”উড্ডীন পতাকাসহ খাদ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীর গাড়ী-
আমার ক্ষুধার কাছে কিছুই ফেলনা নয় আজ।
ভাত দে হারামজাদা, তা না হলে মানচিত্র খাবো।”-
স্বাধীনতার আশি বছর পার করে আজ দেশজুড়ে উদযাপনের প্রস্তুতি। লাল কেল্লার প্রাচীর থেকে শুরু করে পাড়ার অলিতে গলিতে উড়বে তেরঙ্গা। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত “হার ঘর তিরঙ্গা” কর্মসূচির জোয়ারে ভাসছে চারপাশ। জাতীয় পতাকার পতপত শব্দে মুখরিত হওয়ার কথা প্রতিটি ভারতীয়ের হৃদয়। কিন্তু এই মাহেন্দ্রক্ষণেও প্রশ্ন জাগে— এই পতাকার ছায়া কি সমানভাবে এসে পৌঁছায় দেশের প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায়?
গত ১৪ই এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া প্রশাসনিক বুলডোজার রাজ আমাদের রাজ্যের প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার শেষ সম্বলটুকুও পিষে দিতে উদ্যত হয়েছে। তিলজলা, শিয়ালদহ, যাদবপুরের রেললাইনের ধার কিংবা ফুটপাথের চেনা দৃশ্যগুলো আজ এক লহমায় পরিবর্তিত। যে হকার ভাইয়েরা ছোট ছোট পসরা সাজিয়ে সংসার চালাতেন, রেললাইনের ধারের ঝুপড়িতে যাদের কেটে যেত বছরের পর বছর— আজ তারা উচ্ছিন্ন। কোনো এক রোদচশমা পরা ভোরে হঠাৎই যখন সরকারি বুলডোজার গর্জে ওঠে, তখন তা কেবল কিছু ইট-কাঠের দেওয়াল ভাঙে না; গুঁড়িয়ে দেয় একটি পরিবারের আগামীর দুপুরের আহার, সন্তানের স্কুল ফি, বার্ধক্যের ওষুধের খরচ। জাতীয় পতাকার রঙে যখন আকাশ রঙিন, তখন পেটের জ্বালায় হু হু করে জ্বলে ওঠা ওই মানুষগুলোর রান্নাঘর আজ ধুঁকছে শূন্যতায়। সেই মানুষগুলোর কাছে “হার ঘর তিরঙ্গা” এক নিষ্ঠুর উপহাস ছাড়া আর কী হতে পারে?
শুধু বাংলা নয়, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ কিংবা বিহার— দেশের প্রতিটি কোণায় কোণায় খেটে খাওয়া মানুষের চিত্রটি একই রকম । আমদাবাদের ফুটপাথ হোক কিংবা মুম্বইয়ের কোনো ব্যস্ত স্টেশনের ধারের দৈনিক মজুরি বাজার, অথবা বিহার-উত্তরপ্রদেশের গ্রামীণ জনপদ— প্রতিদিনের বেঁচে থাকাটাই সেখানে এক মহা সংগ্রাম।
যে দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ রাতের আকাশকে ছাদ আর ফুটপাথকে বিছানা করে ঘুমিয়ে পড়েন, যাদের কাছে রাষ্ট্রের দেওয়া বড় বড় উন্নয়নের পরিসংখ্যান এক মরীচিকা মাত্র, সেখানে তিরঙ্গার গৌরবগাথা তাদের কতটা স্পর্শ করে? পেটে যখন আগুন জ্বলছে, তখন হাতে তেরঙ্গা নিয়ে স্লোগান তোলার বিলাসিতা তাদের নেই। তাদের কাছে ‘স্বাধীনতা’ মানে আজও কেবল মুক্তির আনন্দ নয়, বরং প্রতি মুহূর্তে ক্ষুধা, দারিদ্র্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক বুলডোজারের হাত থেকে বেঁচে থাকার অন্তহীন লড়াই।
রাষ্ট্র যখন জাতীয় পতাকাকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার গৌরবে মত্ত, তখন ফুটপাথের সেই চায়ের দোকানদার বা সবজি বিক্রেতা হরিপদ বা আবদুলদের জীবন থেকে চিরতরে মুছে গেছে তাদের নিজস্ব ভাতের হাঁড়িটি। তাদের কাছে জাতীয় পতাকা মানে কোনো কাপড় নয়, তাদের কাছে পতাকা হলো সেই ছেঁড়া চাদর, যা দিয়ে তারা শীত-বর্ষায় খাটিয়ে নেয় মাথা গোঁজার সামিয়ানা৷ বুলডোজারের শব্দ ছাপিয়ে যেদিন একটি শিশুর হাসিমুখ আর অন্নসংস্থানের নিশ্চয়তা এই দেশের বাতাসে মিশবে, কেবল সেদিনই সার্থক হবে কোটি মানুষের আত্মবলিদানে অর্জিত এই স্বাধীনতা, আর তখনই প্রকৃত অর্থেই ধন্য হবে “হার ঘর তিরঙ্গা”র সার্থকতা।

