ক্যাম্পাসে গ্রাফিতিতে চুনকাম ও রাষ্ট্রের ছায়া বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় বন্ধ করে সার্বিক হোক নির্বাচন! তবেই সাপমুক্তি হবে পশ্চিমবঙ্গের? বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটে জিতে মোদীর সঙ্গে ব্রেকফাস্ট! সায়নী, কাকলীরা আর জিতবেন? প্রতিবাদী মানেই ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ নয়, ভাগবতের কথা কি মাথায় রাখবে তথাকথিত ‘দেশভক্ত’রা? বাঁকিপুরের ঝাঁকি, সঙ্গে CJP! ঘুরে দাঁড়াতে পারবে BJP? গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কাঁটা মোদী-শাহ’র CPIM থেকে BJP হয়ে তৃণমূল! বিরোধী হলেই কাদা-ডিম্ ছোঁড়ার রাজনীতি বাংলায়, কবে বদলাব আমরা? জমিতেও হিন্দু-মুসলমান? মুখ্যমন্ত্রীর ‘ল্যান্ড জিহাদ’ মন্তব্যে শোরগোল বঙ্গ রাজনীতিতে রেখা পাত্রের বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের অভিযোগ, শর্বরীর বিরুদ্ধে দোকান! তোলাবাজির TMC-BJP হয়?

পরিবর্তনের পথে পশ্চিমবঙ্গ: প্রত্যাশা, বাস্তবতা ও নতুন রাজনীতির সমীকরণ

২৬ জন
পড়েছেন

প্রতিবেদন টি শেয়ার করুন

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদলের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল দ্রুত দৃশ্যমান পরিবর্তন। নির্বাচনী প্রচারে উন্নয়ন, সুশাসন, শিল্পায়ন এবং “সোনার বাংলা” গড়ার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা নতুন সরকারের প্রতি জনমানসে বড় আশা তৈরি করেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর কয়েক মাসের অভিজ্ঞতায় রাজ্যের বহু মানুষের মনে এখন একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে, সরকারের দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা আসলে কী?

সরকারের একের পর এক প্রশাসনিক পদক্ষেপ অবশ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তারা আইনশৃঙ্খলা, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং সরকারি জমি দখলমুক্ত করাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তবে এই উদ্যোগগুলির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনে কী ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে, তা নিয়ে এখনও স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়নি।

এরই মধ্যে সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলিও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আগের প্রকল্পগুলির পরিবর্তে নতুন নামে সুবিধা চালু হলেও বহু উপভোক্তার অভিযোগ, তাঁরা এখনও সরকারি সহায়তা পাননি। একই এলাকার একজন ভাতা পাচ্ছেন, অন্যজন বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রশাসন যোগ্যদের সুবিধা দেওয়ার আশ্বাস দিলেও বাস্তব চিত্র নিয়ে অসন্তোষ কমছে না।

সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও নতুন সরকারের অবস্থান নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর যে সরকারি সাংস্কৃতিক আয়োজন হয়, তা এবার আগের মতো হবে কি না, তা নিয়ে স্পষ্ট বার্তা পাওয়া যায়নি। অনেকেই মনে করছেন, প্রশাসনের এই নীরবতা কেবল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়েই নয়, রাজ্যের ঐতিহ্য সম্পর্কে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কেও প্রশ্ন তুলছে।

অন্যদিকে সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি, অনুপ্রবেশ রোধ এবং বেআইনি বসতি উচ্ছেদের মতো পদক্ষেপ সরকারকে একদিকে সমর্থন এনে দিয়েছে, আবার অন্যদিকে বিতর্কও বাড়িয়েছে। হকার উচ্ছেদ, ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং সরকারি জমি উদ্ধারকে শহুরে মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশ স্বাগত জানালেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কারণ তাঁদের কাছে জীবিকার প্রশ্নটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরেও প্রশাসনের নীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। কিছু নির্দিষ্ট ধর্মীয় আয়োজনে সরকারি সহায়তা বাড়ানো হয়েছে, আবার অন্য ক্ষেত্রে অনুদান ও নিয়ন্ত্রণের নতুন নীতি আনা হয়েছে। এর ফলে রাজনৈতিক মহলে যেমন বিতর্ক শুরু হয়েছে, তেমনই সাধারণ মানুষের মধ্যেও সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে নীতিনির্ধারণে যে বুদ্ধিজীবী ও নাগরিক সমাজের একটি প্রভাব ছিল, তা আগের মতো দৃশ্যমান নয়। পরিবর্তে নতুন রাজনৈতিক ও আদর্শিক পরিমণ্ডলের প্রতিনিধিদের গুরুত্ব বাড়ছে বলে মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক। এই পরিবর্তনকে কেউ স্বাভাবিক রাজনৈতিক বিবর্তন বলছেন, আবার কেউ এটিকে রাজ্যের দীর্ঘদিনের সামাজিক চরিত্রের পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন।

‘ডাবল ইঞ্জিন সরকার’ মডেলের মূল দর্শন হল কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বিত প্রশাসন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মতো নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ইতিহাসসমৃদ্ধ একটি রাজ্যে এই মডেল কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে মতভেদ স্পষ্ট। একাংশের বিশ্বাস, এতে উন্নয়নের গতি বাড়বে। অন্যদিকে সমালোচকদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ রাজ্যের স্বাতন্ত্র্যকে দুর্বল করতে পারে।

নতুন সরকারের সামনে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নয়, মানুষের আস্থা অর্জনও। উন্নয়নের পাশাপাশি যদি সামাজিক নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা যায়, তবেই “সোনার বাংলা”র স্বপ্ন বাস্তব রূপ পেতে পারে। অন্যথায় পরিবর্তনের আশা ধীরে ধীরে নতুন অনিশ্চয়তার জন্ম দেবে।

অন্যান্য প্রতিবেদন.