো বিশ্বস্ত বন্ধু – স্বাধীনতাকে। আমার সে বন্ধু – সেই গনগনে লাল আগুনের মতোই তেজী ,জেদি আর সাহসী।
যে বন্ধু ধীরে ধীরে ভীষণ ভালোবেসে আমাকেও গড়ে নিয়েছে নিজের মতো। নিজের ইচ্ছে মতো বাঁচতে শিখিয়ে দিয়েছে জীবনে।। স্বাধীনতার সাথে এই বন্ধুত্ব আমার তাই ভীষণ প্রিয়।

